চলতি বিশ্বকাপের ফুটবল মাঠে সেই ফ্যালানক্সের প্রতিচ্ছবি যেন দেখা যাচ্ছে কেপ ভার্দের রক্ষণে। কোনো একক নায়ক নেই, নেই ভুবনভোলানো তারকার দ্যুতি। আছে শুধু লৌহকঠিন শৃঙ্খলা, কমপ্যাক্ট ডিফেন্স, দুই লাইনের মাঝে নিখুঁত জ্যামিতিক দূরত্ব, একজন পজিশন ছেড়ে বেরিয়ে গেলে আরেকজন তাৎক্ষণিক কাভার, আর প্রতিপক্ষের জন্য মাঝখানটা সংকুচিত করে সব পাসিং লেন বন্ধ করে দেয়ার সমষ্টিগত দক্ষতা। স্প্যানিশ আর্মাডাকে অকার্যকর করা, সৌদি আরবকে গোলশূন্য রাখা, উরুগুয়ের সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই—গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে এমন জমাট রক্ষণকাব্য লিখেই শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে আফ্রিকার দলটি। আগামীকাল ভোর ৪টায় তাদের সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীরের সামনে নামবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে কেপ ভার্দের অভেদ্য ফ্যালানক্সে চিড় ধরিয়ে জাদুকরী জ্যামিতিক কোণের সন্ধান করতে হবে মেসি-মার্টিনেজদের।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অংশগ্রহণেই কেপ ভার্দে যা করেছে, সেটিকে নিছক অঘটন বললে ভুল হবে। স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবকে নিয়ে গঠিত গ্রুপ থেকে অপরাজিত থেকে তারা নকআউটে উঠেছে। স্পেনের বিপক্ষে গোলরক্ষক ভোজিনহার সাতটি অবিশ্বাস্য সেভ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র তাদের লিখিয়ে দেয় নতুন ইতিহাস—জয়ের স্বাদ না নিয়েই বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠা প্রথম দল হিসেবে। তবে পরিসংখ্যানের আড়ালে সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণ। প্রতিপক্ষের পায়ে বল ছেড়ে দিয়ে নিচু ব্লকে অপেক্ষা করা, দুই লাইনের মধ্যকার দূরত্ব খুব কম রাখা এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠা—এ কৌশলেই বুবিস্তার দল প্রতিপক্ষকে বারবার হতাশ করেছে।
কাগজে-কলমে বা ফুটবলীয় যে মাপকাঠিতেই বিচার করা হোক আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেয়ার কোনো সম্ভাবনাই কেপ ভার্দের থাকার কথা নয়। ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াইয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের সামনে তারা নিতান্তই ‘পুঁচকে’ দল। কিন্তু আফ্রিকার এ দ্বীপরাষ্ট্রটি এরই মধ্যে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। অভিষেক বিশ্বকাপের অবিশ্বাস্য যাত্রাকে আরো দীর্ঘ করতেও তারা প্রস্তুত। সহকারী কোচ হুম্বার্তো বেত্তেনকুর্তের কথাতেও আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। তার ভাষায়, ‘পরিসংখ্যান কেবল তত্ত্ব। আসল বিষয়টি নির্ধারণ হয় মাঠের চার লাইনের ভেতরে।’ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েও নিজেদের খেলার ধরন বদলানোর কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের। মেসিকে আলাদা করে ম্যান-মার্ক করারও ইচ্ছা নেই। বরং লক্ষ্য থাকবে পুরো আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ন্ত্রণ করা, সম্ভাব্য পাসিং লেন বন্ধ করে দেয়া এবং মেসির জন্য তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গাগুলো সংকুচিত করা।
