আর রিল্যাক্স সেশনে লিওনেল মেসি খালি পায়ে হাঁটছিলেন সদ্য জল দেয়া ঘাসের ওপর দিয়ে। এ দৃশ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীকালের ফাইনালের আসল রহস্য। মেসিরা নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপের ফাইনালে যে প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে চলেছে, তারা আসলে অচেনা কেউ নয়। বলা যায়, আর্জেন্টিনারই ছড়িয়ে দেয়া বীজ থেকে গজানো মহীরুহ। এক শতাব্দী ধরে আর্জেন্টিনা স্পেনের ফুটবলে যা কিছু ঢেলে দিয়েছে, রোববার সেই ঋণই যেন সুদে-আসলে ফেরত চাইতে আসছে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
গল্পের শুরুটা ফুটবল মাঠে নয়, বরং গৃহযুদ্ধের ছায়ায়। যখন স্পেন গৃহযুদ্ধে জ্বলছিল, বাস্ক অঞ্চলের ফুটবলাররা নির্বাসনে খেলে বেড়াতেন প্রজাতন্ত্রের জন্য তহবিল জোগাড় করতে। তাদেরই একজন ইসিদ্রো লাঙ্গারা, যিনি আর ফিরে যাননি রক্তাক্ত মাতৃভূমিতে। বুয়েন্স আয়ার্সের সান লরেঞ্জোতে যোগ দিয়ে চার মৌসুমে ১১০ গোল করে আজও ক্লাবটির ইতিহাসের সপ্তম সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। এই একটি মানুষের পথ ধরেই যেন আর্জেন্টিনীয় ফুটবলের প্রথম স্রোত ঢুকে পড়ে স্পেনের রক্তে। এরপর ১৯৪৬ সালে, ফ্রাঙ্কোর শাসনে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন স্পেনের পাশে দাঁড়ান প্রেসিডেন্ট হুয়ান দোমিঙ্গো পেরন। শস্যবোঝাই জাহাজের পাশাপাশি তিনি পাঠান সান লরেঞ্জো দলকেই। মাদ্রিদ-বিলবাও-বার্সেলোনায় প্রীতি ম্যাচ খেলতে। স্পেনের মাঠগুলোতে আর্জেন্টিনার সেই নিখুঁত পাসিং ফুটবল এবং চমৎকার ড্রিবলিং শৈলী স্প্যানিশদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। স্প্যানিশ ফুটবলে বল পায়ে যে শৈল্পিকতা এবং নিখুঁত টাচ, তার বীজ মূলত তখনই রোপিত হয়েছিল আর্জেন্টাইনদের মাধ্যমে। স্পেনের ফুটবল আজ যে ভাষায় কথা বলে, তার একটা বড় অংশই আর্জেন্টিনার অভিধান থেকে। গ্যাম্বেতেয়ার, আচিক, কানিও, কুয়াত্রো বা পাস আল রেডের মতো শব্দগুলো স্প্যানিশ ফুটবলের নিজস্ব সংস্কৃতি হয়ে গেছে। ভাষা বদলে যাওয়া মানে সংস্কৃতি বদলে যাওয়া, আর স্পেনের ফুটবল সংস্কৃতি বদলে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার হাতেই।
তারপর একে একে এসেছেন যারা, তাদের প্রত্যেকেই স্পেনীয় ফুটবল পাল্টে দিয়েছেন। আলফ্রেদো ডি স্টেফানো ১৯৫৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনার লড়াইকে আরো তীব্র করে তোলেন নিজের সই দিয়ে, আর মাঠে নামলে বদলে দেন পুরো খেলার সংজ্ঞা। মারিও কেম্পেস ১৯৭৭ সালে ভ্যালেন্সিয়ায় গিয়ে হয়ে ওঠেন ৭৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের একমাত্র বিদেশে খেলা তারকা। আর ডিয়েগো ম্যারাডোনা ১৯৮২ সালে বার্সেলোনায় ভাঙেন বিশ্বরেকর্ড দলবদলের অংকে, যদিও চোট আর রাতজাগা জীবনযাপনে সেই বিপ্লব থেকে যায় অসমাপ্ত এক আখ্যান হয়ে। প্রতিটি নাম, প্রতিটি গল্প আসলে একই সত্যের পুনরাবৃত্তি—স্পেনের ফুটবল বেড়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার রেখে যাওয়া দর্শনে।
