মশালের হাতবদল

‘তোমার হল শুরু, আমার হল সারা—তোমায় আমায় মিলে এমনি বহে ধারা’—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জনপ্রিয় গানের এ পঙ্‌ক্তি মনে করিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামাল।

নিউ জার্সির মেটলাইট স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় রোববার রাতে আঁকা হলো নানা রঙের ছবি। কোনোটা আনন্দে রঙিন, কোনোটা বিষাদে নীল। আর্জেন্টিনাকে একেবারে চূর্ণ করে দিয়ে ১-০ গোলের ব্যবধানে ফাইনাল জিতে বিশ্বকাপ নিজেদের করে নিয়েছে স্পেন। ‘লা রোজা’দের এ মিশনের অন্যতম নায়ক ইয়ামাল। অন্যদিকে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক লিওনেল মেসি এবারো দলকে শিরোপার কাছাকাছি নিয়ে যান। যদিও তীরে গিয়ে তরি ডুবল মেসিদের। ক্যারিয়ারের একেবারেই অন্তিম এ আসর ও ম্যাচটিতে হার মেনে কষ্ট লুকাতে পারেননি ফুটবলের এ কিংবদন্তি। অত্যন্ত কাছে গিয়েও শিরোপা জিততে না পেরেও অঝোরে কাঁদলেন।

শিরোপা জয়ের আনন্দ করতে করতে মাঠের আরেক পাশের বিবর্ণ চিত্রের কথা ভুলে যাননি ইয়ামাল। হতাশায় মুষড়ে পড়া ৩৯ বছর বয়সী মেসির দিকে ছুটে গেলেন, আলিঙ্গন করলেন, তাকে সান্ত্বনা দিলেন ১৯ বছরের ইয়ামাল। বার্সেলোনার বর্তমান ১০ নম্বর জার্সিধারীর আলিঙ্গনে ক্লাবের ১০ নম্বরকে বিখ্যাত করে দেয়া মেসি। এটা যেন প্রতীকী এক ছবি হয়ে থাকল। এ যেন ফুটবলের মশালের হাতবদল। এক মহানায়কের প্রস্থান, আরেক মহানায়কের আবির্ভাব।

২০০৭ সালে ইউনিসেফের একটি চ্যারিটি অনুষ্ঠানে মাত্র কয়েক মাস বয়সী ইয়ামালকে গোসল করিয়ে দেন তখনকার ২০ বছর বয়সী বার্সা তারকা মেসি। আজ সেই ইয়ামাল ১৯ বছরের কিশোর ও সদ্যই বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। তার শুরু, আর বিশ্বকাপের মহামঞ্চ থেকে মহানায়ক মেসির বিদায়।

এ আসরে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলেই নিশ্চিতভাবে সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জিততেন মেসি। তিনি ৮ গোল করার পাশাপাশি অ্যাসিস্ট করেন আরো ৪টি গোলে। সেই তুলনায় ইয়ামালের গোল মাত্র ১টি। যদিও এই ১টি গোল দিয়ে তাকে বিচার করা কঠিন। স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে তার বড় অবদান রয়েছে, সেটি জানালেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।

ফাইনাল শেষে সংবাদ সম্মেলনে ইয়ামালকে নিয়ে ফুয়েন্তে বলেন, ‘সে অসাধারণ ফুটবল খেলেছে, যা তাকে পরিপক্ব হতে এবং সে এখন যত বড় ফুটবলার তার চেয়েও আরো বড় হতে সাহায্য করবে। সে দলগত মঙ্গলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে। এটা আমার স্কোয়াডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতে, সে দারুণ একটি বিশ্বকাপ খেলেছে।’

প্রতিপক্ষের রক্ষণে রীতিমতো ত্রাস ছড়িয়েছেন ইয়ামাল। তার প্রতিটি মুভ, প্রতিটি ড্রিবল আর প্রতিটি পাস কিংবা ক্রস প্রতিপক্ষকে এলোমেলো করে দিয়েছে, আর স্পেনের জন্য আক্রমণের ও গোলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ফাইনালে নিকো উইলিয়ামসের পাস থেকে যে গোলটি করেন ফেরান তোরেস, সেই বলটির উৎস ইয়ামালই।

