ভলিবল কোর্ট মাতাচ্ছেন অলিম্পিক সাঁতারু

অ্যাশলে বার্টি ক্রিকেট ছেড়ে টেনিস, আবার টেনিস ছেড়ে গলফার হয়েছেন। এলিস পেরি ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেটকেই বেছে নিয়েছেন।

অ্যাশলে বার্টি ক্রিকেট ছেড়ে টেনিস, আবার টেনিস ছেড়ে গলফার হয়েছেন। এলিস পেরি ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেটকেই বেছে নিয়েছেন। বিশ্বে এমন উদাহরণ অনেক। তবে বাংলাদেশে এমন সংখ্যা হাতেগোনা। বাংলাদেশের এক সব্যসাচী ক্রীড়াবিদ ডলি আক্তার। বাংলাদেশের ইতিহাসেই অন্যতম সেরা ও সফল সাঁতারু। পুল থেকে ঈর্ষণীয় সফলতা পাওয়া এ অ্যাথলেট সাঁতার ছাড়ার পর এখন মাতাচ্ছেন ভলিবল কোর্ট। খেলেন আনসার ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে। 

২০০৪ সাল। এথেন্স অলিম্পিক গেমসে মেয়েদের ৫০ মিটার ফ্রি স্টাইল সাঁতারে ৫ নম্বর লেনে সবাইকে পেছনে ফেলে ডলি আক্তার পৌঁছে গেলেন গন্তব্যে। ফিনিশিং মার্ক স্পর্শ করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল ডলির ছবি, সঙ্গে বাংলাদেশের নামটিও জ্বলজ্বল করছিল। প্রথম হন লাল-সবুজ জার্সিধারী এ নারী। 

ডলি ইভেন্টে স্বর্ণ জেতেননি কিংবা বিশ্বরেকর্ডও গড়েননি। তবু তাকে ঘিরে ধরেন সংবাদকর্মীরা। বাংলাদেশী অ্যাথলেটদের জন্য অলিম্পিক মানেই ‘‌অংশগ্রহণেই গৌরব’-এর মধ্যে আটকে রয়েছে এখনো। তাই হিটে প্রথম হওয়ায় ডলিকে ঘিরে উন্মাদনা তৈরি হয়। তিনি ৩০.৭২ সেকেন্ডে ৫০ মিটার ফ্রি স্টাইল শেষ করে ৭৩ জনের মধ্যে ৬১তম হন। আর প্রথম হয়েছিলেন ১ নম্বর হিটে। তাই তাকে নিয়ে বাংলাদেশীদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের যেন শেষ ছিল না। 

এছাড়া ২০০০ সালের সিডনি ও ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে অংশ নেন ডলি। তিনটা অলিম্পিকে অংশ নিলেও এথেন্সকেই এগিয়ে রাখতে চান তিনি। বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমি ‌তিনটা অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেছি। ২০০০, ২০০৪ ও ২০০৮। এথেন্সে একটা হিটে ফার্স্ট হয়েছিলাম, এটাই আমার ভালো লাগে। ‌২০০৪ সালের আগস্টের গ্রিসের ওই সময়টার কথা কখনই ভুলব না। মিডিয়ার ভাইয়েরা, অলিম্পিক ও সাঁতার ফেডারেশনের কর্মকর্তারা সাঁতার শেষে আমাকে সাবাশ সাবাশ বলেছিলেন। যদিও পারফরম্যান্স কিছুই ছিল না। হিটে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলেছিলাম আর টাইমিং ভালো হয়েছিল মাত্র। সব মিলিয়ে এথেন্সকেই আমি এগিয়ে রাখব।’

অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ করাই যেকোনো অ্যাথলিটের আজীবনের স্বপ্ন থাকে। ডলি আক্তার সেই স্বপ্নপূরণ করেছিলেন মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ২০০০ সালের সিডনি অলিম্পিকে অংশ নিয়ে। এরপর এথেন্স ও বেইজিং অলিম্পিকেও খেলেছেন। বাংলাদেশীদের মধ্যে তিনটি অলিম্পিকে অংশ নেয়ার সৌভাগ্য এখন পর্যন্ত ডলিরই। 

অলিম্পিক গেমসের মতো ক্রীড়ার মহাযজ্ঞে মাত্র ১৪ বছরের এক কিশোরী অংশগ্রহণ অনেক বড় গৌরবের ছিল। যদিও সিডনিতে ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে কোয়ালিফাই করতেই পারেননি। হয়েছিলেন ডিসকোয়ালিফায়েড। এ নিয়ে ডলি আক্তার বলেন, ‘‌আমি তখন অনেক ছোট। সাঁতার শুরুর দিকে দর্শকদের মধ্যে থেকে কয়েকবার বাঁশির আওয়াজ আসছিল। তাতে আমি দ্বিধায় পড়ে যাই। পরে কেঁদেছিলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আবার যখন খেলব এ বিষয়টা মনে রাখব। এরপর আমি আর কখনো ডিসকোয়ালিফায়েড হইনি।’