আর তারপর এসেছেন তিনি যেন ঋণের অংকটাকে অসীমে নিয়ে গেছেন। রোজারিও থেকে চৌদ্দ বছর বয়সে বার্সেলোনায় পা রাখেন, কাতালোনিয়া প্লাজা হোটেলের ৫৪৬ নম্বর ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনার জন্য মন কেমন করা এক কিশোর লিওনেল মেসি। লা মাসিয়া তাকে গড়ে তোলে, বার্সেলোনা তাকে বিশ্বসেরা বানায়। চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, দশটি লা লিগা, সাতশর কাছাকাছি গোল, আটটি ব্যালন ডি’অর। স্পেনের জাতীয় দলের ছাব্বিশ জনের মধ্যে তেরো জনকে তিনি চেনেন মাঠের ভেতর থেকেই, তাদের বিপক্ষে খেলেছেন ৮১টি ম্যাচ, গোল করেছেন ৬২ বার। লাপোর্তে তার সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। মেসির সঙ্গে পনেরো সাক্ষাতে এগারো গোল হজম করেছেন তিনি একাই। ওয়ারজাবাল, রদ্রি, কুকুরেয়া প্রত্যেকের স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে মেসির নাম। এমনকি চৌদ্দ বছর বয়সী মেসিকে স্পেনের জার্সি পরানোর চেষ্টা হয়েছিল, পিকে আর ফ্যাব্রেগাসের মতো সতীর্থরা পর্যন্ত তাকে মানানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মেসি জড়িয়ে নেন আলবিসেলেস্তের জার্সি। ইতিহাস একটুখানি অন্যভাবে বাঁকলে, রোববারের এ ফাইনাল হয়তো ঘটতই না—অথবা ঘটত সম্পূর্ণ উল্টো ছবিতে।
কিন্তু ইতিহাস সোজা পথেই হেঁটেছে, আর সেই পথের শেষ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে এক নতুন মুখ। লামিনে ইয়ামাল, মাতারোর রোকাফোন্দার রুক্ষ পার্কে বেড়ে ওঠা উনিশ বছরের তরুণ। একই লা মাসিয়ার সন্তান, একই বার্সেলোনার উত্তরাধিকারী। মেসি যে সংখ্যাটা বহন করেছিলেন বছরের পর বছর, সেই দশ নম্বর জার্সি এখন লামিনের কাঁধে। বিশ্বকাপে তিনি সেই নম্বর চেয়েছিলেন, ওলমোর অভিজ্ঞতার কাছে হার মেনে থেমে যেতে হয়েছে উনিশে। যে সংখ্যা একদা মেসিও পরেছিলেন বার্সেলোনা আর আর্জেন্টিনা দুই জার্সিতেই।
নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে যখন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ফাইনালে আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের খেলোয়াড়রা একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়াবেন এটি হবে শতবর্ষ ধরে একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাওয়া দুই ফুটবল সংস্কৃতির পুনর্মিলন। এমন এক ফাইনাল, যেখানে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের জার্সির ভেতর দেখতে পাবে নিজেরই ছায়া, নিজের দর্শন, এমনকি নিজের গড়ে তোলা উত্তরাধিকারও। আর সেই উত্তরাধিকারের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ লিওনেল মেসি দাঁড়াবেন লামিনে ইয়ামালের সামনে, যার ফুটবলীয় জন্মকথার প্রতিটি বাঁকে মেসিরই পদচিহ্ন। যেন রাজা মুখোমুখি হচ্ছেন তার ফুটবলীয় সাম্রাজ্যের যোগ্য উত্তরসূরির। মাঝখানে লা মাসিয়া, বার্সেলোনা এবং এক শতাব্দী ধরে আটলান্টিকের দুই তীরে চলা ফুটবলীয় আদান-প্রদানের দীর্ঘ ইতিহাস।