টেস্ট ক্রিকেটের পরাশক্তি নিউজিল্যান্ডকে ঘরের মাঠে শোচনীয়ভাবে হারাল বাংলাদেশ। গতকাল সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সফরকারী দলকে ১৫০ রানে হারায় স্বাগতিকরা। এটা বাংলাদেশের ১৯তম টেস্ট জয়। স্পিনার তাইজুল ইসলাম ইনিংসে ৬টি ও ম্যাচে ১০টি উইকেট শিকার করে বাংলাদেশের জয়ের নায়ক।
প্রথমে শান্ত-মুশফিক-মিরাজের লড়াকু ব্যাটিং, এরপর তাইজুল-নাঈম-মিরাজের ঘূর্ণি জাদু। পুরোপুরি দলগত প্রচেষ্টায় টেস্টে অসাধারণ এক জয় এল। ১৩৯তম টেস্টে ১৯তম জয় বাংলাদেশের। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এটা দ্বিতীয় জয়। গত বছর মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ দল। তাদের মাটিতে সেটাই ছিল যেকোনো ফরম্যাটে বাংলাদেশের প্রথম জয়।
টেস্টে তেইশ বছরের পথচলায় এটা বাংলাদেশের উনিশতম জয়। ২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকায় প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেই ভারতের কাছে ৯ উইকেটে হারের স্বাদ পায় আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দল। এরপর টেস্ট ক্রিকেটে কঠিন সময় পার করেছে বাংলাদেশ। অভিষেকের দীর্ঘ চার বছর পর ৩৩তম ম্যাচে গিয়ে আসে প্রথম জয়। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে টাইগাররা। অবশ্য এরপরও টেস্ট ক্রিকেটে অধারাবাহিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বাংলাদেশ। কখনো কখনো বড় লজ্জার মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি বড় দলগুলোর সামনে অসংখ্য ম্যাচে পাঁচদিন টিকে থাকতে না পারায় টাইগারদের টেস্ট খেলার সামর্থ্য নিয়েও বারবার উঠেছে প্রশ্ন। সেই দুঃসময় অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বাংলাদেশ।
দুই বছরের মধ্যে নিউজিল্যান্ডকে দুবার হারাল বাংলাদেশ। যদিও এখনো তিনটি বড় দলকে হারানো যায়নি। ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সাদা জার্সিতে জয় নেই টাইগারদের। ভারতের সঙ্গে ১৩ টেস্ট খেলে ১১ হার, পাকিস্তানের সঙ্গে ১৩ টেস্ট খেলে ১২ হার ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ১৪ টেস্ট খেলে ১২ হার দেখেছে বাংলাদেশ। যদিও ২০০৩ সালে মুলতানে পাকিস্তানের বিপক্ষে জিততে জিততে শেষ পর্যন্ত ১ উইকেটে পরাজিত হন হাবিবুল বাশার, খালেদ মাহমুদ সুজনরা।
টেস্টে সর্বোচ্চ আটটি জয় এসেছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪ বার, নিউজিল্যান্ডকে ২ বার এবং আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও শ্রীলংকাকে ১ বার করে টেস্টে হারানোর কৃতিত্ব দেখায় বাংলাদেশ। ১৩৯ টেস্টের মধ্যে বাংলাদেশ হেরেছে ১০২টি, জিতেছে ১৯টি, ড্র করেছে ১৮টি।
টেস্টে বাংলাদেশের বড় জয়টি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ২০১৮ সালে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ইনিংস ও ১৮৪ রানে ক্যারিবীয়দের হারায় টাইগাররা। ইনিংস ব্যবধানে জয় আছে আরো একটি। ২০২০ সালে একই মাঠে জিম্বাবুয়েকে ইনিংস ও ১০৬ রানে হারায় বাংলাদেশ।
এছাড়া ২০২৩ সালে আফগানিস্তানকে ৫৪৬ রানে, ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়েকে ২২৬ রানে, ২০২১ সালে জিম্বাবুয়েকে ২২০ রানে, ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়েকে ২১৮ রানে, ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়েকে ১৮৬ রানে ও ১৬২ রানে, গতকাল নিউজিল্যান্ডকে ১৫০ রানে, ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৯৫ রানে, ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬৪ রানে ও ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারায় বাংলাদেশ।
উইকেটের হিসাবে ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডকে ৮ উইকেটে, ২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডকে ৭ উইকেটে, ২০১৭ সালে শ্রীলংকাকে ৪ উইকেটে, ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪ উইকেটে ও ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়েকে ৩ উইকেটে হারায় বাংলাদেশ।
ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন স্পিন ত্রয়ী তাইজুল ইসলাম, নাঈম হাসান ও মেহেদী হাসান মিরাজ। তিনজন মিলে নিয়েছেন ১৫ উইকেট। তাদের দুর্দান্ত প্রচেষ্টায় ঘরের মাঠে প্রথমবার হারানো গেল নিউজিল্যান্ডকে। পাশাপাশি পার্টটাইম স্পিনার মুমিনুল হক তিনটি ও শরিফুল ইসলাম দুটি উইকেট নেন।
এ টেস্টে খেলেননি বাংলাদেশের ইতিহাসেরই সেরা স্পিনার সাকিব আল হাসান। চোটের কারণে টেস্ট সিরিজে নেই তিনি। তবে সাকিবের অনুপস্থিতি দলকে বুঝতেই দিলেন না তাইজুল। অন্তত বোলিংয়ে। সিলেট টেস্টে ১০ উইকেট জয়ের নায়ক ৩১ বছর বয়সী এ বামহাতি স্পিনার।
কিউইরা ৩৩২ রানের টার্গেটে ব্যাটিং করতে নামলে তাইজুলের ঘূর্ণির সামনে পড়ে এলোমেলো। বামহাতি অর্থোডক্স স্পিনার দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৫ রানের বিনিময়ে নেন ৬ উইকেট। সব মিলিয়ে ম্যাচে তার শিকার ১০ উইকেট। এ নিয়ে বাংলাদেশের তৃতীয় বোলার হিসেবে টেস্টে দুবার ম্যাচে ১০ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব দেখালেন। বাকি দুজন হলেন সাকিব ও মিরাজ। এ টেস্টে মূলত অলরাউন্ডার হিসেবে খেলা মিরাজ দ্বিতীয় ইনিংসে দারুণ এক ফিফটি করার পর বল হাতে নেন এক উইকেট। ১৫ ওভারে ৪৪ রানের খরচায় নেন হেনরি নিকোলসের উইকেট।
২৩ বছর বয়সী নাঈম হাসান খেললেন নবম টেস্ট, যার সবগুলোই দেশের মাটিতে। সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে এক উইকেট নেয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেট শিকার করে দলের জয় ত্বরান্বিত করেন। শুক্রবার গ্লেন ফিলিপসকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলার পর গতকাল নেন কিউইদের সর্বোচ্চ স্কোরার ড্যারিল মিচেলকে।
শীর্ষ স্পিনার সাকিব না থাকলেও নিউজিল্যান্ডের জন্য ভয়ংকর ছিলেন বাংলাদেশের তিন স্পিনার। সাকিবকে ছাড়া মানিয়ে নেয়াটা এখন বাংলাদেশ রপ্ত করে ফেলেছে। সেটি সিলেট টেস্টেই দেখা গেল আরেকবার। বিশেষ করে তাইজুল বোলিং অ্যাটাকের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেন সফলভাবে।
নতুন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও আস্থা রাখেন তাইজুলের ওপর। তাই এক প্রান্ত দিয়ে নিয়মিতভাবে বোলিং করিয়ে যান তাইজুলকে দিয়ে। কিউইরা দ্বিতীয় ইনিংসে ৭১.১ ওভার টিকে ছিল, যার মধ্যে ৩১.১ ওভার বল করেছেন তাইজুল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৭ ওভার করেন নাঈম, আর মিরাজ করেন ১৫ ওভার। পেসার শরিফুল ও মুমিনুল মিলে করেন ৮ ওভার। প্রথম ইনিংসেও সর্বোচ্চ ৩৯ ওভার বল করেন তাইজুল, যখন নিউজিল্যান্ড ১০১.৫ ওভার টিকে ছিল।
সাকিববিহীন স্পিন অ্যাটাক নিয়ে তাইজুল বলেছেন, ‘অন্য একজন যা করে আমি তা করতে পারি না, আবার আমি যা করি, তাও অন্য কেউ করতে পারে না। আমি আমার পরিকল্পনায় অটল থাকি। সাকিব ভাই থাকুক বা না থাকুক, আমাদের দলে কিন্তু স্পিনার আছে। প্রতি ম্যাচে আমাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন হয়, কেউ না কেউ উইকেট নেয়, কেউবা প্রতিপক্ষের রানগুলো ডিফেন্ড করে। আমি যদি রানগুলো চেক দেই, তবে মিরাজ কিংবা নাঈম উইকেট নেয়। সবচেয়ে বড় কথা, দল ভালো করে কিনা।’
বাংলাদেশের বোলিং বিভাগকে কৃতিত্ব দিলেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক টিম সাউদিও। পরাজয় শেষে বোলিংয়ে তাইজুল-মিরাজদের নিয়ন্ত্রণের প্রশংসা করে সাউদি বলেছেন, ‘ওরা খুব ভালো বোলিং করেছেন, দারুণ নিয়ন্ত্রণ তাদের। আমরা জানি যে এ অঞ্চলে যত সময় গড়ায় ব্যাটিং তত কঠিন হয়। ওদের কিছুটা বাঁক দরকার ছিল, কিছু বাউন্সের অধারাবাহিকতাও। আমরা এটা জানতাম। এসব ক্ষেত্রে জুটি গড়তে হয়। আমাদের হয়তো দু-একটি জুটি দরকার ছিল। আর নিজেরা লম্বা সময় চাপ সৃষ্টি করতে পারিনি।’