এই হাততালি আগামীতে দিতে পারব তো!

প্রথমবারের মতো কোনো বৈশ্বিক আসরে শিরোপার সঙ্গে স্থায়ী হয়ে গেল বাংলাদেশ ক্রিকেট। অপরাজিত থেকেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্ব বিজয়ী। ছোটদের এই বড় অর্জনে মাতোয়ারা পুরো বাংলাদেশ। আট কলাম ব্যানার শিরোনাম করেছে বেশির ভাগ পত্রিকা। জুনিয়র টাইগারদের প্রশংসায় ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এরই মধ্যে এসেছে গণসংবর্ধনার সংবাদ। সবে কৈশোর পেরোনো এ তরুণদের প্লট দেয়ার কথা উঠেছে জাতীয় সংসদে। সর্বত্রই হাততালি আর উচ্ছ্বাস। আগামীতে এই হাততালি আর উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার উপলক্ষ পাব কিনা এ প্রশ্নটাও ভুলে গেছি আমরা।

প্রথমবারের মতো কোনো বৈশ্বিক আসরে শিরোপার সঙ্গে স্থায়ী হয়ে গেল বাংলাদেশ ক্রিকেট। অপরাজিত থেকেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্ব বিজয়ী। ছোটদের এই বড় অর্জনে মাতোয়ারা পুরো বাংলাদেশ। আট কলাম ব্যানার শিরোনাম করেছে বেশির ভাগ পত্রিকা। জুনিয়র টাইগারদের প্রশংসায় ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এরই মধ্যে এসেছে গণসংবর্ধনার সংবাদ। সবে কৈশোর পেরোনো এ তরুণদের প্লট দেয়ার কথা উঠেছে জাতীয় সংসদে। সর্বত্রই হাততালি আর উচ্ছ্বাস। আগামীতে এই হাততালি আর উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার উপলক্ষ পাব কিনা এ প্রশ্নটাও ভুলে গেছি আমরা।
ছোটরা যা করে দেখিয়েছে তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট না, এটা খুবই সত্যি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য সবচেয়ে ভয়ের জায়গা দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। পেস ও বাউন্সি উইকেটে শিক্ষানবিশের মতো অবস্থা হয় আমাদের ক্রিকেটারদের। আর এ বিরুদ্ধ কন্ডিশনেই বিজয় ঝান্ডা উড়িয়েছেন আকবর আলীরা। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো থেকে প্রকৃত পেস বোলার বেরিয়ে আসাটা খুবই কঠিন। তার পরও দক্ষিণ আফ্রিকার পেসবান্ধব উইকেটের চ্যালেঞ্জে ওই কন্ডিশনে অভ্যস্ত দলগুলোকেও নাস্তানাবুদ করেছে আমাদের ছোটরা। বারুদের জবাব দিয়েছে বারুদ দিয়েই। ফাইনালেও ভারতকে পৌনে দুইশর মতো পুঁজিতে বেঁধে রাখার কৃতিত্ব মূলত পেসারদের।
স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা নিউজিল্যান্ডের মতো পেস কন্ডিশনে অভ্যস্ত দলগুলোর বিপক্ষে হেসেখেলেই জিতেছে আকবর আলীর দল। ফাইনালে প্রতিপক্ষ ভারতকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। শিরোপা লড়াইয়ের আগে টানা ১২ ম্যাচে এই ভারতীয় দলটিকে অলআউট করতে পারেনি কেউ। দলটির ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করারই কোনো সুযোগ নেই। ব্যাটিংয়ে এমন দলটিকে শুরু থেকেই চেপে ধরে বাংলাদেশের পেসাররা। তিন পেসারের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে রান তোলা বাদ দিয়ে উইকেট বাঁচিয়ে রাখার কৌশল নেয় তারা। কিন্তু কিছুতেই শেষ রক্ষা করতে পারেনি তারা। ১৬ বল বাকি থাকতে ১৭৭ রানে শেষ হয় ভারতীয় ইনিংস।
ব্যাটিংয়ে ১৭৮ রানের পুঁজি হয়ে ওঠে এভারেস্ট শৃঙ্গসম উচ্চতা। ৬৫ রানে ৪ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। এর সঙ্গে বিনা মেঘে বজ্রপাত! ওপেনার পারভেজ হাসান ইমন ক্র্যাম্প নিয়ে রিটায়ার হার্ট হয়ে ফিরে যান ড্রেসিংরুমে। এত বড় চাপও থামাতে পারেনি জুনিয়র টাইগারদের। দাঁতে দাঁত পিষে মাথায় পাহাড়সম ভার নিয়ে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন আকবর আলী। যে টেম্পারামেন্ট এ টিনএজার দেখিয়েছেন, তা হার মানায় গল্পকেও। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন ইমন। আবার দলের প্রয়োজনে ব্যাট হাতে নেমে লড়াই করেছেন অধিনায়কের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।
