অস্তরাগে মডরিচ: এক যুগের পরিসমাপ্তি

অতীতের সোনালি স্মৃতির মতো ম্লান হতে থাকে এক যুগ।

পোর্তোর ঘড়ির কাঁটা যখন ১০৩ মিনিট অতিক্রম করে, ক্রোয়েশিয়ার আকাশে তখনো ভেসে ছিল স্বপ্নের উড়ান। ভার্দিওলের গোলে মুহূর্তের জন্য জেগে উঠেছিল আশা, কিন্তু ভিএআরের কড়া নজর যেন নিষ্ঠুর ভাগ্যের দূত হয়ে এল। ক্রোয়েশিয়ার পথ থেমে গেল, থেমে গেল লুকা মডরিচের বিশ্বকাপ অভিযানের শেষ অধ্যায়। কানাডার সেই রাতে শেষ বাঁশি বাজতেই লুকা মডরিচকে জড়িয়ে ধরলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দৃশ্যটি ছিল অদ্ভুত সুন্দর। প্রায় ছয় ফুটের রোনালদোর আলিঙ্গনে হারিয়ে যাচ্ছিলেন পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির ক্ষীণকায় এক মানুষ। অথচ ফুটবল ইতিহাসে পাহাড়ের মতো যে উচ্চতা, সেটি ছিল সেই ছোট্ট মানুষটিরই।

বিষাদ কখনো কখনো পরাজয়ের ভেতরেও মর্যাদা খুঁজে নেয়। এই বিদায়ও ছিল তেমন। পরাজিত হয়েও মাথা নত করেনি ক্রোয়েশিয়া। আর মডরিচ? শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত ছুটেছেন। যেন জানতেন, ফল নয় মানুষ মনে রাখে শেষ লড়াইটাকেও।

২০৩০ সালের বিশ্বকাপ যখন ফিরে আসবে, তখন তার বয়স হবে চুয়াল্লিশ। তার ২০২তম ক্যাপটি আন্তর্জাতিক ফুটবলেরও শেষ কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। ম্যাচ শেষে ক্রোয়াট কোচ জ্লাতকো দালিচ ইঙ্গিত দিয়েছেন, হয়তো নতুন প্রজন্মের দিকে বৃহত্তর একটা পালাবদল আসছে। পাওলো মালদিনির সমান উচ্চতায় দাঁড়িয়ে তিনি শেষ করলেন তার বিশ্বকাপ যাত্রা। একটি ফাইনাল, একটি সেমিফাইনাল, আর ২৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচের গৌরবময় সংগ্রহ নিয়ে। তার চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন কেবল চারজন, তাদেরই একজন রোনালদো।

তবে মডরিচের গল্প কখনই শুধু একজন মিডফিল্ডারের গল্প ছিল না। এটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশের পুনর্জন্মের গল্প। যে শিশুটি গোলার শব্দে বড় হয়েছে, শরণার্থী শিবিরে রাত কাটিয়েছে, যার দাদাকে যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছিল, সেই শিশুই একদিন পুরো পৃথিবীকে শেখাল ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও ইতিহাস লিখতে পারে।

ক্রোয়েশিয়া ইউরোপের মানচিত্রে ছোট। কিন্তু মডরিচের পায়ে বল থাকলে সেই দেশটিই হয়ে উঠত প্রতিপক্ষের জন্য সমীহ জাগানিয়া। হোমারের ওডিসিউস যেমন কখনো শক্তিতে নয়, প্রজ্ঞায় জয় করেছিলেন দীর্ঘ যাত্রা, মডরিচও তেমনি ফুটবলের মহাসাগর পাড়ি দিয়েছেন বুদ্ধি, ধৈর্য আর সৌন্দর্য দিয়ে। তিনি ছিলেন না দ্রুততম। ছিলেন না সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু তিনি ছিলেন সেই মানুষ, অন্যরা যেখানে দেয়াল দেখেছে, তিনি সেখানে জানালা খুঁজে পেয়েছেন।

২০১৮ সালে বিশ্বকাপের ফাইনাল। ২০২২ সালে তৃতীয় স্থান। মাঝখানে গোল্ডেন বল, ব্রোঞ্জ বল, ব্যালন ডি’অর। এমন অর্জন কোনো পরিসংখ্যানের তালিকা নয়, এগুলো একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের স্থপতির জীবনবৃত্তান্ত। পর্তুগালের বিপক্ষেও তার শেষ ম্যাচটি ছিল যেন সেই পুরনো দাবাড়ুর শেষ চাল। কখনো সেন্টার ব্যাকের পাশে নেমে খেলা গড়ছেন, আবার মুহূর্তেই গভীর থেকে দৌড়ে উঠে যাচ্ছেন সবচেয়ে সামনের খেলোয়াড় হয়ে। বয়স বলছিল চল্লিশ। কিন্তু চিন্তার গতি এখনো বিশের।

রাফায়েল লেয়াও যখন বাম প্রান্ত ধরে ঝড় তুলছিলেন, তখনো তার পেছনে প্রাণপণে ছুটছিলেন মডরিচ। হয়তো ধরতে পারবেন না, তবুও ছুটছিলেন। কিছু মানুষ জেতার জন্য নয়, আত্মসমর্পণ না করার জন্য দৌড়ায়। রবার্তো মার্তিনেজ তাই মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘সে তরুণের মতো খেলে।’ কথাটি শরীর নিয়ে নয়, মন নিয়ে। কারণ তার সবচেয়ে বড় পেশি ছিল হৃদয়।

তিনি এমন এক দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যে দেশের জনসংখ্যা পৃথিবীর অনেক শহরের চেয়েও কম। তবু সেই দেশকে দুবার বিশ্বকাপের শেষ চার পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। যুক্তি যেখানে থেমে গেছে, সেখানে শুরু হয়েছে মডরিচের অলৌকিকতা। তিনি হয়তো ট্রফি জেতেননি। কিন্তু একটি দেশের আত্মপরিচয় বদলে দিয়েছেন। পৃথিবী যখন ক্রোয়েশিয়া উচ্চারণ করে, তখন আর শুধু বলকানের একটি রাষ্ট্রকে বোঝায় না; বোঝায় এক অবিশ্বাস্য জেদ, এক অবিনাশী সাহস, এক অসম্ভব বিশ্বাসের নাম।

তার পায়ের জাদু যতটা অপার্থিব ছিল, হৃদয় প্রশস্ত ছিল ততটাই। তিনি ছোট্ট ক্রোয়েশিয়াকে দেখিয়েছিলেন কীভাবে ইতিহাসের মিছিলে হাঁটতে হয়, কীভাবে অসম্ভবকে বাস্তবে পরিণত করতে হয়। বিশ্বকাপ তার শেষ দেখলেও ফুটবল ইতিহাসে নাম লেখা থাকবে সোনার অক্ষরে। একজন অসম্ভবের কারিগর, একজন অদম্য যোদ্ধা, একজন কিংবদন্তি হিসেবে।

ফুটবলের লোককথায় এমন কিছু চরিত্র থাকে, যাদের উপস্থিতি খেলার সীমানা ছাড়িয়ে যায়। দিয়েগো ম্যারাডোনা যেমন আর্জেন্টিনার আত্মা, ইয়োহান ক্রুইফ যেমন নেদারল্যান্ডসের দর্শন, তেমনি লুকা মডরিচ হয়ে থাকবেন ক্রোয়েশিয়ার অলৌকিকতার অন্য নাম।

আরও