সুপার কাপ

মাদ্রিদের মরু বিভ্রম, জেদ্দার ‘শেখ’ রাফিনিয়া আর চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা

জাভি আলোনসোর রিয়াল মাদ্রিদ শেষ পর্যন্ত লড়াই করলেও, জেদ্দার মরুভূমি তাদের জন্য বরাবরের মতোই অচেনা হয়ে রইল।

ম্যাচের প্রথম আধা ঘণ্টা ছিল অনেকটাই শান্ত, দুই দলই যেন একে অপরকে মেপে নিচ্ছিল। কিন্তু ম্যাচের ৩২ থেকে ৪৭ মিনিট—এই ১৫ মিনিট ছিল নিখাদ ‘মরুঝড়’! এই অল্প সময়েই দেখা গেল ৪টি গোল!

ফুটবল মাঝেমধ্যে এতটাই পাগলাটে হয়ে ওঠে যে, তাকে সাধারণ কোনো ছকে বাঁধা যায় না। জেদ্দার কিং আবদুল্লাহ স্পোর্টস সিটি স্টেডিয়ামে রোববারের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। যে রাতের শেষ দৃশ্যে দেখা গেল, নির্ধারিত সময়ের পর যোগ করা ছয় মিনিটও পার হয়ে গেছে, বার্সেলোনার পেনাল্টি বক্সের ভেতর ভিড় জমিয়েছেন দুই দলের ২২ খেলোয়াড়, আর ঠিক ছয় গজ দূর থেকে উড়ে আসা বলটিতে মাথা ছোঁয়ালেন রিয়াল মাদ্রিদ ডিফেন্ডার রাউল আসেনসিও। গ্যালারিতে তখন পিনপতন নীরবতা, সবাই নিশ্চিত এই বুঝি সমতায় ফিরল মাদ্রিদ। কিন্তু ৯৬ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডে যখন গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়া সেই হেডটি শক্ত হাতে তালুবন্দি করলেন, তখনই নিশ্চিত হয়ে গেল, মরুভূমির মুকুটটি এবারও যাচ্ছে কাতালুনিয়ায়।

সৌদি আরবের মাটিতে রিয়াল মাদ্রিদ মানেই যেন রাফিনিয়ার শিকারক্ষেত্র। সুপার কাপের গত বছরের ফাইনালে রিয়ালকে একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে যখন ফারমিন লোপেজের নিখুঁত পাস খুঁজে নিল রাফিনিয়াকে, অরেলিয়াঁ শুয়ামেনিকে এক ঝটকায় ছিটকে দিয়ে তিনি যখন বলটি জালের কোণায় পাঠালেন, মনে হচ্ছিল জেদ্দার পুরো গ্যালারি লোহিত সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। রাফিনিয়ার জোড়া গোল আর রবার্ট লেভানডভস্কির দুর্দান্ত এক ফিনিশিংয়ে রিয়াল মাদ্রিদকে ৩-২ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো স্প্যানিশ সুপার কাপের মুকুট পরলো বার্সেলোনা।

এল ক্লাসিকোয় রাফিনিয়ার আরেকটি উড়ন্ত পারফরমেন্স। ছবি- এক্স

ম্যাচের প্রথম আধা ঘণ্টা ছিল অনেকটাই শান্ত, দুই দলই যেন একে অপরকে মেপে নিচ্ছিল। কিন্তু ম্যাচের ৩২ থেকে ৪৭ মিনিট—এই ১৫ মিনিট ছিল নিখাদ ‘মরুঝড়’! এই অল্প সময়েই দেখা গেল ৪টি গোল! প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে ভিনিসিয়াস জুনিয়র যখন মাঝমাঠ থেকে এক অবিশ্বাস্য দৌড়ে বার্সার রক্ষণ তছনছ করে সমতা ফেরালেন, তখন গ্যালারিতে লস ব্লাঙ্কোসদের জয়গান। কিন্তু মাদ্রিদের সেই উল্লাস স্থায়ী হলো না এক মিনিটও। ঠিক পরের আক্রমণেই পেদ্রির পাস থেকে লেভানডভস্কি থিবো কোর্তোয়াকে চিপ করে পরাস্ত করলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বার্সা। দুই মিনিট পেরোতেই ফের নাটক। ডিন হুইজেনের হেড আর গঞ্জালো গার্সিয়ার ছোঁয়ায় আবারও ২-২ সমতায় ফেরে জাভি আলোনসোর মাদ্রিদ। মাঠের পরিস্থিতি তখন এতটাই উত্তপ্ত যে কে জিতবে তা বলা ছিল অসম্ভব। ভিনিসিয়াস একের পর এক আক্রমণ করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হোয়ান গার্সিয়া যেন করেছিলেন অজেয় হওয়ার পণ। এভাবেই এল বিরতি, যেন থ্রিলার মুভির মাঝে দর্শকদের স্নায়ুকে শান্ত করতে রেফারি বাজিয়েছিলেন হুইসেল।

