উত্তরের আরেক জেলা বগুড়ায়ও শিগগিরই হতে পারে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট উৎসব। শহীদ চান্দু ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরিয়ে আনতে চলছে তোড়জোড়। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক সম্প্রতি বগুড়া স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে গেছেন। এ সময় তিনি বলেছেন, আগামী জুলাইয়ে শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে নারী ক্রিকেটারদের নিয়ে বিপিএল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে এটিকে আন্তর্জাতিক ভেন্যুতে উন্নীত করা হবে এবং শিগগিরই সংস্কারকাজ শুরু হবে। স্টেডিয়ামটির পুরো সংস্কার করে একটি আধুনিক ও মানসম্মত ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রতি ঝুঁকছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এজন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বগুড়া সফরে গিয়ে স্টেডিয়ামের আমূল পরিবর্তনসহ একটি ফুটবল স্টেডিয়াম ও সব মিলিয়ে একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ওই দিন সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘বগুড়া শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে দ্রুতই কার্যক্রম শুরু করা হবে। ক্রীড়াঙ্গনের বিকাশে ৬৪ জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ গড়ে তোলার অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে বগুড়াসহ দেশের ১০টি স্থানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরেই আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
বগুড়া শহীদ চান্দু ক্রিকেট স্টেডিয়াম সূত্রে জানা যায়, বগুড়ার এ মাঠকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি নিয়ে আসতে যা যা করণীয় সবই করা হবে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে বিসিবিকে অবহিত করে মাঠের আমূল পরিবর্তন করা হচ্ছে। মাঠের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে নতুন কিছু প্রস্তাব আনা হয়েছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সব ঠিক থাকলে বিষয়গুলো একনেকের মাধ্যমে পাস করিয়ে আগামী জুলাইয়ে কাজ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। বগুড়ার এ মাঠের সঙ্গে একটি ফুটবল স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া কমপ্লেক্সসহ নির্মাণ ব্যয় (প্রস্তাবিত) ধরা হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।
নতুন করে প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে বগুড়ার এ মাঠের পিচ ঠিক রেখে পুরো মাঠের ওপরের মাটি সরিয়ে ফেলে বালি দিয়ে ভরাট করা হবে এবং পুনরায় বালির ওপর মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে মাঠের পানি নিষ্কাশনের জন্য বিশেষ পাইপ বসানো হবে। বৃষ্টি হলে সেই পানি জমে না থেকে নিষ্কাশন হয়ে যাবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে পানির পাম্প, ভেজা মাঠ শুকানোর ব্যবস্থার উপকরণ থাকবে। এছাড়া ডিজিটাল জায়ান্ট বিগ স্ক্রিন স্থাপন, সেন্ট্রাল উইকেট ক্যামেরা, সাইট স্ক্রিন, স্পিড ক্যাম, ডিজিটাল স্কোর বোর্ড, ডিআরএস রিপ্লে মেশিন, ড্রোন ক্যামেরা জোন, গ্যালারিতে নতুন স্টিল রুফ, ব্যাকআপ জেনারেটর, ব্রডকাস্ট রুমের জন্য ইউপিএস, ট্রান্সফরমার, পিস রোলার, পিস কাভার, ঘাস কাটার আধুনিক একাধিক মেশিন, সয়েল পরীক্ষণ মেশিন, প্রেসিডেন্ট বক্স, হসপিটালিটি বক্স, প্লেয়ার রুম, লিফট সহজীকরণ, মিটিং রুম, ডক্টরস রুম, গেস্ট রুম, অফিশিয়াল ডাইনিং রুম, কিচেন, দ্রুত বহির্গমন পথ সংস্কার করা হবে।
প্রেস বক্সের সুবিধাও বাড়ানো হবে, যাতে একত্রে ১২০ জন সাংবাদিক বসতে পারেন। প্লেয়ারদের ড্রেসিং রুম, হাই স্পিড ইন্টারনেট, টিভি প্রডাকশন কন্ট্রোল রুম, টিভি ক্যামেরা পজিশন, প্রেস কনফারেন্স রুম, সার্বিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন করা হবে।
