জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও সার্জিও বুসকেতসদের প্রজন্ম এ দর্শন দিয়েই স্পেনকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ফুটবলই হয়ে উঠেছিল অনুমানযোগ্য। বল থাকত স্পেনের পায়ে, অথচ আক্রমণ খুব বেশি এগোত না। লুইস দে লা ফুয়েন্তে সেই পুরনো দর্শন ত্যাগ করেননি; বরং তাতে গতি, আগ্রাসন ও বল হারানোর পর তাৎক্ষণিকভাবে দখল ফিরে পাওয়ার তীব্রতা যোগ করেছেন।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে বলের দখলের ব্যবহারে। নিজেদের অর্ধে দীর্ঘ সময় পাস চালিয়ে যাওয়ার একঘেয়েমি ভেঙে স্পেন এখন প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার দিকে অনেক বেশি সরাসরি ও আক্রমণাত্মক। তাদের পাস আর শুধু বল নিজেদের কাছে রাখার জন্য নয়, প্রতিপক্ষকে পেছনে ঠেলে সুযোগ তৈরি করার অস্ত্র। তিকিতাকার এ বিবর্তনে স্প্যানিশ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিপক্ষকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলার নির্মমতা, যা মুগ্ধ করেছে গোটা ফুটবল বিশ্বকে। আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে সেই কৌশলগত বিবর্তনেরই যেন পূর্ণতা দিয়েছে লা রোজারা।
ফাইনালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্পেনের খেলায় ছিল নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু সেটি নিষ্প্রাণ দখল নয়। তারা মাঠের প্রস্থ ব্যবহার করেছে, এক পাশ থেকে অন্য পাশে বল সরিয়েছে, আর্জেন্টিনার রক্ষণকে টেনে বের করেছে এবং ফুলব্যাক ও সেন্টারব্যাকের মধ্যবর্তী জায়গায় ঢোকার চেষ্টা করেছে। ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে স্পেনের সামনে এগোনোর পাসের হার ছিল টুর্নামেন্ট গড়ের শূন্য দশমিক ৮২ গুণ। ২০২২ সালে সেটি নেমেছিল শূন্য দশমিক ৭৬-এ। দুই আসরেই শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেয় তারা। ইউরো ২০২৪-এ সংখ্যাটি বেড়ে হয় ১ দশমিক শূন্য ৮, এবারের বিশ্বকাপে ১ দশমিক শূন্য ৯। বলের দখল থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এ পরিবর্তনই পুরনো স্পেনকে নতুন শক্তিতে রূপ দিয়েছে।
আর্জেন্টিনার কৌশলের কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি। টুর্নামেন্টে দলের ১৮ গোলের আটটি করেছিলেন তিনি, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন ১৫টিতে। আর্জেন্টিনার তৈরি করা ১১৩টি গোলের সুযোগের ৯৯টিতেই ছিল তার ভূমিকা। সতীর্থরা রক্ষণে পরিশ্রম করে তাকে সামনে রাখতেন, যেন বল কেড়ে নিলেই দ্রুত তার কাছে পৌঁছে দেয়া যায়। স্পেন ঠিক সেই পথটিই বন্ধ করে দেয়।
রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার ছোট পাসের সংযোগ ছিন্ন করেছেন। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই তিন-চারজন মিলে চাপ সৃষ্টি করায় মেসির কাছে পরিষ্কারভাবে বল পৌঁছার সুযোগ কমে যায়। তিনি বল পেলেও স্পেন তাকে এমন অঞ্চলে ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে আক্রমণে ক্ষতি করা কঠিন।
স্পেনের রক্ষণ শুধু নিচে নেমে জায়গা বন্ধ করেনি। পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, আয়মেরিক লাপোর্ত ও মার্ক কুকুরেয়া আক্রমণে উঠে দলকে প্রস্থ দিয়েছেন, আবার বল হারালে দ্রুত নিজেদের অবস্থানে ফিরেছেন। প্রতিপক্ষ কাউন্টার আক্রমণে বের হওয়ার আগেই কাছের খেলোয়াড়রা বলের ওপর চাপ দিয়েছেন।
এ ব্যবস্থার প্রাণ ছিলেন রদ্রি। গুরুতর হাঁটুর চোট পেরিয়ে ফেরা এ মিডফিল্ডার বিশ্বকাপে ৬৫৫টি পাস সম্পন্ন করেছেন, ১৯৬৬ সালের পর এক আসরে যা সর্বোচ্চ। কখন ম্যাচের গতি কমাতে হবে, কখন সরাসরি সামনে খেলতে হবে, কোথায় প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামাতে হবে—সবকিছুর নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জয় তাই তার প্রভাবেরই স্বীকৃতি।
লামিনে ইয়ামালের টুর্নামেন্টও কেবল গোল সহায়তার সংখ্যায় মাপার নয়। প্রান্তে তার অবস্থান আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চওড়া হতে বাধ্য করেছে, ভেতরের চ্যানেলে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি করেছে। বার্সেলোনার মতো সীমাহীন স্বাধীনতা না পেলেও তিনি দলীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রতিপক্ষকে পেছনে ঠেলে রেখেছেন।
এ বিশ্বকাপ তাই শুধু স্পেনের দ্বিতীয় তারকা জয়ের গল্প নয়। এটি তিকিতাকার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার গল্পও। যেখানে সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গতি, নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি আক্রমণ এবং বলের দখলের সঙ্গে নির্মম কার্যকারিতা। স্পেন অতীতকে অস্বীকার করেনি, বিবর্তিত করেই আবার বিশ্বজয় করেছে।