ম্যাচের পাগলাটে মুহূর্তে দ্বিতীয়বার সমতা আনে রিয়াল। ছবি- এপি

দ্বিতীয়ার্ধে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে সাইডলাইনে ওয়ার্মআপ করতে দেখে গর্জে ওঠল গ্যালারি। ঠিক তখনই এলো সেই মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। রাফিনিয়ার একটি শট রাউল আসেনসিওর গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে কোর্তোয়াকে ধোঁকা দিয়ে জালে জড়িয়ে গেল। ৩-২! রাফিনিয়ার ভাগ্যের ছোঁয়ায় বার্সা ম্যাচে তৃতীয়বারের মতো ফিরে পায় লিড।

এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ের শেষ মুহূর্তগুলো ছিল নিখাদ স্নায়ুযুদ্ধের পরীক্ষা। বার্সেলোনা এবার আর লিড হাতছাড়া করতে রাজি ছিল না। কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন মাঠে নামলেন, তার চোখেমুখে ছিল ম্যাচ বাঁচানোর তীব্র নেশা, কিন্তু নিয়তি কাতালানদের পক্ষেই ছিল। বার্সেলোনা খেলার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নেয়; গ্যালারি থেকে ভেসে আসতে থাকে সেই চিরচেনা ‘ওলে’ ধ্বনি, আর রিয়াল মাদ্রিদ তখন ক্লান্তি আর হতাশা নিয়ে কেবল প্রতিপক্ষের ছায়া তাড়া করে ফিরছিল।

দুই 'নাম্বার টেন' এর লড়াই। ছবি- এপি

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগে মার্কাস র‍্যাশফোর্ড সলো রান নিয়ে ব্যবধান বাড়িয়ে ম্যাচ শেষ করে দেয়ার সুযোগ পেলেও ব্যর্থ হন। ওদিকে অতিরিক্ত সময়ে ফ্র্যাঙ্কি ডি ইয়ং লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে নাটকীয়তা চরমে পৌঁছায়। ১০ জনের বার্সার ওপর তখন রিয়াল মাদ্রিদের শেষ কামড়। ঠিক ৯৫ আর ৯৬ মিনিটে মাদ্রিদের সেই শেষ সুযোগগুলো আছড়ে পড়ল আলভারো কারেরাস আর আসেনসিওর পা থেকে। কিন্তু নিজের প্রথম এল ক্লাসিকো খেলতে নামা হোয়ান গার্সিয়া অসামান্য দক্ষতায় দুটি আক্রমণই রুখে দেন। ম্যাচের শেষে তার সেই বিশ্বস্ত গ্লাভসে কেবল ফুটবলই জমা পড়েনি, জমা পড়েছিল ২০২৬ সালের স্প্যানিশ সুপার কাপের শিরোপাও।

আবারো রাফিনিয়া-ইয়ামাল জুটিতে পরাজিত পক্ষ রিয়াল। ছবি- এপি

রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর যখন বার্সা খেলোয়াড়রা উল্লাসে মাতোয়ারা, তখন মাঝমাঠের জাদুকর পেদ্রিকে দেখা গেল মাটিতে লুটিয়ে পড়তে। সারা মাঠ দৌড়ে ক্লান্তিতে তার পায়ে তখন ক্র্যাম্প। ম্যাচের অতিমানবীয় তীব্রতা এই একটি দৃশ্যেই স্পষ্ট। জাভি আলোনসোর রিয়াল মাদ্রিদ শেষ পর্যন্ত লড়াই করলেও, জেদ্দার মরুভূমি তাদের জন্য বরাবরের মতোই অচেনা হয়ে রইল।

বার্সেলোনা কেবল একটি ট্রফি জিতল না, তারা আবারও প্রমাণ করল—মরুভূমির এই রণক্ষেত্রে এখনো তারাই শেষ কথা। রাফিনিয়া আবারও জেদ্দার ‘শেখ’ হয়ে থাকলেন, আর বার্সেলোনা ফিরল টানা দ্বিতীয় সুপার কাপ শিরোপা নিয়ে।

আরও