ইয়ামালের গুরুত্ব বুঝেই তাকে প্রতিটি ম্যাচে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলান স্পেন কোচ। ১৯ বছরের এ উইঙ্গার যে কেবলই এক বিশেষ মেধাবী নয়, বিশেষ টেম্পারামেন্টেরও অধিকারী, সেটা প্রমাণ করেছেন। ফাইনাল শেষে তাকে নিয়ে সাবেক ইংলিশ ফুটবলার জো হার্ট বলেছেন, ‘লামিনে ইয়ামালের বয়স মাত্র ১৯ বছর। তার জন্য কী সুন্দর একটা দিন। ১৯ বছরেই সে পরিপূর্ণ ফুটবল খেলেছে।’

ফাইনাল শেষে চার বছরের ছোট্ট ভাই কেইনের সঙ্গে বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে আনন্দ করেছেন, খুনসুটিতে মেতেছেন ইয়ামাল। সঙ্গে মা, সৎ বাবা, প্রেমিকাও ছিলেন, তবে কেইনের সঙ্গে লামিনের ছবিটি যেন স্বর্গীয় সুখ অনুভবের উপলক্ষ এনে দেয় ফুটবল ভক্তদের। লামিনে নিজেও এখনো কিশোর। বয়স মাত্র ১৯ বছর ৬ দিন। তার উদযাপন কিংবা বিনম্র আচরণ দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি একজন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

বিশ্বকাপ জয়ের পথে নানা রেকর্ডের সঙ্গে নিজের নাম লিখিয়েছেন ইয়ামাল। চতুর্থ কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন তিনি। ফাইনালের দিন তার বয়স ছিল ১৯ বছর ৬ দিন। এ তালিকায় স্পেনের পাউ কুবারসি আছেন সপ্তম স্থানে। তার বয়স ১৯ বছর ১৭৮ দিন। বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা তৃতীয় কনিষ্ঠতম ফুটবলার ইয়ামাল। তার আগে ব্রাজিল গ্রেট পেলে ১৯৫৮ সালে ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে ও ইতালির জিওসেপ্পি বারগোমি ১৯৮২ সালে ১৮ বছর ২০১ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেন। এছাড়া প্রথম টিনএজার হিসেবে ইউরো ও বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য এক কীর্তি গড়েছেন ইয়ামাল।

এছাড়া স্পেনের ফাবিয়ান রুইজ চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে একই মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও বিশ্বকাপ জিতলেন। রেকর্ড গড়েছেন অধিনায়ক রদ্রিও। প্রথম স্প্যানিশ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতলেন তিনি। এছাড়া টিনএজ কুবারসি প্রথম স্প্যানিশ খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

আর্জেন্টিনাকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ও হতাশ করে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা নিশ্চিত করে ‘লা রোজা’রা। ৩৪ দিন আগে, নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের হতাশা দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিল স্পেন। শেষ পর্যন্ত সেই স্পেন ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা জিতে নিয়েছে। শুধু শিরোপা জেতেনি তারা, টুর্নামেন্টজুড়ে এক অবিশ্বাস্য কীর্তিও গড়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে মোট ৮টি ম্যাচ খেলেছে স্পেন, এ সময় আট প্রতিপক্ষ তাদের জালে মাত্র একবার বল পাঠাতে পেরেছে! বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই কোনো বিজয়ী দলের পক্ষে সর্বনিম্ন গোল হজম করার রেকর্ড।

এর আগে কোনো বিশ্বকাপজয়ী দলের সর্বনিম্ন গোল হজম করার রেকর্ডটি ছিল ২ গোলের। তিনটি দল যৌথভাবে এ রেকর্ডের অধিকারী ছিল। সর্বপ্রথম এ রেকর্ডটি গড়েছিল ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে মাত্র দুটি গোল হজম করেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। ২০০৬ সালে ইতালি ও ২০১০ সালে স্পেনও এ রেকর্ডের ভাগীদার হয়।

আগের দলগুলো ৭টি করে ম্যাচ খেলে শিরোপা জিতেছিল। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে একটি অতিরিক্ত ম্যাচ খেলা সত্ত্বেও স্পেন পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষকে মাত্র একবারই তাদের জালে বল পাঠাতে দিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের চার্লস ডি কেটেলারে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে স্পেনের বিপক্ষে গোল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আরও