নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রিয়াল মাদ্রিদকে একপ্রকার গুঁড়িয়ে দিয়ে ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে পিএসজি। খেলার মাত্র ত্রিশ মিনিটেই তিন গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই নিয়ে নেয় লুইস এনরিকের দল। তার মধ্যে দুটি গোল করেন ফ্যাবিয়ান রুইজ এবং একটি করেন ওসমান ডেম্বেলে। শেষের দিকে গনসালো রামোস গোল করে ব্যবধান ৪-০ করেন।
এই জয়ের মাধ্যমে যেন কোচ লুইস এনরিকের সেই কথা বাস্তবে রূপ নিল— ‘আমার পথে চললে পিএসজি হবে এক অপ্রতিরোধ্য মেশিন।‘ আর সবচেয়ে করুণভাবে এই বাস্তবতা দেখতে হলো কিলিয়ান এমবাপ্পেকে, যিনি নিজের পুরনো দলের বিপক্ষে হার মানলেন তার নতুন দলের হয়ে।
ম্যাচের শুরুতেই পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় পিএসজি। সেন্টার থেকেই প্রতিপক্ষের অর্ধে বল ঠেলে দেয়া শুরু। আর স্কোরলাইনে তা দৃশ্যমান হতে ৬ মিনিটের বেশি সময় লাগেনি। বলা ভালো, তার আগেই পিএসজি তৈরি করেছিল তিনটি স্পষ্ট গোলের সুযোগ। কাভিশা কাভারাশখেইয়ার শটের পরিণতি ছিল সাইড নেটিং, এরপর পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে দুইবার দলকে বাঁচান থিবো কর্তোয়া।
তবে শেষ রক্ষা হয়নি। রাউল আসেনসিও বলের নিয়ন্ত্রণ হারালে ডেম্বেলে তা কেড়ে নিয়ে গোলের সামনে এগিয়ে যান। কর্তোয়া তাকে ফাউল করলে তা হতে পারত পেনাল্টি ও লাল কার্ড, কিন্তু তখনই রুইজ এসে বল জালে পাঠিয়ে দেন।
মাত্র তিন মিনিট পর, আন্তোনিও রুডিগার বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে আবারো সুযোগ নেন ডেম্বেলে– দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে দেন। ৯ মিনিটে ২-০, ম্যাচ যেন তখনই শেষ!
গোলদাতা ফ্যাবিয়ান রুইজের কাঁধে কাভারাশখেইয়া। ছবি-এপি
কিন্তু ততক্ষণে অ্যাকটিভেটেড হয়ে গেছে পিএসজির ‘মেশিন’ মোড! এনরিকের দলের আক্রমণ ও মিডফিল্ড এককথায় ছিল নিখুঁত। ভিটিনিয়া, রুইজ ও হোয়াও নেভেস প্রতিপক্ষের সব জায়গা বন্ধ করে দেন, আর সামনে কাভারাশখেইয়া, ডেম্বেলে ও দেজাইরে দুয়ে তৈরি করছিলেন একের পর এক সুযোগ। ফুলব্যাক হাকিমি ও নুনো মেন্ডেজ তো যেন ছিলেন উইঙ্গারের ভূমিকায়!
২৯ মিনিটে পিএসজির তৃতীয় গোলটি আসে দুর্দান্ত এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে। হাকিমি নিজের বক্স থেকে দৌড় শুরু করে একাধিক পাসে রুইজকে বল বাড়িয়ে দেন, যিনি ফেদেরিকো ভালভার্দেকে কাটিয়ে গোল করেন। তখন বল দখলে পিএসজি ছিল ৭৮% এবং গোলে শট ১০টি।
অন্যদিকে, মাদ্রিদের অবস্থা একদমই ছন্নছাড়া! জুড বেলিংহ্যাম ও ভিনিসিউস জুনিয়র দলে থাকলেও রিয়ালের খেলা ছিল ছন্দহীন ও হতাশাজনক। কিছু ঝলক দেখা গেলেও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। এমবাপ্পের কাছ থেকে বল কেড়ে ও আরদা গুলারকে নাটমেগ করে ওপরে উঠে গিয়ে দর্শকদের জন্য স্মরণীয় সময় উপহার দেন কাভারাশখেইয়া।
দ্বিতীয়ার্ধে দুই কোচই একাধিক পরিবর্তন করেন। ডেম্বেলে, রুইজ, দুয়ে, এমনকি এমবাপ্পেও মাঠ ছাড়েন। রিয়াল কোচ জাবি আলোনসো তুলে নেন বেলিংহ্যাম-ভিনিসিউসকে। এরপর আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না।
শেষ মুহূর্তে ব্র্যাডলি বারকোলা ও গনসালো রামোস নিজেদের মধ্যে ওয়ান-টু-ওয়ান খেলে অনাবৃত করে ফেলেন রিয়াল ডিফেন্স। ঘুরে দাঁড়িয়ে অনায়াসে বল জালে পাঠান রামোস— ৪-০, যেন শেষ এক চিমটি উপহাস।
রিয়াল মাদ্রিদের জন্য এটি ছিল কঠিন বাস্তবতা, কোচ জাবি আলোনসোর জন্য শেখার দিন। মাদ্রিদের দলে ছিলেন না কিছু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। কিন্তু যারা ছিলেন তাদেরও ছায়ায় পরিণত হওয়া দেখিয়েছে, খুব বেশি পার্থক্য তৈরি করার সুযোগ এ দফায় তাদের হতো না। পিএসজির এই দাপট, খেলার গতি ও প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ এক নতুন যুগের সূচনা ঘোষণা করল— এই সময়টা পিএসজির, এই সময় লুইস এনরিকের ‘মেশিন’এর।
ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ এখন চেলসি। যদি এই ছন্দ বজায় থাকে, তাহলে চ্যাম্পিয়নস লিগের পর ক্লাব ওয়ার্ল্ডকাপও হয়তো কেবল সময়ের অপেক্ষা।