আফকন ফাইনাল

ওয়াক আউট, ১৫ মিনিটের পেনাল্টি ও গুয়ের ‘রকেট’: মরক্কোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল

মরক্কোর ৫০ বছরের অপেক্ষাকে দীর্ঘায়িত করে ২-১ গোলের নাটকীয় জয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকান শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরল সেনেগাল।

সেনেগাল জিতেছে। কিন্তু সেই ফলাফল যেন পুরো ঘটনার ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। মাঠ থেকে খেলোয়াড়দের চলে যাওয়া (ওয়াক আউট), ১৫ মিনিটের পেনাল্টি নাটক, সেই পেনাল্টিতে পানেনকা ‘ট্র্যাজেডি’ আর শেষ মুহূর্তে পাপে গুয়ের চোখ ধাঁধানো গোল—সব মিলিয়ে মরক্কো বনাম সেনেগালের ফাইনালটি রূপ নিয়েছিল চরম উত্তেজনার এক মহাকাব্যে।

আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের এ আসরটি নিয়ে এতদিন একটি কথাই শোনা যাচ্ছিল—এটি স্মরণকালের সবচেয়ে অনুমানযোগ্য, সবচেয়ে কম নাটকীয় টুর্নামেন্ট। কথাটি সত্যি বলেই মনে হচ্ছিল যতক্ষণ না ফাইনালের ইনজুরি টাইম শুরু হয়।

তারপর যা ঘটল, তা হয়তো যেকোনো বড় টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বিশৃঙ্খল, অবিশ্বাস্য ও নাটকীয় সমাপ্তি। সেনেগাল জিতেছে। কিন্তু সেই ফলাফল যেন পুরো ঘটনার ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। মাঠ থেকে খেলোয়াড়দের চলে যাওয়া (ওয়াক আউট), ১৫ মিনিটের পেনাল্টি নাটক, সেই পেনাল্টিতে পানেনকা ‘ট্র্যাজেডি’ আর শেষ মুহূর্তে পাপে গুয়ের চোখ ধাঁধানো গোল—সব মিলিয়ে মরক্কো বনাম সেনেগালের ফাইনালটি রূপ নিয়েছিল চরম উত্তেজনার এক মহাকাব্যে। শেষ পর্যন্ত মরক্কোর ৫০ বছরের অপেক্ষাকে দীর্ঘায়িত করে ২-১ গোলের নাটকীয় জয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকান শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরল সেনেগাল।

সেনেগালের কিংবদন্তি সাদিও মানে। ছবি- রয়টার্স

সবকিছুর সূত্রপাত ম্যাচের ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে। মরক্কোর আশরাফ হাকিমির সঙ্গে হালকা ধাক্কায় আবদুলায়ে সেক ফাউলের শিকার হন বলে রায় দেন রেফারি, যদিও হাকিমির হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ইসমাইলা সার গোল করলেও আগেই বাঁশি বাজানো হয়।

চার মিনিট পর আসে আরো বড় বিস্ফোরণ। কর্নার রক্ষার সময় মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজকে সামান্য টানার দায়ে ভিএআর রিভিউ শেষে এল হাজি মালিক দিউফের বিরুদ্ধে পেনাল্টি দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তেই ফেটে পড়ে সেনেগাল শিবির। আগেই সেনেগালিজরা হয়তো ভাবছিল রেফারিং নিয়ে ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে। এই পেনাল্টির সিদ্ধান্ত সেনেগাল আর মেনে নিতে পারেনি। অধিকাংশ খেলোয়াড় একযোগে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান।

ব্যতিক্রম ছিলেন সাদিও মানে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি মাঠে ছিলেন এবং পরে টানেলের ভেতর ছুটে গিয়ে সতীর্থদের ড্রেসিংরুম থেকে ফিরিয়ে আনেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে টাচলাইনে হাজির হন প্রবীণ কোচ ক্লোদ লে রয় এবং এল হাজি ওসেইনু দিউফ। আর যখন দিউফ ‘শান্তির দূত’ হয়ে যান তখন বোঝাই যায় পরিস্থিতি ছিল কতটা পাগলাটে!

ব্রাহিম দিয়াজের পানেনকা পেনাল্টি। ছবি- রয়টার্স

পেনাল্টি নেয়া হতে হতে কেটে যায় পুরো ১৫ মিনিট। ব্রাহিম দিয়াজ এগিয়ে আসেন—টুর্নামেন্টে তার পাঁচ গোল, ফাইনাল জেতানোর সুবর্ণ সুযোগ। বলে চুমু খেয়ে এগিয়ে গেলেন, নিলেন পানেনকা শট। কিন্তু শটটা যায় সরাসরি এদুয়ার মেন্দির হাতে। ঠান্ডা মাথায় বল ধরে ফেলেন সেনেগাল গোলরক্ষক।

গ্যালারি তখন অশান্ত। সেনেগাল সমর্থকদের সামনে বিজ্ঞাপন বোর্ড ভেঙে পড়ে, পরিস্থিতি সামাল দিতে নামানো হয় অন্তত ১০০ জন দাঙ্গা পুলিশ।

ছবি- রয়টার্স

অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে মাঝমাঠে বল হারান নেইল এল আয়নাউই। দ্রুত আক্রমণে বল পেয়ে যান পাপে গুয়ে। বক্সের কোনা থেকে নেয়া তার বুলেট গতির শটটি যখন টপ কর্নার দিয়ে জালে জড়ালো, তখন সেনেগাল শিবিরে শুরু হয় বাঁধভাঙা জয়োল্লাস। এই গোলটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

অধিনায়ক কালিদু কুলিবালি ও হাবিব দিয়ারাকে ছাড়াই মাঠে নামা সেনেগালের তরুণ রক্ষণভাগ ছিল দুর্ভেদ্য। মাত্র ২১ বছর বয়সী তিন ডিফেন্ডার নিয়ে তারা মরক্কোর একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়েছে।

ফাইনালটি শুরুতে ছিল ধীরগতির। সেনেগাল পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই কম ঝুঁকি নিয়ে খেলেছে—ধৈর্য ধরে অপেক্ষা, এক মুহূর্তের সুযোগে আঘাত। মরক্কোও খুব আলাদা ছিল না, শুধু বলের দখল একটু বেশি। প্রথমার্ধে সেনেগাল সামান্য এগিয়ে ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কো। আয়ুব এল কাবি একটি নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করেন। দিয়াজ একাই নন—এই রাত অনেক মরক্কো খেলোয়াড়কেই তাড়া করবে।

মরক্কোর হতাশার রাত। ছবি- রয়টার্স

অতিরিক্ত সময়ে মরক্কো গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক ক্রস, একের পর এক হেডার—নায়েফ আগুয়ের্দের হেড বারে, ইউসুফ এন-নেসিরির হেড অল্পের জন্য বাইরে। অন্য প্রান্তে শেরিফ এনদিয়ায়ে ছয় গজ থেকে ফাঁকা জালে গোল মিস করেন।

সব মিলিয়ে শেষ ৪৫ মিনিট ছিল উন্মাদনা, বিশৃঙ্খলা আর হাস্যকর নাটকে ভরা—পুরো টুর্নামেন্টের সব উত্তেজনা যেন জমা ছিল এই সময়টুকুর জন্যই!

এই জয়ের ফলে সেনেগাল মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখল, কিন্তু মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো আচরণের জন্য তাদের বড় ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আরও