২০২৬ বিশ্বকাপ

সাধারণ ভক্তদের গ্যালারির স্বপ্ন ও ফিফার ‘সস্তা’ টিকিটের বাস্তবতা

'যাদের সামর্থ্য নেই, তারা যেন দয়া করে পরিবারকে দেনায় ডুবিয়ে স্টেডিয়ামে না আসে!'

ফাইনালের একটি টিকিটের দাম ১২৮ ডলার থেকে ১ হাজার ৫৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় চমক হলো ‘প্রিমিয়াম’ টিকিটের দাম— যা প্রায় ৪ হাজার ১৮৫ ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ লাখ টাকা)। ২০২২ বিশ্বকাপ তো বটেই, এমনকি ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের যেকোনো ইভেন্টের চেয়েও অনেক বেশি এই টিকিটের মূল্য।

মেক্সিকো, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি আর ছয় মাসেরও কম সময়। প্রিয় জাতীয় দলকে সমর্থন দিতে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে প্রবল উৎসাহ থাকলেও, একটি বড় সমস্যা সবার আনন্দকে ফিকে করে দিচ্ছে—আর সেটি হলো টিকিটের আকাশচুম্বী দাম।

অভিযোগ উঠেছে, ফিফা তার বর্তমান বিশাল আয়ের ভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করতেই টিকিটের এই চড়া মূল্য নির্ধারণ করেছে। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, এবারের টিকিটের দাম আগের বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। স্কটল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশনের মতো বেশ কিছু সংস্থা একে বলছে ‘লজ্জাজনক’। তারা সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যাতে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন অযৌক্তিক মূল্যের টিকিটে তারা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করেন। স্কটল্যান্ডের ম্যানেজার স্টিভ ক্লার্ক তো সমর্থকদের উদ্দেশে বলেই দিয়েছেন— 'যাদের সামর্থ্য নেই, তারা যেন দয়া করে পরিবারকে দেনায় ডুবিয়ে স্টেডিয়ামে না আসে!'

ইউরোপীয় ফুটবল সমর্থকদের সংগঠন 'ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ' এর তীব্র সমালোচনার পাঁচ দিন পর মুখ খুলেছে ফিফা। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) সংস্থাটি ঘোষণা করেছে, তারা সব ধরনের বা সাধারণ সমর্থকদের কথা মাথায় রেখে একটি ‘সাশ্রয়ী ক্যাটাগরি’ চালু করতে যাচ্ছে।

নতুন এই ক্যাটাগরির অধীনে, প্রতিটি স্টেডিয়ামে দুই দলের সমর্থকদের জন্য আনুমানিক ১ হাজারটি করে টিকিট বরাদ্দ রাখা হবে। ইউরোপীয় সংগঠনটি এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বললেও তাদের দাবি—বিশ্বকাপের টিকিটের এই দাম নজিরবিহীন এবং সাধারণ ভক্তদের নাগালের বাইরে।

গ্রুপ পর্বের টিকিটের দাম যেখানে ২১ ডলার থেকে শুরু করে ৩২৩ ডলার পর্যন্ত, সেখানে ফাইনাল ম্যাচের টিকিটের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ফাইনালের একটি টিকিটের দাম ১২৮ ডলার থেকে ১ হাজার ৫৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় চমক হলো ‘প্রিমিয়াম’ টিকিটের দাম— যা প্রায় ৪ হাজার ১৮৫ ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ লাখ টাকা)। ২০২২ বিশ্বকাপ তো বটেই, এমনকি ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের যেকোনো ইভেন্টের চেয়েও অনেক বেশি এই টিকিটের মূল্য। এ আকাশছোঁয়া দামকে অনেকেই আমেরিকান ফুটবল বা এনএফএল-এর টিকিটের দামের সঙ্গে তুলনা করছেন।

সাশ্রয়ী ক্যাটাগরির টিকিটকে অনেকটাই ‘আইওয়াশ’ বলছেন সমালোচকরা। তাদের মতে, ফিফার ঘোষিত এই ৬০ ডলারের সাশ্রয়ী টিকিট মোট স্টেডিয়াম ক্ষমতার মাত্র দেড় শতাংশ। মেক্সিকো ও কানাডার মতো দেশে যেখানে স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা ৬০ হাজারেরও বেশি, সেখানে মাত্র ১ বা ২ হাজার টিকিট সাধারণ ভক্তদের জন্য অত্যন্ত নগণ্য।

এছাড়া প্রতিবন্ধী সমর্থকদের জন্য কোনো বিশেষ মূল্যছাড় বা তাদের সঙ্গীদের জন্য কমপ্লিমেন্টারি বা পরিপূরক টিকিটের বিষয়েও ফিফা নীরব। অনেকে মনে করছেন, বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখে ফিফা কেবল ভক্তদের শান্ত করার একটি ‘কৌশল’ হিসেবে এই সস্তা টিকিটের ঘোষণা দিয়েছে।

তৃতীয় পর্যায়ের টিকিট বিক্রি আগামী ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। ভেন্যুগুলো নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় টিকিটের চাহিদাও বেড়েছে কয়েক গুণ। আর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দাম। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিমান ভাড়া, থাকা এবং খাওয়ার খরচ।

যদিও ফিফা জানিয়েছে, এই 'সাশ্রয়ী' টিকিটগুলো জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা হবে এবং তারা যেন দলের ঘনিষ্ঠ ও নিয়মিত ভক্তদের অগ্রাধিকার দেয়। তবে সব মিলিয়ে সাধারণ ভক্তদের কাছে আগামী বিশ্বকাপটি কেবল একটি বিলাসিতা হয়েই দাঁড়াচ্ছে। আর্থিক সংকটে থাকা ভক্তদের জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত টিভির পর্দাই হবে একমাত্র ভরসা। ফিফার আকাশছোঁয়া টিকিট কেটে পরিবারকে দেনায় না ডোবানোর পরমার্শ তো একজন কোচের কাছ থেকেই এসেছে।

আরও