কিন্তু এমন ফ্যালানক্স ভাঙার শিল্পই তো বহুদিন ধরে রপ্ত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল। দীর্ঘ সময় বল নিজেদের পায়ে রেখে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে প্রতিপক্ষকে টেনে নেয়া, মাঝমাঠে সংখ্যাধিক্য তৈরি করে অদৃশ্য ফাটল খুঁজে বের করা, তারপর সেই সূক্ষ্ম চিড়টুকুতে মেসির একটি পাস আর তাতেই মুহূর্তে ভেঙে পড়ে এতক্ষণ অভেদ্য মনে হওয়া প্রতিরক্ষা। প্রতিপক্ষ যত বেশি গুটিয়ে থাকে, আলবিসেলেস্তেদের ধৈর্য তত বাড়ে। আর একবার রক্ষণভাগের শৃঙ্খলায় সামান্য চিড় ধরলেই মেসির চোখ এড়ায় না সেই অর্ধগজ জায়গাও। তার ওপর আর্জেন্টিনা নকআউটে এসেছে একেবারে নিখুঁত ছন্দে। লিওনেল মেসি করেছেন ছয় গোল, যার মধ্যে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ছিল দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। গোলদাতাদের সিংহাসনের দৌড়ে এমবাপ্পেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এখন সবার সামনে। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে নিজেকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিতে নিশ্চয়ই মুখিয়ে থাকবেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী।
এ ম্যাচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্বৈরথ অবশ্যই মেসি বনাম কেপ ভার্দের কমপ্যাক্ট ব্লক। মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রতিপক্ষের দুই লাইনের মাঝখানে ক্ষুদ্রতম ফাঁক খুঁজে নেয়া। কেপ ভার্দে সেই জায়গাটিই বন্ধ রাখতে চাইবে। কেভিন পিনা, দেরয় দুয়ার্তে ও জামিরো মনতেরোকে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে, যেন মেসি বল পেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না পান। কিন্তু সমস্যা হলো গত দুই দশক ধরে বিশ্বের সেরা রক্ষণভাগগুলোও ঠিক এ কাজটি করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনির সামনে আপাতত কোনো ইনজুরি সমস্যা নেই। গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ থাকবেন। তার সামনে স্কালোনি ৪-৪-২ ফরমেশনে দল সাজাবেন, যা বল পায়ে থাকলে ৪-৩-৩-এ রূপ নিতে পারে। রক্ষণভাগে থাকতে পারেন গঞ্জালো মন্তিয়েল, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এবং ফাকুন্দো মেদিনা। লিসান্দ্রো মার্টিনেজের নিচ থেকে বল বিল্ডআপ করার ক্ষমতা আর্জেন্টিনার পজেশনভিত্তিক খেলার মূল ভিত্তি হবে। মিডফিল্ডে রদ্রিগো ডি পল ‘ডেস্ট্রয়ার’ হিসেবে খেলবেন, যা ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজকে আরো আক্রমণাত্মক খেলার সুযোগ দেবে। থিয়াগো আলমাদা লেফট উইংয়ে থাকবেন, আর লাউতারো মার্টিনেজ ও লিওনেল মেসি আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেবেন।
আর্জেন্টিনার আরেকটি বড় অস্ত্র হতে পারে সেটপিস। কর্নার কিংবা ফ্রিকিক থেকে মেসির নিখুঁত ডেলিভারি, রোমেরো ও লিসান্দ্রোর বাতালে বল দখলের ক্ষমতা এবং সেকেন্ড বল সংগ্রহে ম্যাক অ্যালিস্টার-দে পলদের উপস্থিতি কেপ ভার্দের জন্য বাড়তি মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। ওপেন প্লেতে যদি ফ্যালানক্স অটুটও থাকে, ডেড বলের মুহূর্তে ১ সেকেন্ডের অসতর্কতাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
বাস্তবতা বলছে, আর্জেন্টিনাই স্পষ্ট ফেভারিট। শুধু তারকায় নয়, গতি, সৃজনশীলতা, বলের দখল, নকআউট অভিজ্ঞতা প্রায় প্রতিটি বিভাগেই এগিয়ে স্কালোনির দল। তবু বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে পরিসংখ্যানের চেয়ে সাহস, শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। সেই বিশ্বাস নিয়েই হার্ড রক স্টেডিয়ামে নামবে কেপ ভার্দে। আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসের যুদ্ধক্ষেত্রে ফ্যালানক্স ভাঙতে দরকার হতো ধৈর্য, কৌশল এবং সঠিক মুহূর্তে সঠিক আঘাত। মিয়ামির রাতেও প্রশ্নটা খুব আলাদা নয়। লিওনেল মেসির বাঁ পা কি কেপ ভার্দের সেই ফ্যালানক্সে প্রথম ফাটল ধরাবে, নাকি আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি উপহার দেবে আরেকটি রূপকথার অধ্যায়?