জানা যায়, ১৯৬২ সালে নির্মিত স্টেডিয়ামটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭০ সালে যাত্রা করে। ওই সময় ফুটবল, ক্রিকেটসহ স্থানীয় বিভিন্ন দিবসের অনুষ্ঠান হতো এ স্টেডিয়ামে। দীর্ঘদিন এভাবে চলার পর ২০০৩ সালের ৩ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বগুড়া শহীদ চান্দু ক্রীড়া কমপ্লেক্সের ভিত্তি স্থাপন করেন। প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি স্টেডিয়ামটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপের ম্যাচ দিয়ে স্টেডিয়ামের যাত্রা। আইসিসির স্বীকৃতি পাওয়ার পর একটি মাত্র টেস্ট ম্যাচ আর ৫টি ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে টেস্টে বাংলাদেশ হেরেছে এবং ৪টি ওয়ানডে ম্যাচে জয় ও একটিতে হেরেছে লাল-সবুজরা।
শ্রীলংকাকে এক ম্যাচে হারিয়ে পরের ম্যাচে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। অবশ্য শ্রীলংকাকে হারানোর প্রথম স্বাদটা বগুড়ায় নিয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। এছাড়া কেনিয়ার বিপক্ষে একটি এবং জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে দুটি ম্যাচে জয় পায় বাংলাদেশ। ১৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটিতে এরপর আর আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়নি। ২০০৬ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে শেষ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় বগুড়ায়। এরপর টানা ১৮ বছরের বন্ধ্যাত্ব। বর্তমানে আউটফিল্ড, পিচ, সংস্কার, ইনডোর, জিমনেসিয়াম এখন প্রায় অকেজো। স্টেডিয়ামের দেয়াল থেকে খুলে আসছে পলেস্তারা।
বগুড়ার ক্রীড়া সংগঠক শাজাহান আলী বাবু জানান, এ স্টেডিয়াম থেকেই উঠে এসেছেন জাতীয় ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম মিতু, তাওহীদ হৃদয়, তানজিদ তামিম, শফিউল ইসলাম সুহাস। রয়েছেন বেশ কয়েকজন নারী ক্রিকেটারও। সবাই সুনামের সঙ্গে জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করছেন। বগুড়া থেকে জাতীয় পর্যায়ে অসংখ্য ক্রিকেটার, ফুটবলার ও অন্যান্য খেলোয়াড় তৈরি করা হয়। অথচ সেই বগুড়াকে জাতীয় পর্যায়ে রাখা হয়েছিল অবহেলিত করে। এ স্টেডিয়ামের পিচ ঠিক থাকলেও এর আউটফিল্ড ঠিক নেই। গ্যালারিগুলো সাধারণ মানের, আর এখন তো আস্তরণ খুলে যাচ্ছে। এ স্টেডিয়ামের পূর্ণাঙ্গ মেরামত করতে হবে।
বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম জানান, বগুড়ার একঝাঁক ক্রিকেটার আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্বের সঙ্গে খেলে জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য অবদান রেখে যাচ্ছেন। ঢাকার বাইরে যেসব আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম আছে তার মধ্যে বগুড়া উল্লেখযোগ্য। বগুড়ার আবাসন ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত। বগুড়ায় বেশকিছু আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-মোটেল চালু রয়েছে। দেশের অন্যান্য স্টেডিয়ামের চেয়ে বগুড়ার স্টেডিয়ামের যোগাযোগসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বেশি। তার পরও বগুড়ার এ স্টেডিয়ামকে বঞ্চিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে এ বঞ্চনার শিকার হয়ে এসেছে। আগামী দিনে এ মাঠে আবারো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের জন্য যা যা করণীয় তার সবই করা হবে।
শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার জামিলুর রহমান জামিল জানান, মাঠের সবকিছু সংস্কার করার কথা শুনেছি। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে খেলোয়াড় তৈরির জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ হবে।
এরপর আইসিসির অনুমোদন নিয়ে ম্যাচ আয়োজন করবে। বিভিন্ন প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে। সেগুলো অনুমোদন পাওয়া গেলে বগুড়ার স্টেডিয়াম সবচেয়ে আধুনিক হবে।