এবার চূড়ান্ত পর্বের ফাইনালে বালিকা শাখায় ময়মনসিংহের নান্দাইলের আচারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে হারিয়ে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোরগাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বালক শাখায় ময়মনসিংহের দড়িরামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে হারিয়ে বরিশালের বাকেরগঞ্জের দাড়িয়াল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা শেষে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অবশেষে দুই চ্যাম্পিয়ন বিদ্যালয়কে পাওয়া গেল। এর মধ্য দিয়ে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর লাখ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে প্রায় আড়াই মাসের দীর্ঘ টুর্নামেন্টের সফল সমাপ্তি ঘটল।
খুদে শিক্ষার্থীদের এ ফুটবল উৎসবের উদ্দেশ্য, এতে কারা খেলে, কীভাবে খেলে—সেটি জানার আগ্রহ থাকে সবার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের শারীরিক, মানসিক ও নান্দনিক বিকাশ, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহিষ্ণুতা ও মনোবল বাড়ানোসহ প্রতিযোগী মনোভাব গড়ে তোলার উদ্দেশে প্রতি বছর ইউনিয়ন ও পৌরসভা, উপজেলা বা সিটি করপোরেশন এলাকার থানা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট (বালক ও বালিকা) আয়োজন করা হয়ে আসছে।
স্কুল ফুটবল আয়োজন করা হচ্ছে ২০১০ সাল থেকে। প্রথম বছর শুধু ছেলেদের খেলা আয়োজিত হলেও ২০১১ সাল থেকে ছেলে ও মেয়েদের টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়ে আসছে। কভিড-১৯ মহামারীতে ২০২০ ও ২০২১ সালে এ টুর্নামেন্ট আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে প্রতি বছরই হয়ে আসছে শিশুদের এ ফুটবল উৎসব।
স্কুল ফুটবল খেলেই উঠে এসেছেন বাংলাদেশ নারী দলের নন্দিত তারকা ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, শিউলি আজিম, তহুরা খাতুন, শামসুন্নাহার সিনিয়র ও জুনিয়র, সানজিদা আক্তার, নিলুফা আক্তার নিলাসহ একঝাঁক খেলোয়াড়। তারা এখন দেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল এ বছর প্রথমবারের মতো খেলেছে এএফসি এশিয়ান কাপেও। এরাই ২০২২ ও ২০২৪ সালে দুবার জিতেছেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা।
শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও নান্দনিক বিকাশের লক্ষ্য হলেও এ প্রতিযোগিতা এখন হয়ে উঠেছে জাতীয় দলের ফুটবলার তৈরির অন্যতম বড় এক প্লাটফর্ম। গতকালের ফাইনালে বিজয়ী ও রানার্সআপ চারটি দলের অনেককেই হয়তো ভবিষ্যতে দেখা যাবে জাতীয় দলের জার্সিতে।
প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের নিয়মকানুন
প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলার মাঠের আকার কেমন, সেটি জেনে নেয়া যাক। শিশুদের খেলা বলেই এ প্রতিযোগিতায় মাঠের দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার ও প্রস্থ ৪৫ মিটার; সিনিয়র পর্যায়ে যা ১০৫ বাই ৬৮ মিটার। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ঠিক রেখে টুর্নামেন্ট কমিটি কর্তৃক সংশ্লিষ্ট এলাকার খেলার মাঠ নির্ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। মাঠের আয়তন অনুযায়ী গোলবার, গোল পোস্ট ও পেনাল্টি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রতিটি দল গঠিত হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরীক্ষণ বিদ্যালয়, শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র ও ছাত্রীদের দ্বারা গঠিত দল এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। শিশুদের বলেই এ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য কোনো এন্ট্রি বা রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয় না।
প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের (বালক ও বালিকা) খেলা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন ও পরিচালনার জন্য ইউনিয়ন ও পৌরসভা, উপজেলা/থানা (সিটি করপোরেশন এলাকাধীন), জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে কমিটি গঠিত হয়। জাতীয় পর্যায়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীকে সভাপতি করে ৩৩ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়।
এ প্রতিযোগিতার সব খেলা প্রণীত নীতিমালা ও টুর্নামেন্ট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নকআউট পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। ছোটদের খেলা হলেও এখানে আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করা হয়। খেলা পরিচালনায় এ নীতিমালার আওতায় সমাধানযোগ্য নয় এমন কোনো সমস্যা বা জটিলতা দেখা দিলে তা ফিফা ও বাফুফের বিধি ও উপবিধি অনুসারে নিষ্পত্তি করতে হবে।
প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকে ১৭ জন খেলোয়াড় ও দুজন কর্মকর্তা (ম্যানেজার ও প্রশিক্ষক) নিয়ে দল গঠিত হয়। দলের ম্যানেজার ও প্রশিক্ষক কে হবেন তা মনোনীত করবে সংশ্লিষ্ট কমিটি। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে বলে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
যে শিক্ষাবর্ষে খেলা শুরু হবে সেই শিক্ষাবর্ষে অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর খেলোয়াড়দের বয়স হবে সর্বোচ্চ ১১ বছর। খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো রকম অনিয়ম প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের উপজেলা/থানা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে নীতিমালায় বলা আছে। সিনিয়র ফুটবলের মতো এখানেও গোলরক্ষকসহ মোট ১১ জন খেলে।
কোমলমতি শিশুদের গতকাল দেখা যায় খালি পায়ে ফাইনাল খেলতে। এটা দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, তাদের কি বুট কিনে দেয়া হয়নি কিংবা সরবরাহ করেনি আয়োজক কিংবা সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষ? বিষয়টির উত্তর জানা গেল টুর্নামেন্টের নীতিমালায়। সেখানে ‘১০.৩’ নম্বর বাইলজে বলা আছে, অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়রা বুট ব্যবহার করতে পারবে না।
প্রাথমিকের খেলা মোট ৫০ মিনিটের হয়। প্রথমার্ধের ২৫ মিনিট পর ১০ মিনিট বিরতি থাকে। নির্ধারিত সময়ে যদি খেলা অমীমাংসিত থাকে তাহলে নির্ধারিত সময়ের পর ৫+৫= ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময় খেলতে হয়। অতিরিক্ত সময়ে ফলাফল নির্ধারিত না হলে পেনাল্টি কিকের (টাইব্রেকার) মাধ্যমে খেলার ফলাফল নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। তবে গতকাল ফাইনালে কোনো টাইব্রেকারের প্রয়োজন হয়নি।
জাতীয় পর্যায়ে ফাইনালের বিজয়ী (চ্যাম্পিয়ন), বিজিত (রানার্সআপ) ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে যথাক্রমে গোল্ডকাপ, সিলভার কাপ ও ব্রোঞ্জ কাপ দেয়া হয়। টুর্নামেন্ট কমিটি প্রতিটি পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলকে স্থানীয়ভাবে ক্রেস্ট, মেডেল দিতে পারবে।