লিসবনে ত্রুবিন-কাব্য

গোলরক্ষকের হেডে মাদ্রিদকে প্লে-অফে পাঠালো মরিনহোর বেনফিকা

৯৭ মিনিটের মাথায় যখন গোলরক্ষক আনাতোলি ত্রুবিন প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ালেন, তখন রিয়াল মাদ্রিদের দম্ভ চুরমার হয়ে গেল আর বেনফিকা ভাসল এক অলৌকিক আনন্দের বন্যায়। ৪-২ ব্যবধানের এই জয়ে মরিনহোর দল শুধু জিতলই না, রিয়াল মাদ্রিদকে প্লে-অফের কঠিন লড়াইয়ের মুখে ঠেলে দিল।

ফুটবল কেন সুন্দর, কেন নিষ্ঠুর, আর কেন এটি পৃথিবীর সবচেয়ে অনিশ্চিত খেলা—তার প্রমাণ মিলল লিসবনের এস্তাদিও দা লুজ স্টেডিয়ামে। বৃষ্টির ঝাপটায় ভেজা সেই রাতে ফুটবল ঈশ্বর যেন নিজের হাতে এক নতুন চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। ৯৭ মিনিটের মাথায় যখন গোলরক্ষক আনাতোলি ত্রুবিন প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ালেন, তখন রিয়াল মাদ্রিদের দম্ভ চুরমার হয়ে গেল আর বেনফিকা ভাসল এক অলৌকিক আনন্দের বন্যায়। ৪-২ ব্যবধানের এই জয়ে মরিনহোর দল শুধু জিতলই না, রিয়াল মাদ্রিদকে প্লে-অফের কঠিন লড়াইয়ের মুখে ঠেলে দিল।

বৃষ্টিভেজা রাতে ফুটবল যেন নিজের সমস্ত যুক্তি ছুড়ে ফেলে দিয়ে আলিঙ্গন করল উন্মাদনাকে। বেনফিকা ৪, রিয়াল মাদ্রিদ ২—স্কোরলাইনের এই সাধারণ সংখ্যাগুলোর আড়ালে লুকিয়ে রইল চ্যাম্পিয়নস লিগের একেবারে এক পাগলাটে রাতের গল্প, যেখানে শেষ কথা বললেন একজন গোলরক্ষক। শুরু থেকেই বেনফিকা খেলল যেন জীবন-মরণ বাজি রেখে— প্রচণ্ড চাপ, প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই, জয়ের ক্ষুধা আর গ্যালারির গর্জনে রিয়াল মাদ্রিদকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিল তারা। বাতিল হওয়া পেনাল্টি, প্রেস্টিয়ানির বাঁকানো শট ঠেকিয়ে কর্তোয়ার উড়ে যাওয়া—সবকিছুতেই ছিল তার ইঙ্গিত। তবু নিয়তির মতো করেই ৩০ মিনিটে এমবাপ্পের হেডে এগিয়ে যায় মাদ্রিদ।

কিন্তু মরিনহোর বেনফিকার এদিন হারার জন্য নামেনি। ছয় মিনিট পরেই রাউল আসেনসিওর পা পিছলে যাওয়া, ডিফেন্সের বিশৃঙ্খলা আর শেলডারুপের সমতাসূচক গোল ম্যাচের সুর বদলে দেয়। হাফটাইমের আগে ওতামেন্দির শার্ট টানায় পেনাল্টি, আর সেখান থেকে পাভলিদিসের নির্ভুল ফিনিশিং। লিড নিল বেনফিকা।

বিরতির পর বেনফিকা শুরু করে যেখান থেকে বিরতিতে গিয়েছিল। আসেন্সিওকে ড্রিবলিংয়ে কুপোকাত করে শেলডারুপ যখন বল জালে জড়ালেন, তখন আনচেলত্তির উত্তরসূরি আরবেলোয়ার দলটিকে বড্ড অসহায় দেখাচ্ছিল। যদিও এমবাপে ৫৮ মিনিটে দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান কমিয়েছিলেন, কিন্তু মাঠের বাইরে অন্য ম্যাচের সমীকরণ বদলে দিচ্ছিল সবকিছু। হঠাৎ করেই দেখা গেল, গোল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার কারণে রিয়াল মাদ্রিদ শীর্ষ আট থেকে ছিটকে প্লে-অফ পজিশনে নেমে গেছে।

ম্যাচের শেষ কয়েক মিনিট নিছক ফুটবল ছিল না, ছিল স্নায়ুর যুদ্ধ। ইনজুরি টাইমে রদ্রিগো এবং আসেন্সিও লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে মাদ্রিদ ৯ জনের দলে পরিণত হয়। অন্য সব ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ায় বেনফিকা জানত, তাদের পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করতে আর মাত্র একটি গোল চাই।

ক্রুবিনের হেডার। ছবি- পিএ

আর তারপর ঘটে অসম্ভব কিছু। ৯৭ মিনিটে ফ্রি-কিক পাওয়ার পর ডাগআউট থেকে মরিনহো ইশারা করলেন গোলরক্ষক আনাতোলি ত্রুবিনকে বক্সে যাওয়ার জন্য। কর্তোয়ার বক্সে একজন গোলরক্ষক—এ দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল অবিশ্বাসের জন্য। কিন্তু তিনি লাফালেন, হেড করলেন, আর বল জড়াল জালে। লিসবনের মাটি কেঁপে উঠলো হাজারো মানুষের গর্জনে। মরিনহোর সেই চিরচেনা পাগলাটে উদযাপন আবারও দেখলো বিশ্ব। এক মুহূর্তে বেনফিকার ইউরোপীয় স্বপ্ন মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরে এল, আর রিয়াল মাদ্রিদ বুঝে নিল—চ্যাম্পিয়নস লিগে কিছুই নিশ্চিত নয়।

আর ফুটবল তার সমস্ত অনিশ্চয়তা নিয়ে নিজেকে মেলে ধরল আরো এক চ্যাম্পিয়নস লিগের রাতে, যেন লিসবনের প্রেক্ষাগৃহে এক 'অ্যাবসোল্যুট সিনেমা'।

আরও