গত ৪ অক্টোবর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় শেষ হওয়া ২০তম এশিয়ান গেমসে চীন ১৬৯টি স্বর্ণপদকসহ মোট ৩৪১টি পদক জিতে নিরঙ্কুশ আধিপত্য করেছে। ৭৮৬ বর্গকিলোমিটারের ক্ষুদ্র আরব দেশ বাহরাইন ১১টি স্বর্ণসহ মোট ২২টি পদক জিতে নিয়েছে। পদকের এ রেসে বাংলাদেশের অবস্থান কত ছিল? খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা মিলিয়ে ২৬০ জনের কন্টিনজেন্টে অ্যাথলেট ছিল ১৮৭ জন। অথচ বাংলাদেশের অর্জন মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক, তাও উশুতে জেতা পদকটি এসেছে ভাগ্যের পরশে। এ নিয়ে ১৯৮২ সালের দিল্লি এশিয়ান গেমসে লং জাম্পে ষষ্ঠ হওয়া নজরুল ইসলাম রুমী অনেক আক্ষেপ নিয়েই বললেন, ‘আমাদের ১৮ কোটি মানুষ, অথচ প্লেয়ার তৈরি করতে পারি না, এটা খুবই দুঃখজনক।’
এশিয়াডে বিবর্ণ পারফরম্যান্সের পর দেশের ক্রীড়াঙ্গনের হতাশাজনক চিত্র আরেকবার ফুটে উঠেছে প্রকটভাবে। অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাক ছাড়াও সুইমিং, কাবাডি, আরচারি, হকি, ক্রিকেট, ফুটবল—কোনো ক্রীড়াতেই সুখবর নেই, স্বস্তিদায়ক পারফরম্যান্সও নেই। এমন বিপর্যয়ের পর সাবেক কৃতী অ্যাথলেট এবং এ অঙ্গনের এক্সপার্টরা হিসাব মেলাতে পারছেন না।
সাবেক কৃতী অ্যাথলেট নজরুল ইসলাম রুমীর কাছে এবারের এশিয়াড নিয়ে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে বলছিলেন, ‘আমি তো বেড়ানোর জন্য কোনো সময় যাইনি। মস্কোতে (১৯৮০ সালের অলিম্পিক) আমার নিজের পারফরম্যান্সের জন্য খুব লজ্জা লাগছিল, কেননা আমি ছিলাম ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন, অথচ সেখানে নিজের অবস্থান মেনে নিতে পারছিলাম না। এখন যারা কম্পিটিশনে যায় তাদের জন্য যাওয়াটাই মুখ্য। মানে, একটা দেশে বেড়াতে যাচ্ছে। আমার মনে হয় তারা সিরিয়াস না।’
অ্যাথলেটিকসহ গোটা ক্রীড়ার দুরবস্থা কাটাতে তার পরামর্শ হলো, ‘আমাদের এখন যা করতে হবে, এটা বড় একটা বিষয়, একটা হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ দরকার। সবাই মিলে আমাদের অ্যাথলেটকে বাছাই করা, তাদের ট্রেনিং করানো এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে রেডি করানো। এটা একটা কমপ্লিট বিষয়। এমন নয় যে আপনি আনন্দভ্রমণে গেলেন, এই করলেন, সেই করলেন। ব্লেজার পরলেন। আসলে কম্পিটিশনে গিয়ে ছবি পেপারে দেয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া—আমার মনে হয় ছবি রেজাল্টের ভিত্তিতে দিলেই ভালো হয়। স্টেডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভি চিহ্ন দেখাবেন, এটা আসলে আপনার কাজ না।’
ক্রীড়াকে বাঁচাতে করণীয় নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিং দরকার। অতীতে যে রেজাল্ট হয়নি, তা না। সত্তর, আশির দশকে অনেকেই ভালো খেলেছে। ভালো বলছি মানে কোয়ালিফাই করাটা ভালো। দেখেন, বিরাশিতে আমি লং জাম্পে ষষ্ঠ হই। এরপর ১৯৮৬ সালের গেমসে আমাদের মিলজার হোসেন পঞ্চম হয় ৪০০ মিটারে। তার মানে, ষষ্ঠ থেকে একধাপ আগাল। তারপর ওই জায়গায় আর যেতে পারছে না। এখন পর্যন্ত অ্যাথলেটিকসের ফাইনালে কেউ গেছে বলে আমার মনে হয় না।’
নজরুল ইসলাম রুমী বলেন, ‘এখন কম্পিটিটিভ এনভায়রনমেন্ট দরকার, যেখানে অ্যাথলেট থাকবে, কোচ থাকবে, সাইকোলজিস্ট থাকবে। রিলেভ্যান্ট যা সবকিছু থাকবে এবং যেসব বিষয় আমাদের পারফরম্যান্সকে বাধা দেয়, সেসব দূর করতে হবে এক্সপার্ট এনেই। এটা একজন অ্যাথলেট একক চেষ্টায় পারবে না। এজন্য প্রপার ট্রেনিং, পুষ্টিবিদ—যা যা দরকার তা লাগবে। আপনাকে ডিজাইন করতে হবে লং টার্মের জন্য যে আপনি আট বছর পর এখানে যেতে চান। চার বছর পর এই পারফরম্যান্স হবে, দুই বছর পর এই পারফরম্যান্স হবে। এভাবেই করতে হবে। আমি পারব স্যার, দেখে নিয়েন—এগুলো ভালো, তবে এই ভালো দিয়ে তো মেডেল পাওয়া যাচ্ছে না। এটা আপনাকে অ্যাচিভ করতে হবে।’
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইরানও এবারের এশিয়ান গেমসে ১৯টি স্বর্ণ জিতেছে। এ নিয়ে রুমী বলেন, ‘ওদের ট্রেনিং দুর্দান্ত। ট্রেনিংয়ের দিক থেকে ওরা সুশিক্ষিত। ইরানের দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ওদের ছেলেমেয়েরা ফাইট করার জন্য ট্রেনিং করে, আর আমাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে যাওয়ার জন্য ট্রেনিং করে। অ্যাটিটিউড চেঞ্জ করতে হবে। অনেক হয়েছে। বিরাশির পর ৪৪ বছর হয়ে গেছে। এখন মেডেল পাওয়ার কথা ছিল। আমাদের বিকেএসপির মতো এক্সট্রা অর্ডিনারি একটা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ট্রেনিংয়ের জন্য। এসব প্রতিষ্ঠান পারছে না, এসব প্রতিষ্ঠানও ডেভেলপ করছে না।’
বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘ওয়াইল্ড কার্ডে অলিম্পিকে যাবেন, পয়সা খরচ করে যাবেন, আসবেন। দুই-চারটা বাই চান্স যদি হয়। এখন বাই চান্সও হয় না। এখন হতে হবে বাই ডিজাইন। মানে, আপনাকে ডিজাইন করে আনতে হবে। আপনাকে পরিকল্পনা করতে হবে, ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, এরপর আসবে রেজাল্ট।’
সাফের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের সঙ্গে কম্পিট করবে ভারত, শ্রীলংকা। আপনি ভারতকে দেখেন, তাদের অ্যাথলেট, তাদের ট্রেনিংয়ের ধরন, সুযোগ-সুবিধা। এরপর শ্রীলংকা, পাকিস্তান—প্রত্যেকেই আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। ইন্ডিয়া একটা জায়ান্ট টিম। তারা অলিম্পিকে পদক পায়, এশিয়ান গেমসে পদক পায়। ইন্ডিয়াকে ধরা যাবে না। আমাদের টার্গেট করতে হবে যারা ইমিডিয়েট ওপরে আছে, তাদের।’