সাঁতারে ডলির অবিশ্বাস্য অর্জন। ঘরোয়া সাঁতারের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে দুইশরও বেশি পদক জিতেছেন! তিনটি অলিম্পিক ছাড়াও অংশ নেন সাঁতারে চারটি সাফ (এসএ) গেমস, দুটি ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ, একটি এশিয়ান গেমস, একটি কমনওয়েলথ গেমস ও ইন্দো-বাংলা গেমসের তিনটি আসরে। সপ্তম বাংলাদেশ গেমসের ৯ ইভেন্টে অংশ নিয়ে ৯টিতেই স্বর্ণ জিতেছিলেন নতুন জাতীয় রেকর্ডসহ। অষ্টম বাংলাদেশ গেমসে একটি ইভেন্টে খেলে সেরা হন ডলি।

সাঁতারের এ তারকা এখন ভলিবলেও পেশাদার খেলোয়াড়। ২০১৬ সালের পর সাঁতারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ আর খেলেননি। পুরো মনোযোগ দেন ভলিবলে। তিনি এখন বাংলাদেশ জাতীয় ভলিবল দলের খেলোয়াড়। ২০১৯ সালে নেপালের কাঠমান্ডু এসএ গেমসে খেলেছেন। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে বসার কথা পরবর্তী এসএ গেমস। সেটিতে অংশগ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন সব্যসাচী এ খেলোয়াড়। 

সুইমিং দিয়ে পেয়েছেন তারকাখ্যাতি, আর পরবর্তী সময়ে বেছে নেন ভলিবল এবং তা কোনো শখের বশে নয়, তিনি খেলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের জার্সি পরে। এ দুটি খেলার মধ্যে তিনি সুইমিংকেই এগিয়ে রাখতে চান? বণিক বার্তাকে ডলি বলেন, ‘‌‌সুইমিংটাই আমার নেশা ছিল, পাশাপাশি ভলিবলটাও শুরু থেকে ভীষণ পছন্দ করতাম।’

সুইমিংয়ের মতো সাফল্য না পেলেও ভলিবলের অর্জন নিয়ে তিনি গর্বিত। ডলি বলেন, ‘ভলিবলটা আমি খুবই পছন্দ করি। ইন্টারন্যাশনাল ও ঘরোয়া পর্যায়ে খেলি। বাইরে ট্যুর করে এসেছি তিন-চারটা। এসএ গেমসেও দেশের হয়ে খেলেছি।’

রাজবাড়ী সদরের মেয়ে ডলির জন্ম ১৯৮৬ সালের ১৫ জানুয়ারি। বাবা মো. রওশন আলী ও মা আমেনা বেগম। দুই ভাই-বোন তারা। শৈশব থেকেই সাঁতারের প্রতি টান তার। রাজবাড়ী স্টেডিয়ামের পাশের পুকুরে সাঁতরাতে চলে যেতেন বাবাকে না জানিয়ে। রাজবাড়ী থেকে উঠে এসে পরবর্তী সময়ে তিনি হয়েছেন দেশের ইতিহাসে সেরা সাঁতারু। জাতীয় পর্যায়ে একের পর এক খেতাব অর্জনের পাশাপাশি তিনি অলিম্পিকের মতো বৈশ্বিক আসরে দেশের হয়ে খেলেছেন। প্রথমে খেলেছেন নিজ জেলা রাজবাড়ীর হয়ে। পরে নাম লেখান বাংলাদেশ আনসারে। সাঁতারের পর এখন প্রতিষ্ঠানটির হয়ে ভলিবলও খেলছেন তিনি। 

সাঁতারের পর এখন ভলিবল। এতটা দীর্ঘ সময় ফিটনেস ধরে রাখা নিয়ে ডলি বলেন, ‘‌স্পোর্টস মানেই ফিটনেস ঠিক রাখতে হয়। আর স্পোর্টসটা তো আমার রক্তের সঙ্গেই মিশে গেছে। আমি নিজেও খেলাটা অনেক ভালোবাসি, ফলে টিকে আছি।’

দেশে যেখানে নারীরা স্পোর্টসে আসতেই অনীহা দেখায়, সেখানে একজনই দুটি খেলায় মুন্সিয়ানা দেখিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ নিয়ে তার অনুভূতি জানতে চাইলে ডলি আক্তার বলেন, ‘‌এসবই তো আপনাদের দোয়া ভাই।’

অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ এবং জাতীয় পর্যায়ে অগণিত অর্জনের জন্য তিনি আনসারকে ধন্যবাদ জানান। ডলি আক্তার বলেন, ‘ক্যারিয়ারের যতটুকু সাফল্য তার জন্য আমার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আনসারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’

আরও