মেসির ‘শেষ নাচে’ কী কৌশল স্কালোনির

সাড়ে তিন বছর আগে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই রাতটা ছিল লিওনেল মেসির অসমাপ্ত মহাকাব্যের পূর্ণতা পাওয়ার মুহূর্ত।

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে আর্জেন্টিনার গল্প আর কেবল মেসিকে ঘিরে নয়। এখন আর্জেন্টিনা নিজেদের কৌশল, মানসিক দৃঢ়তা ও ট্যাকটিক্যাল অভিযোজনের মাধ্যমে আধুনিক ফুটবলের পরিণত দলগুলোর একটি। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি জানেন কখন ধীর হতে হয়, কখন আক্রমণ বাড়াতে হয় আর কখন ম্যাচকে আবেগহীনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।

স্কালোনির আর্জেন্টিনা কখনই পুরোপুরি ইউরোপিয়ান প্রেসিং মেশিন ছিল না। আবার তারা ঠিক পুরনো লাতিন আমেরিকান রোমান্টিক ফুটবলেও আটকে নেই। বরং দুই ধারার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে তৈরি করেছে ‘কন্ট্রোলড ইন্টেনসিটি’। অর্থাৎ পুরো ম্যাচজুড়ে সমান গতি নয়। কখনো গতি বাড়ায়, কখনো ম্যাচকে নিস্তেজ করে দেয়, আবার কখনো হঠাৎ ছোট পাসে তীব্র আঘাত।

কাগজে-কলমে দলটি কখনো ৪-৩-৩, কখনো ৪-২-৩-১, কখনো ৩-৫-২ ফরমেশনে চলে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তাদের পুরো সিস্টেমের কেন্দ্র থাকবে একটি ‘ফ্রি রোল’। সে ভূমিকায় থাকবেন মেসি। স্কালোনির পুরো পরিকল্পনাই তৈরি হয়েছে এমনভাবে, যাতে মেসিকে কম দৌড়াতে হয় কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় তিনি সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলতে পারেন। বিশ্বকাপের দীর্ঘ টুর্নামেন্টে এ কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ম্যাচ সংখ্যা বাড়বে, ভ্রমণ বাড়বে ও শারীরিক চাপ বাড়বে। ফলে স্কালোনি জানেন, প্রতিটি ম্যাচে ৯০ মিনিট ধরে উচ্চ গতির প্রেসিং চালানো বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে যখন দলের কেন্দ্রীয় চরিত্র মেসি।

চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বোঝার জন্য চোখ রাখতে হবে স্কালোনির ‘মেসি প্রটেকশন সিস্টেম’-এ। যার মূল কাজ মেসির চারপাশে এমন আবহ তৈরি করা, যাতে তিনি নিজের শক্তি শুধু আক্রমণাত্মক মুহূর্তগুলোর জন্য সংরক্ষণ করতে পারেন। এ কারণেই আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড এত গুরুত্বপূর্ণ। রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারদের কাজ কেবল বল বিতরণ নয়, তাদের কাজ মেসির জন্য জায়গা তৈরি করা, ডিফেন্সিভ কাভার দেয়া, বল জেতা এবং পুরো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা।

ডি পল হলেন দলের ফুসফুস, তিনি বিস্তৃত এলাকা দখলে রাখবেন, ফুলব্যাকদের সাপোর্ট দেবেন, প্রেসিংয়ে নেতৃত্ব দেবেন। এনজো ফার্নান্দেজ গভীরে থেকে খেলা তৈরি করবেন, বল পায়ে রেখে দলকে সংগঠিত রাখবেন এবং চাপের মুহূর্তে শান্ত মাথায় সিদ্ধান্ত নেন। আর ম্যাক অ্যালিস্টার আক্রমণ ও রক্ষণের মাঝে সেতু তৈরি করবেন এবং সুযোগ পেলে বক্সে লেট রানে পৌঁছে গোলের সামনে উপস্থিত হবেন। এ তিনজনের সমন্বয় ঠিকঠাক কাজ করলে মেসির পেছনে যে কাঠামো দরকার সেটা প্রায় নিখুঁত হয়ে যায়।

