২০২১ সালে ওয়াকট্রি ক্যাপিটাল চুপিসারে তাদের ‘দেউলিয়া ঋণ’ বিভাগটির নাম বদলে ‘সুযোগনির্ভর ঋণ’ রেখেছিল। লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক এই বিনিয়োগ সংস্থা বছরের পর বছর ধরে ধুঁকতে থাকা কোম্পানিগুলোর ‘দুর্দশার ভেতর লুকানো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ খুঁজে বের করাকেই তাদের কৌশল বানিয়েছিল। মানে আপনার কোম্পানি ডুবতে বসেছে, দেনায় জর্জরিত, দেউলিয়া হওয়ার মুখে—ঠিক তখনই আবির্ভাব ঘটে ওয়াকট্রির।
ওরা আসে, দেনাদারদের সঙ্গে কথা বলে, খরচ কাটছাঁট করে, উচ্চ সুদের ঋণ দেয় রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে, তারপর কোনো খদ্দের খুঁজে দিয়ে মোটা কমিশন নিয়ে বিদায়। চার বছর আগে কভিডে বিধ্বস্ত ইন্টার মিলানের দিকে নজর দিয়ে ঠিক এই ছকেই এগোয় ওয়াকট্রি।
ওয়াকট্রির ইচ্ছা ছিল না ইন্টারের মালিকানা নেয়ার। বরং, তারা চেয়েছিল চীনা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সুনিং যতদিন না ইন্টার বিক্রি করতে পারে, ততদিন ক্লাবটির মালিকানা বাঁচিয়ে রাখতে। কিন্তু দেনা বাড়তে থাকল, ব্যর্থ হল পুনর্গঠন, আগ্রহ হারালেন ক্রেতারা। অবশেষে গত মে মাসে সুনিং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রায় ডিফল্ট অবস্থাতেই ওয়াকট্রির হাতে চলে যায় ইন্টার। ‘দেউলিয়া ঋণ’ থেকে যাত্রা শুরু করা বিনিয়োগ এক বছরে পরিণত হয়েছে ‘সুযোগনির্ভর ঋণ’ এ—এটা ওয়াকট্রির পক্ষেও অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি।
সেই ইন্টার খেলছে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে। ইউরোপিয়ান ফুটবলের সেরা হওয়ার এই লড়াই কেবল মাঠেরই নয়, দর্শনেরও দ্বন্দ্ব।
একদিকে প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের নিঃশ্বাস বন্ধ করা আক্রমণ; অন্যদিকে ইন্টারের জমাট রক্ষণ। একদিকে তারুণ্যের মায়াবী ফুটবল, অন্যদিকে অভিজ্ঞতায় গড়া পরিশীলিত কাঠামো। একদলে গতিশীল উইঙ্গার, অন্যদলে উড়ন্ত উইং ব্যাক। কিন্তু সবকিছুর চেয়েও বড় যে বিভাজন তা হচ্ছে—ফুটবল ক্লাবের মডেল। কীসের জন্য এই ক্লাব, কাদের প্রতিনিধিত্ব করে, কীভাবে সাফল্য মাপে, আর পৌঁছাতে চায় কোথায়?
