কাতার বিশ্বকাপই কি নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে সৌদি আরবকে? ২২তম ফুটবল বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজন করেছে উপসাগরীয় ক্ষুদ্র দেশটি। এখন সৌদি আরবও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করতে চায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ ধনী দেশটি। কিন্তু স্বপ্ন সফল করতে শুধু অর্থই কি যথেষ্ট? এজন্য প্রয়োজন হবে জোরালো প্রচার-প্রচারণাও। আর তা যদি হয় বিশ্বখ্যাত সব খেলোয়াড়ের হাত ধরে, তবে তো কথাই নেই।
এ পথেই হাঁটছে সৌদি আরব। তাই ফুটবলের অন্যতম শীর্ষ সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে বছরে ২০ কোটি ডলার পারিশ্রমিক দিয়ে দলভুক্ত করেছে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসর। এখানেই শেষ নয়, এবার আরেক কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসির দিকে চোখ দিয়েছে সৌদির আরেক ক্লাব আল হিলাল। রিয়াদভিত্তিক আল নাসরের এই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবটি মেসিকে বছরে ৩০ কোটি ডলার পারিশ্রমিক দিয়ে উড়িয়ে আনার মহাপরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
অবশ্য এরই মধ্যে সৌদি আরবের পর্যটন দূত মেসি। এবার তাকে নিজেদের দলের খেলোয়াড় হিসেবে চায় আল হিলাল। স্পেনের সংবাদমাধ্যম মুন্ডো দেপোর্তিভো জানিয়েছে, মূলত ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন মিশন সামনে রেখেই রোনালদোর পর এবার মেসির দিকে চোখ সৌদি ক্লাবের।
এ মাসেই মেসিকে সই করাতে চায় আল হিলাল। যদিও ফরাসি ক্লাব পিএসজি তাদের মহাতারকাকে চুক্তি শেষ হওয়ার ছয় মাস আগেই ছাড়বে কিনা, সেই প্রশ্ন থাকছেই।
হয়তো শিগগিরই আল হিলালের জার্সিতে দেখা যাবে মেসিকে, যেমনটি অসম্ভবকে সম্ভব করেছে আল নাসর। কাতার বিশ্বকাপ চলাকালেই ৩৭ বছর বয়সী রোনালদোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। পর্তুগিজ সুপারস্টারের চোখে-মুখে তখন রাজ্যের হতাশা। ফলে বিশ্বকাপেও ছন্দ হারান তিনি। ফার্নান্দো স্যান্টোস কঠিন এক সিদ্ধান্তে বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন পর্তুগাল ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১১৮ গোলের মালিককে। ওই সময়ই রোনালদোকে দলভুক্ত করার সাহসী প্রস্তাব দেয় আল নাসর। সমর্থকরা এ নিয়ে তখন ছিলেন ঘোরের মধ্যে। সত্যিই কি রোনালদো যাবেন সৌদিতে? রোনালদো তখন চুপ ছিলেন এবং তার ম্যানেজমেন্ট টিমকে বলে দেন, ক্লাবের ব্যাপারে সিদ্ধান্তটি তিনি নেবেন বিশ্বকাপ শেষ হলে।
১৮ ডিসেম্বর বিশ্বকাপ শেষ, ওই মাসের শেষ দিকেই তাকে সই করানোর ঘোষণা দেয় আল নাসর। তাও যেনতেন কোনো চুক্তি নয়, বছরে ২০ কোটি ডলার! বাংলাদেশী মুদ্রায় ২ হাজার ৭৬ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ ডলারের বর্তমান বিনিময় হারের হিসেবে রোনালদো প্রতিদিন ক্লাবটি থেকে আয় করেন ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা! চুক্তিটা আপাতত আড়াই বছরের। আর মেসিকে যদি বছরে ৩০ কোটি ডলার দেয়া হয় তবে প্রতিদিন তিনি ঘুম থেকে উঠে বালিশের পাশে দেখবেন ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা! দুই মহাতারকা প্রতিদিন আয় করবেন ১৪ কোটি টাকারও বেশি।
রোনালদোকে সই করানোর পর আল নাসরের উচ্ছ্বাস দেখেই বোঝা যায় কতটা খুশি তারা। ক্লাবটির অফিশিয়াল টুইটারে লেখা হয়, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যাথলেট আনুষ্ঠানিকভাবে আল নাসরে সই করেছেন।’
উচ্ছ্বসিত হওয়ারই কথা। রোনালদোর ৫২৬ মিলিয়ন ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ও ১০৬ মিলিয়ন টুইটার অনুসারী এখন থেকে চোখ রাখবেন আল নাসর ক্লাবে, কেননা প্রিয় খেলোয়াড়ের ব্যাপারে সব আপডেট পেতে চাইবেন তারা। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই রোনালদোর সমর্থক, তারা এখন চোখ রাখবেন সৌদি ফুটবলেও। বিশ্বের অন্যতম আইকনিক খেলোয়াড়টিকে কিনে নিল সৌদি আরব, তাতে খেলোয়াড়টি কতটি গোল করেন, কিংবা কত টাকা আয় করে নিয়ে যাবেন, সেটি মোটেও বিবেচ্য নয়।
এরপর যদি মেসিও সৌদিতে পা রাখেন, তবে মুসলিম এই দেশটি কয়েক বছরের জন্য হয়ে উঠবে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম কেন্দ্র, তীর্থস্থান। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৮ শতাধিক গোল করা রোনালদো পাঁচবার ব্যালন ডি’অরসহ জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরো চ্যাম্পিয়নসহ ফুটবলের প্রায় সব ধরনের শিরোপা। আর ৩৫ বছর বয়সী মেসির গোলও ৮০০ ছাড়িয়েছে। তিনিও জিতেছেন ফুটবলের সব মুকুট। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা, ক্লাব বিশ্বকাপসহ সবকিছু। এক ব্যালন ডি’অরই জিতেছেন সাতবার। এবার হয়তো আটবার হাতে তুলবেন সোনালি ট্রফিটা।
সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ৬০০ গোলের মালিক, ১২টি ব্যালন ডি’অরজয়ী দুই খেলোয়াড় যদি সৌদির একই লিগে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের জার্সিতে একে অন্যের মুখোমুখি হন, তবে তা নিয়ে উন্মাদনা কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে তার খানিকটা নমুনা এখনই পেয়ে যাচ্ছেন ফুটবলপ্রেমীরা। ১৯ জানুয়ারি রিয়াদে এক প্রীতি ম্যাচে মেসি-এমবাপ্পের পিএসজি খেলবে আল হিলাল ও আল নাসরের খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া একাদশের বিপক্ষে। তার মানে, দুই বিপরীত দলে থাকবেন মেসি ও রোনালদো। এ ম্যাচে টিকিটের সর্বোচ্চ দাম উঠেছে ৯৩ লাখ সৌদি রিয়াল! (বাংলাদেশী
মুদ্রায় যা ২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা)।
দুজন যখন লা লিগায় খেলেছেন তখন রোমাঞ্চকর সব ডুয়েল দেখেছেন ফুটবল অনুরাগীরা। ভুবন কাঁপানো দুই মহাতারকার বিচ্ছেদ ঘটে একটি সময়; রোনালদো যান ইতালিতে, মেসি ফ্রান্সে। এরপর ইংল্যান্ড ঘুরে রোনালদোর ঠিকানা এখন সৌদি আরব। ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় আরেকবার ‘প্রিয় শত্রু’র মোকাবেলায় মেসিও কি যোগ দিচ্ছেন সৌদির ক্লাবে?