বিশ্ব ফুটবলে অনেক দল ‘স্ট্রাকচারাল প্রেসিং’-এর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু স্কালোনি পুরোপুরি সে পথে হাঁটছেন না। বরং বেছে নিয়েছেন ‘সিচুয়েশনাল প্রেসিং’। অর্থাৎ পুরো সময় নয়, নির্দিষ্ট মুহূর্তে হঠাৎ সম্মিলিতভাবে চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ যখন ফুলব্যাক বা মাঝমাঠে ভুল পাস দেবে, তখন পল বা আলভারেজের মতো খেলোয়াড় সামনে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। এতে পুরো ম্যাচে শক্তি খরচ কম হয়। প্রতিপক্ষও বুঝতে পারে না ঠিক কখন চাপ আসবে। অর্থাৎ অনেক দল যেখানে পুরো ম্যাচে একই গতিতে প্রেসিং ফুটবল খেলে, সেখানে আর্জেন্টিনা খেলবে ঢেউয়ের মতো। তারা দীর্ঘ সময় ধীরগতিতে ম্যাচ চালাবে, মাঝমাঠে জায়গা সংকুচিত করবে, প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করবে, তারপর হঠাৎ করে মেসির একটি পাস কিংবা হুলিয়ান আলভারেজের চ্যানেল রান ম্যাচের গতি পাল্টে দেবে।

আলভারেজের মূল কাজ গোল করা নয়, বরং প্রেসিং, চ্যানেল রান ও প্রতিপক্ষের সেন্টারব্যাকদের ব্যস্ত রাখা। অন্যদিকে লাউতারো মার্টিনেজ থাকলে আর্জেন্টিনার আক্রমণ আরো বক্সকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে। লাউতারো প্রতিপক্ষের দুই সেন্টারব্যাককে আটকে রাখবেন, ফলে মেসি মাঝের জায়গায় বেশি স্বাধীনতা পাবেন। স্কালোনি সম্ভবত প্রতিপক্ষ অনুযায়ী স্ট্রাইকার নির্বাচন করবেন। দ্রুত ট্রানজিশন-নির্ভর ম্যাচে আলভারেজ, আর নিচু ব্লকে খেলা দলের বিপক্ষে লাউতারোকে দেখা যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হবে ‘চ্যানেল রান’। কারণ মেসির আগের মতো ড্রিবল করে পাঁচজন কাটিয়ে উঠে আসার বয়স নেই। বরং তিনি বল পাবেন দুই লাইনের মাঝখানে, তারপর একটি নিখুঁত পাস দিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে দেবেন। এখানেই হুলিয়ান আলভারেজের গুরুত্ব। আলভারেজ শুধু স্ট্রাইকার নন, তিনি পুরো সিস্টেমের অপরিহার্য চাকা। ডিফেন্ডারদের পেছনে দৌড়াবেন, পাশের চ্যানেলে সরে যাবেন, আবার প্রেসিংয়েও অংশ নেবেন।

আক্রমণে আর্জেন্টিনার প্রশস্ততা তৈরি হয় মূলত ফুলব্যাকদের মাধ্যমে। ট্যালিয়াফিকো বাম দিক থেকে এবং মোলিনা ডান দিক থেকে যে ওভারল্যাপ করেন, সেটা আর্জেন্টিনার আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, যা আলোচনায় আসে না। যখন মেসি-ম্যাক আলিস্টাররা মাঝমাঠ বরাবর প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রাখেন তখন ফুলব্যাকরা দুই প্রান্তে উঠে গিয়ে ক্রস বা কাটব্যাকের বিকল্প তৈরি করেন।