সন্দহাতীতভাবেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের এ গল্পগুলো থাকবে সুখস্মৃতি হয়ে। কিন্তু সুখস্মৃতির স্থায়িত্ব কতদিন? অনেক সম্ভাবনার অকালে ঝরে পড়ার ভার আমাদের যেখানে ললাট লিখন, সেখানে আনন্দের জোয়ারে গা ভাসানো আমাদের মানায় কিনা, স্বাভাবিক কারণেই সে প্রশ্নটা এসে যায়। খুব বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মাত্র চার বছর আগের বিশ্ব কাঁপানো মুস্তাফিজুর রহমান এখন জাতীয় দলে অনিয়মিত। ক্যারিয়ারের শুরুতে আগুনের ফুলকি হয়ে এসেছিলেন তাসকিন আহমেদ। এখন নিজেকে হাতড়িয়ে খুঁজছেন। জাতীয় দলে সুযোগ পান কালেভদ্রে। একই টেস্টে সেঞ্চুরির সঙ্গে হ্যাটট্রিকসহ ৫ উইকেট, পুরো ক্রিকেট দুনিয়ায় শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন সোহাগ গাজী। এখন প্রায় বিস্মৃত নাম।
শুরুটা কি ঝলমলেই না ছিল নাসির হোসেনের। ব্যাটে-বলে-ফিল্ডিংয়ে দুর্দান্ত ফিনিশার! তাকে কিংবদন্তির ফিনিশার মাইকেল বেভানের সঙ্গেও তুলনা করছিলেন কেউ কেউ। এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিটনেস টেস্টে উতরাতে হিমশিম খেতে হয় নাসিরকে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মুমিনুল হক মাঠে নামা মানেই ফিফটি না হয় সেঞ্চুরি! ক্রিকেট ইতিহাসের কিংবদন্তিদের কাতারে মুমিনুল নামটা থাকবে, এমন সম্ভাবনার ছবি দেখছিলেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। কিন্তু ব্যাটসম্যান মুমিনুল এখন অতীতের ছায়া বৈ কিছু নয়! পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের টেস্ট দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঠিকই, তবে ব্যাটসম্যান মুমিনুল চলে গেছেন স্বপ্নের সীমানার বাইরে।
১০ নম্বরে নেমে আবুল হাসান রাজা সেঞ্চুরি করে ওলটপালট করে দিয়েছিলেন রেকর্ডবুক। ঘরোয়া ক্রিকেটেও সেই রাজুকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার আগেই হিরোর মর্যাদায় ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এখন দলে জায়গা ধরে রাখার পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।
আমাদের ক্রিকেটারদের সঙ্গে ফিক্সিং-নারী কেলেঙ্কারি-শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নিত্যদিনের ঘটনা। সবচেয়ে কম বয়সী টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান মোহাম্মদ আশরাফুলের পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা থেকেও যথেষ্ট শিক্ষা হয়নি। জুয়াড়িদের দেয়া প্রস্তাব গোপন করে নিষেধাজ্ঞায় আছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ঘরোয়া ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ছড়াছড়ি। এতসব অক্রিকেটীয় অনুষঙ্গ জিইয়ে রেখে আমাদের ক্রিকেট কতদূর যেতে পারবে? হঠাত্ পাওয়া সফল্যে হাততালির উদযাপনকে আমরা কতদূর টেনে নিতে পারব?
যে টেম্পারামেন্ট ও টেকনিক আকবররা দেখিয়েছেন, অভাবনীয় বললেও কম বলা হবে? চারদিকে প্রলোভনের ফাঁদ পাতা। অক্রিকেটীয় অনুষঙ্গ পরতে পরতে। এখান থেকে কাদামাটির আকবর আলীদের সুরক্ষা দেবে কে? আকবর-ইমন-রকিবুলদের কৃতিত্বের ভাগিদারের জন্য বিসিবি, মিডিয়া, করপোরেট, রাষ্ট্র উঠে পড়ে লেগেছে। নিজেদের তৈরি হওয়ার সময়টাতে এত এত ছলচাতুরীর ফাঁদ কেটে ছোটদের বেরোনোর পথ দেখানোর যে কেউ নেই। আর আমরা তো হাততালির শব্দে বিভোর।

আরও