ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করে আসছে। রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শন করে খেলোয়াড়দের জরিমানা এবং নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হওয়ার ঘটনাও প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু গত শুক্রবার রাতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ফিফা শান্তি পুরস্কার তুলে দিয়ে রিপাবলিকান নেতার প্রতি নিজের সমর্থনকে আরো জোরালোভাবে প্রদর্শন করলেন। আরও পাকাপোক্ত করলেন।
ওয়াশিংটনে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠান যতটা ফুটবলকেন্দ্রিক হওয়ার কথা ছিল, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সেটিকে ততটাই রূপ দিলেন এক বিব্রতকর রাজনৈতিক নাটকে। ইনফান্তিনোর আচরণ যেন করপোরেট তোষামোদ আর হাস্যকর বাগাড়ম্বরের এক নতুন উদাহরণ তৈরি করল। গোটা অনুষ্ঠানের যে অংশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি ছিল, তার মূল লক্ষ্যই ছিল 'ফিফা শান্তি পুরস্কার' বিতরণ। আর এই পুরস্কারকে কেন্দ্র করে ইনফান্তিনোর অতি উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ফিফা সভাপতি তখন এমনই তোষামোদে নেমে পড়লেন যে, অনুষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে হয়ে দাঁড়ায় উপহাসের কারণ।
ফিফা সভাপতি অতীতেও একাধিকবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন কিছু কথা বলেছেন যা চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এবারের ঘটনা ছিল অন্য পর্যায়ের। শুরুতেই ইনফান্তিনোর বক্তব্য জুগিয়েছে চরম হাসির খোরাক। একপর্যায়ে তিনি দর্শকদের কাছে বিশ্বকাপ আয়োজক তিন দেশের (ইউএসএ, কানাডা, মেক্সিকো) নাম ধরে জয়ধ্বনি দেয়ার দাবি জানান। এ অংশ দেখে মনে হচ্ছিল যেন, ফিফা আয়োজিত বৈশ্বিক আসরের সমস্ত শালীনতা ব্যর্থ এবং ইনফান্তিনো নিজেই তার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন!
এরপর মঞ্চে রবি উইলিয়ামস এসে গান গেয়ে পরিস্থিতি কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করেন। তবে হোস্ট হেইডি ক্লুম এবং কেভিন হার্টের সঙ্গে উইলিয়ামস ও নিকোল শারজিঙ্গারের হ্যান্ডওভার এতই অস্বস্তিকর ছিল যে, দর্শককক্ষে যেন শ্বাস চেপে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়!
এরপর আসে রাতের মূল আকর্ষণ— তথাকথিত 'শান্তি পুরস্কার'। ভয়েসওভারে এমন মহাকাব্যিক ধ্বনি ভেসে আসে যেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো প্রচারণামূলক ভিডিও চলছে। এরপর ইনফান্তিনো মঞ্চে ফিরে আসেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সুইস প্রশাসক যেন তার স্বপ্নকে অন্যদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছেন! ইনফান্তিনো ঘোষণা করেন ট্রাম্প নাকি ছয়টি বৈশ্বিক সংঘাত থামিয়েছেন। তবে এ ছয়টি সংঘাতের অনেকগুলোকে ট্রাম্প নিজেই পরে ‘যুদ্ধ ছিলই না’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্পের পুরষ্কারের সঙ্গে দেয়া সার্টিফিকেট পড়ে শোনাচ্ছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ছবি- এপি
ইনফান্তিনো দাবি করেন, তিনি বেশিরভাগ ‘শান্তি আলোচনায়’ উপস্থিত ছিলেন—আব্রাহাম অ্যাকর্ডস থেকে শুরু করে কম্বোডিয়া–থাইল্যান্ড, এমনকি রুয়ান্ডা–কঙ্গো আলোচনাতেও। সমালোচকদের মতে, ফুটবল নয়, ফিফা প্রেসিডেন্টের ভূমিকা এখন বেশি হয়ে উঠেছে ট্রাম্পের রাজনৈতিক মঞ্চে অনুসারীর মতো উপস্থিত থাকা।
মঞ্চে ট্রাম্পের উপস্থিতিতে ইনফান্তিনো আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমরা সারা বিশ্বে যুদ্ধের ছবি দেখি, এবং অন্য সবার মতো আমরাও কষ্ট পাই... আমরা আশা দেখতে চাই। একজন নেতার কাছ থেকে আমরা এটাই চাই! একজন নেতা যিনি জনগণের প্রতি যত্নশীল!’
এবার নজরে আসে বিশাল সোনালি শান্তির প্রতীকটি—যার নকশায় ছিল বিচ্ছিন্ন হাতের মতো চিত্র। এ ছবিও সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরসের জন্ম দেয়। পুরস্কারের সঙ্গে ছিল এক স্কুল–স্টাইল মেডেল ও সার্টিফিকেট, যা ইনফান্তিনো আমলাতান্ত্রিক ভঙ্গিতে অত্যন্ত গাম্ভীর্য নিয়ে পড়ে শোনান।
ট্রাম্পের সামনে ইনফান্তিনোর এ নজিরবিহীন নতজানু ভঙ্গি দর্শকের দৃষ্টি এড়ায়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের ভাষ্যমতে— অনুষ্ঠান শেষে স্পষ্ট, ইনফান্তিনো যাদের উদ্দেশে এই মরিয়া তোষামোদ চালিয়ে গেলেন তারা সাধারণ দর্শক নন, ফিফার অদৃশ্য ও শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকগোষ্ঠী। আর তাদের সন্তুষ্ট করতে তিনি ফুটবল প্রশাসনের শীর্ষ পদকেও ব্যক্তিগত নাট্যমঞ্চে পরিণত করতে দ্বিধা করেন না।
ইনফান্তিনো এর আগে ফুটবলকে বিভেদ উসকে দিতে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি বলেছিলেন, 'মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য খেলার চেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার আর নেই। এখন আমাদের খেলার স্বশাসন, খেলার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং খেলার মূল্যবোধ রক্ষা করতে হবে।'
সে কথা বলার দুই বছর পর সমালোচকরা বলছেন, ইনফান্তিনো শান্তি ও ঐক্যের জন্য একটি পুরস্কার তৈরি করলেন, অথচ পুরস্কারটি এমন একজন প্রেসিডেন্টকে দিলেন যিনি মাত্র কিছুদিন আগেই সোমালিয়ার মানুষদের 'আবর্জনা' বলে অভিহিত করেছেন।
ফুটবল সাংবাদিক জ্যাক লোয়ি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, 'ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তির পুরস্কার দেয়াটা অনেকটা লুইস সুয়ারেজকে মানুষের কান কামড়ে না ধরার জন্য পুরস্কার দেয়ার মতো।'