ফুটবল ফর দ্য ফিউচার, কমন গোল ও জুপিটার ইন্টেলিজেন্সের প্রতিবেদন

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে তাপপ্রবাহ

জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা না নেয়া হলে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপই হয়ে উঠতে পারে উত্তর আমেরিকা মহাদেশে আয়োজিত শেষ বিশ্বকাপ। ফুটবল ফর দ্য ফিউচার, কমন গোল ও জুপিটার ইন্টেলিজেন্স নামের তিনটি সংস্থার এক যৌথ গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত ‘পিচেস ইন পেরিল’ প্রতিবেদনে এ আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আগামী বছরের বিশ্বকাপের আয়োজক ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে ১০টিই তীব্র তাপপ্রবাহের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর চূড়ান্ত পর্যায়ের পর্দা উন্মোচন হবে আগামী বছরের ১১ জুন। আর আয়োজনের সমাপ্তি ঘটবে ১৯ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে। এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৩২টির পরিবর্তে ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি স্টেডিয়ামকে বিশ্বকাপের ভেন্যু হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টিতেই চলতি বছরে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তিন ধরনের আবহাওয়াগত বিপত্তি তীব্র আকার ধারণ করতে দেখা গেছে। এগুলো হলো তীব্র গরম, খেলা আয়োজনের অযোগ্য মাত্রায় বৃষ্টিপাত ও বন্যা।

যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের জুন-জুলাইয়ে আয়োজিত হয় ফুটবল ক্লাব বিশ্বকাপ। এতে অংশ নেয়া ক্লাবগুলোর খেলোয়াড়রা অভিযোগ তুলেছেন, আবহাওয়াগত বিপত্তির কারণে জুন-জুলাইয়ের এ সময়টায় খেলাই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। টুর্নামেন্টে প্রচণ্ড গরম ও বজ্রপাতসহ ঝড়ের কারণে ফিফাকে খেলার প্রোটোকল বদলে ফেলতে হয়। খেলা চলাকালে কুলিং ব্রেক ও পানির বিরতি নেয়ার পাশাপাশি ছায়াযুক্ত বেঞ্চ ও ফ্যান যুক্ত করা হয়।

আয়োজক দেশগুলোয় প্রতি বছরের জুন-জুলাই সময়টিতে গরম বেশ তীব্র আকার ধারণ করে। তিন সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি স্টেডিয়ামের ১৩টিতে প্রতি গ্রীষ্মে অন্তত একদিন তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওয়েট-বাল্ব গ্লোবাল টেম্পারেচার (ডব্লিউবিজিটি) অতিক্রম করে যায়। ফিফার প্রটোকলে এটিকে পানি বিরতির সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা রয়েছে। আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, মায়ামি ও মন্টেরের তাপমাত্রা টানা দুই মাস বা তার বেশি সময় ধরে এ মাত্রা ছাড়াতে দেখা গেছে।

ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬

প্রসঙ্গত, ডব্লিউবিজিটি হলো এক ধরনের পরিবেশ সূচক যা বাতাসের তাপমাত্রা, গতি, আর্দ্রতা, সূর্যালোকের বিকিরণ ও বাতাসের প্রবাহ ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মানবদেহে হিট স্ট্রেসের মাত্রা নির্ধারণ করে থাকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আয়োজক ভেন্যুগুলোর মধ্যে ১০টিতে প্রতি গ্রীষ্মে অন্তত একদিন ডব্লিউজিটি ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে স্পর্শ করে, যেটিকে মানুষের সহনক্ষমতার সীমা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন জলবায়ুবিদরা। এর মধ্যে ডালাসে ৩১ দিন ও হিউস্টনে ৫১ দিন এমন চরম গরম থাকে।

যদিও ডালাস ও হিউস্টনের স্টেডিয়ামে ছাদ দিয়ে গরম কমানোর চেষ্টা করা হবে, তবে জলবায়ু ঝুঁকি এলিট ভেন্যুর বাইরেও বিস্তৃত।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইউনিভার্সিটি অব লিডসের প্রিস্টলি সেন্টার ফর ক্লাইমেট ফিউচারসের পরিচালক পিয়ার্স ফস্টার বলেন, ‘আমরা যত এগোচ্ছি, ঝুঁকিও তত বাড়ছে। টুর্নামেন্ট শীতকালে বা ঠাণ্ডা অঞ্চলে সরিয়ে নেয়ার মতো বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।’

বিশাল মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভেন্যুগুলোয় ৪৮ দেশের অংশগ্রহণে মোট ১০৪টি ম্যাচ আয়োজনের কারণে সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রেসপন্সিবিলিটি (এসজিআর), এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ড ও স্পোর্ট ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক ২০২৬ সালের ফুটল বিশ্বকাপকে ‘জলবায়ুর জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষতিকর বিশ্বকাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ফুটবল ফর দ্য ফিউচার, কমন গোল ও জুপিটার ইন্টেলিজেন্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিশ্বকাপের পরেও উত্তর আমেরিকা মহাদেশটিতে পরিস্থিতি দিনে দিনে আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে মহাদেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেডিয়ামে তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।

বর্তমান ও সাবেক ফুটবলারদের মধ্যেও এখন বিষয়টি নিয়ে বেশ উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। ভ্যালেন্সিয়ায় গত বছরের বন্যার কথা উল্লেখ করে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় হুয়ান মাতা বলেন, ‘স্পেনের মানুষ হিসেবে আমি জলবায়ু সংকটকে উপেক্ষা করতে পারি না। ফুটবল সবসময় মানুষকে এক করেছে। কিন্তু এখন এটি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে আমরা কী হারাতে যাচ্ছি।’

৯৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ফুটবল শিল্প সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে ২০৪০ সালের মধ্যে নেট-জিরো লক্ষ্য গ্রহণ এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি টুর্নামেন্ট আয়োজকদের জলবায়ু অভিযোজন তহবিল গঠনেরও আহ্বান জানানো হয় এতে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আয়োজক তিন দেশের ৩ হাজার ৬০০ ফুটবল ভক্তের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে; তাদের ৯১ শতাংশই চায় যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন হিসেবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ জলবায়ুগত দিক থেকে টেকসই একটি আয়োজনের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক।

আরও