এ পর্যায়ে স্বীকার করতেই হয়— লুইস এনরিকের এই তরুণ পিএসজি দারুণ রোমাঞ্চকর, দারুণ বিনয়ী। আগের প্রজন্মের বিপরীতে তারা যেন মাটির অনেক কাছাকাছি। তবু বাস্তবতা থেকে পালানোর উপায় নেই। এই দল গড়তে গিয়ে হয়েছে চোখধাঁধানো খরচ। ঘরের ছেলে বলে পরিচিত দেজাইরে দোয়ের দামও ৪৫ মিলিয়ন পাউন্ড। ব্র্যাডলি বারকোলা ৪০ মিলিয়ন। কাভিশা কাভারাশখেইয়ার পেছনেই জানুয়ারিতে খরচ হয়েছে ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড। সম্মিলিত অংকটা অধিকাংশ ক্লাবের জন্যই কল্পনার বাইরে।
মোটা দাগে এমনটাই প্যারিসের সমীকরণ— অগাধ ধনসম্পদ + রাজতন্ত্র × নিখুঁত জনসংযোগ = সহজাত শ্রেণিমর্যাদা। দ্রুত ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি; যেন কাতারি সফট পাওয়ারের নতুন সংস্করণ। মোটা দাগে এটি এক ব্র্যান্ডিং অপারেশন। একটি রাষ্ট্রে যেখানে নারীরা স্বামীর চাহিদা মেনে না নিলে আর্থিক সহায়তাও হারাতে পারেন, সেই রাষ্ট্রের তরফ থেকে সুনাম গড়ে তোলার জন্য নিখুঁতভাবে সাজানো চেষ্টা।
আর তারা সেটা পারেও। পিএসজি ব্যর্থ খেলোয়াড় বাদ দিতে পারে, বড় অঙ্কের লোকসান বইতে পারে। কারণ তাদের লক্ষ্য একক কোনো ম্যাচ বা ট্রফির চেয়েও বড়—খেলাধুলার মাধ্যমে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা ভাবমূর্তি পরিশোধনেরও চেষ্টা এবং রাজনৈতিক প্রভাব।
ওদিকে, মার্কিন বিনিয়োগ মডেলটি অনেক বেশি নিরাবেগ। এখানে পিএসজির বিলাসিতা নস্যি, ইন্টার চলছে সবদিকে হিসাব-নিকাশ করে। আশরাফ হাকিমি কিংবা আন্দ্রে ওনানার মতো তারকা বিক্রি করতে হয় বয়স্ক, কম খরচের বদলি খেলোয়াড় কেনার জন্য। দলে তরুণ পরিকল্পনার জায়গা নেই। ইন্টারের স্টেডিয়াম মিউনিসিপাল, তাই কমার্শিয়াল ভ্যালু কম। যেখানে পিএসজির জার্সিতে থাকা কাতার এয়ারওয়েজ বছরে দেয় ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড, সেখানে ইন্টারের প্রস্তাব ছিল তার এক-চতুর্থাংশ।
অথচ ইন্টার যেভাবে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পৌঁছেছে, তা তাদের মূল্য এক লাফে বাড়িয়ে দিয়েছে ১ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি। তাই এখন সমর্থকরা যতই স্কোয়াডে বিনিয়োগ, নতুন স্টেডিয়াম বা ইনজাঘিকে ধরে রাখার দাবি তুলুক—ওয়াকট্রির মতো ঠান্ডা মাথার বিনিয়োগকারীর কাছে এটিই হয়তো লাভজনক সিদ্ধান্ত— ফাইনাল জিতুক আর হারুক, সমস্যা নেই, নিয়মিত বার্ষিক মুনাফা থাকলেই হলো।
নিরপেক্ষ দর্শক কিংবা ফুটবল শুদ্ধবাদীরা হয়তো ইন্টারের পাশেই দাঁড়াবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই দুই মডেলের কোনটি বেশি রোমান্টিক? সত্যি বলতে গেলে, কোনোটিই নয়। যেমন ওসমান দেম্বেলে কিংবা ওয়ারেন জাইর-এমেরি মাঠে নেমে খেলেন না কাতারি বিনিয়োগ ফান্ডের হয়ে, তেমনি ওয়াকট্রি খেলছে না কারভা নর্ডের জন্য, হারেরা ও ফাকেত্তির স্মৃতির জন্য বা ইতালীয় ফুটবলের গৌরব রক্ষায়।
যতদিন না ক্লাবগুলো সত্যিকারের অর্থে সমর্থকদের অধিকারে ফিরে আসে, ততদিন এই ধরনের সমঝোতাই বাস্তবতা। একদিকে ভূ-রাজনীতির বাহন, অন্যদিকে শীতল মুনাফার কারখানা। একপাশে রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন, অন্যপাশে নিছক পুঁজিবাদ।
দ্য অ্যাথলেটিক অবলম্বনে