আর্জেন্টিনার ডিফেন্স সাধারণত কমপ্যাক্ট মিড-ব্লকে ডিফেন্ড করে। অর্থাৎ পুরো দল খুব বেশি ওপরে উঠে প্রেস করবে না, আবার পুরোপুরি নিচেও নেমে যাবে না। মিডফিল্ড সংকুচিত থাকবে, ফরোয়ার্ডরা প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল পাসিং লেন বন্ধ করবেন এবং ডিফেন্স লাইন সবসময় ডুয়ালের জন্য প্রস্তুত থাকবে। এ কাঠামো মেসির ওপর চাপ কমায়। কারণ তিনি ডিফেন্সে খুব বেশি নেমে না এলেও দলের ভারসাম্য নষ্ট হয় না। তবে এখানেই তাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে। যদি প্রতিপক্ষ মাঝমাঠের জায়গা বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে আর্জেন্টিনার খেলা ধীর হয়ে পড়ে এবং পুরো ফরোয়ার্ড লাইনকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ডিফেন্স লাইনে স্কালোনির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। আধুনিক ফুটবলে যেসব ডিফেন্ডার সামনে উঠে এসে আগ্রাসীভাবে বল কাড়তে পারেন, রোমেরো তাদের অন্যতম। তার এ ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্ডিং’ আর্জেন্টিনাকে মাঝমাঠে আরো সাহসী হতে সাহায্য করে। কারণ পেছনে একজন আছেন যিনি ফাঁক বুজিয়ে দেবেন। সেই কাজটাই করেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। তিনি পজিশনে থাকেন, শেষ লাইন ধরে রাখেন এবং রোমেরো এগিয়ে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হয় সেটা পূরণ করেন। এ দুজনের মধ্যে বোঝাপড়াটা যতটা মসৃণ থাকবে, আর্জেন্টিনার রক্ষণ ততটাই দুর্ভেদ্য দেখাবে। পেছনে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ থাকায় ডিফেন্স লাইন কিছুটা ওপরে উঠেও খেলতে পারে। সেট পিসের বিষয়টাও এবার আর্জেন্টিনার কৌশলের একটি সচেতন অংশ হয়ে উঠবে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে এমন ম্যাচ আসবে যেখানে উন্মুক্ত খেলায় সুযোগ তৈরি হবে কম। সেই মুহূর্তে একটি কর্নার বা ফ্রিকিক থেকে গোল পুরো ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারে। রোমেরো ও অন্য সেন্টারব্যাকদের উচ্চতা এবং ডুয়ালিং ক্ষমতা এখানে কাজে আসবে।

কিন্তু মিডফিল্ড যদি প্রতিপক্ষের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারে, তাহলে মেসির ফ্রি রোল দুর্বল হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগালের মতো দ্রুত ট্রানজিশন-ভিত্তিক দলের বিপক্ষে এটি বড় ঝুঁকি। স্কালোনির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ম্যাচভেদে পরিকল্পনা বদলানো। শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তিনি আরো রক্ষণাত্মক হতে পারেন, আবার দুর্বল দলের বিপক্ষে বল দখলভিত্তিক ফুটবল খেলতে পারেন। এ বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আধুনিক ফুটবলের কার্যকর কোচদের একজন বানিয়েছে।

এ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আসলে মেসিকে ঘিরে নয়, বরং মেসিকে ছাড়া বাকিদের ধারাবাহিকতা নিয়ে। সম্ভবত গ্রুপ পর্বে তাকে পুরো ৯০ মিনিট খেলানো হবে না। কিন্তু পুরো কাঠামো সচল রাখার কাজ মিডফিল্ড ও ডিফেন্সের। যদি ডে পলদের দৌড় কমে যায়, যদি এনজো চাপের মধ্যে বল হারাতে শুরু করেন, তাহলে পুরো ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। কিন্তু তারা যদি ছন্দে থাকেন, তাহলে আর্জেন্টিনা আবারো বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভয়ংকর দল হয়ে উঠতে পারে।

আরও