‘মাল্টি-ক্লাব ওনারশিপ’ নিয়ে চিন্তিত উয়েফা

২০২৩ সালে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের বাজার ছিল অন্তত ২৮ বিলিয়ন ডলারের। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের রমরমা এ চেহারার নেপথ্যে রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগ।

২০২৩ সালে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের বাজার ছিল অন্তত ২৮ বিলিয়ন ডলারের। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের রমরমা এ চেহারার নেপথ্যে রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগ। যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবেররা যেমন বিনিয়োগ করছেন, তেমনি মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ধনী ব্যক্তিরাও ইউরোপে বিনিয়োগ করছেন। এ ভালোর মধ্যে একটা খারাপ দিকও আছে, তা হলো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানির একাধিক ক্লাবের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত থাকা। বিষয়টি নিয়ে ইউরোপের ফুটবল গভর্নিং বডি উয়েফা এখন রীতিমতো উদ্বিগ্ন। কারণ এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবের মালিকানাধীন গ্রুপটির বিশ্বব্যাপী ১৩টি ক্লাব রয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় রেড বুল কোম্পানির মালিকানায় আছে পাঁচটি ক্লাব। গত বছর ফরাসি ক্লাব স্ট্রসবুর্গের মালিকানায় যুক্ত হয়েছে ইংলিশ ক্লাব চেলসি। এর মধ্য দিয়ে চেলসির মালিকও মাল্টি-ক্লাব ওনারশিপে নাম লিখিয়েছেন। 

তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্লাব আছে প্যাসিফিক মিডিয়া গ্রুপ, কিং পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল, ইনিওস কিংবা ঈগল ফুটবল হোল্ডিংয়ের। 

গত বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে উয়েফা জানায়, ইউরোপের অন্তত ৩০০ ক্লাব এখন ‘বহু-ক্লাব মালিকানা’র অংশ হয়ে পড়েছে এবং ক্রমেই এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এতে অর্থের প্রবাহ বাড়ছে, যদিও ইউরোপিয়ান ফুটবলের চেতনা নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করে উয়েফা। অথচ ২০১২ সালে বহু-ক্লাব মালিকানার নেটওয়ার্কে ছিল মাত্র ৪০টি ক্লাব। 

উয়েফার গবেষণা পরিচালক আন্দ্রেয়া ট্রাভারসো ১১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে স্বীকার করেছেন, ‘বহু-ক্লাব মালিকানার কারণে ইউরোপিয়ান ফুটবলের মান হুমকির মুখে পড়তে চলেছে, কেননা এখন একই মালিকের দুটি ক্লাব মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে।’

তিনি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। আবুধাবিভিত্তিক মালিকের সিটি ফুটবল নেটওয়ার্কের দুই ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি ও জিরোনা। ম্যানচেস্টার সিটি এ মুহূর্তে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে, আর জিরোনা রয়েছে স্প্যানিশ লা লিগার দুইয়ে। ২৪ রাউন্ড শেষে পঞ্চম স্থানধারী অ্যাথলেটিক বিলবাও ক্লাবের চেয়ে ১০ পয়েন্টে এগিয়ে জিরোনা। আবার সিটি পঞ্চম স্থানধারী অ্যাস্টন ভিলার চেয়ে এক ম্যাচ কম খেলে ৬ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে। আগামী মৌসুমে দুটি ক্লাবই উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে উত্তীর্ণ হতে পারে এবং তাদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকছে।

ইউরোপের ফুটবল ক্লাবের এ বহু-ক্লাব মালিকানায় এখন সবচেয়ে বেশি কর্তৃত্ব আমেরিকানদের। শীর্ষ লিগের মোট ৩৭টি আর সব মিলিয়ে ৬৫টি ক্লাবের মালিকানায় যুক্ত আছেন মার্কিন ধনকুবেররা। আমেরিকানরা দ্বিতীয় স্থানধারী ইতালিয়ান মালিকদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ইতালিয়ানদের যৌথ মালিকানা আছে ১৪টি ক্লাব। 

যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা গ্রুপের মধ্যে রেডবার্ডের মালিকানায় এসি মিলান, ঈগল ফুটবলের মালিকানায় ফ্রান্সের অলিম্পিক লিঁও, ট্রিপল সেভেন পার্টনার্সের মালিকানায় ইংল্যান্ডের এভারটন। যদিও খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই নিজেদের কোম্পানি নিয়ে আইনি জটিলতার মুখে রয়েছে ট্রিপল সেভেন পার্টনার্স। এর মধ্যে রেডবার্ড এবং অ্যাস্টন ভিলার মালিকানায় থাকা আমেরিকান গ্রুপ ভি স্পোর্টসের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে উয়েফা নিযুক্ত একটি প্যানেল। রেডবার্ডের মালিকানায় থাকা ক্লাব ইতালির মিলান, ফ্রান্সের তুলুজ, ইংল্যান্ডের অ্যাস্টন ভিলা ও পর্তুগালের গিমারেজ—এ চারটি ক্লাবটি গত মৌসুমে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। 

উয়েফার বিচারকরা দেখতে পেয়েছেন, একই গ্রুপের মালিকানাধীন ক্লাবগুলো একে অপরের থেকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। ফলে তাদের জন্য বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যেমন বোর্ড সদস্যদের অপসারণ, বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়া কিংবা অন্য কোনো জায়গায় স্থানান্তর, এক বছরের ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞা আর খেলোয়াড় কেনা-বেচায় একই স্কাউট গ্রুপের ব্যবহার বন্ধ করা। 

গত জুলাইয়ে উয়েফা এক বিবৃতিতে বলেছিল, ‘এসব পরিবর্তন একাধিক ক্লাবে বিনিয়োগকারীদের প্রভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে খর্ব করতে সমর্থ হয়।’

জার্মানির লিপজিগ আর অস্ট্রিয়ার সলজবুর্গ উভয় ক্লাবই রেড বুল গ্রুপের মালিকানায়। ২০১৭-১৮ মৌসুমে তো দুটি ক্লাবই উঠে গেল চ্যাম্পিয়ন্স লিগে। সংকট তৈরি হলে, বিতর্ক উঠলে অনেক আলোচনার পর ক্লাব দুটিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার অনুমতি দিল উয়েফা। তারা বলছিল, রেড বুল গ্রুপের মালিকানাধীন হলেও ক্লাব দুটি ম্যানেজমেন্ট ভিন্ন, আবার লিগও ভিন্ন। ২০১৮-১৯ মৌসুমে দুটি দলের দেখা হলো ইউরোপা লিগে, যখন উভয় লেগই জিতে নিল সলজবুর্গ এবং লিপজিগ গ্রুপ পর্ব পেরোতে ব্যর্থ হয়। মুখোমুখি হওয়ার সেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে উয়েফার প্যানেল তখন দুই ক্লাবের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করার রুল জারি করেছিলেন। 

এবার অবশ্য উয়েফা এ বিষয়টিতে আগের চেয়ে বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ম্যানসিটি ও জিরোনার মালিকানা ইস্যুতে তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে? এমন এক প্রশ্নের জবাবে উয়েফার জেনারেল সেক্রেটারি থিওডোর থিওডোরিডিস বলেছেন, এখনই কোনো উত্তর দেয়া সমীচীন হবে না। 

আরেকটি সংকট তৈরি হবে একই গ্রুপের মালিকানাধীন দুটি ক্লাবের মধ্যে খেলোয়াড়দের দলবদল নিয়ে। উয়েফা মনে করে, ‘ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে’ নিয়মটি একই গ্রুপের মালিকানাধীন দুটি ক্লাবের মধ্যে খেলোয়াড় আদান-প্রদান কিংবা ধার প্রদান চুক্তিকে রহিত করবে। এপি

আরও