যে রাতে ইংলিশ 'নেতা' ব্রুককে চিনল বিশ্ব

পাকিস্তানকে প্রায় একার হাতে গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি কেবল একজন নেতা নন, এখন ইংল্যান্ড ক্রিকেটের প্রকৃত ত্রাতা।

মাত্র ৫১ বলে তার বিধ্বংসী সেঞ্চুরিটি শুধু চার-ছক্কার প্রদর্শনী ছিল না, বরং ছিল উপমহাদেশের উইকেটে ফ্লাড লাইটের নিচে রান তাড়ায় চরম পরিপক্ক ব্যাটিংয়ের নিদর্শন। মাঝেমধ্যে যখন উইকেট পড়ছিল, তখন তিনি সিঙ্গেল-ডাবলসে মন দিয়ে স্ট্রাইক ঘুরিয়ে গেছেন, খারাপ বলগুলো ছক্কা-চারে উড়িয়েছেন।

ইংল্যান্ড ক্রিকেটে নেতৃত্বের ধরন বহু রকম। মাইকেল ভনের তুখোড় ম্যান-ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে অ্যান্ড্রু স্ট্রসের নিখুঁত পরিকল্পনা, কিংবা বেন স্টোকসের সেই সম্মোহনী উপস্থিতি—একেকজন একেকভাবে ইংল্যান্ডকে টেনেছেন। কিন্তু হ্যারি ব্রুক? কাল রাতে পাল্লেকেলের মাঠে ব্রুক যা দেখালেন, তাতে স্ট্রসের গাম্ভীর্য বা স্টোকসের সেই বিশেষ 'আভা' না থাকলেও চলে। কারণ, চাপের মুখে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানকে প্রায় একার ব্যাটে গুঁড়িয়ে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি কেবল একজন নেতা নন, তিনি এখন ইংল্যান্ড ক্রিকেটের প্রকৃত ত্রাতা।

গতকালের রাতটা ছিল শুধুই ব্রুকের। পাকিস্তানের দেয়া ১৬৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ড যখন ইনিংসের প্রথম বলেই ওপেনার ফিল সল্টের উইকেট হারায় তখন ব্যাট করতে নামেন হ্যারি ব্রুক। সচরাচর ৪ কিংবা ৫ এ ব্যাট করেন ব্রুক। কিন্তু এদিন ‘সামনে থেকে নেতৃত্ব’ দিতেই কিনা, দ্বিতীয় বলেই চলে এলেন ক্রিজে। থাকলেন প্রায় শেষ পর্যন্ত। জস বাটলারের ব্যাডপ্যাচ এদিনও শেষ হলো না। বেথেল-ব্যান্টনরা কাটাতে পারেননি সময়, করতে পারেননি রান। টপ মিডল অর্ডারে কিছুই করতে পারলেন না কেউ।

ইংলিশদের পুরো ইনিংসকে ব্রুক একাই টেনেছেন বললে হয়তো একেবারেই অত্যুক্তি হবে না। ফিল সল্ট প্রথম বলেই আউট, একের পর এক উইকেট পড়ছে—কিন্তু ব্রুকের ব্যাটে ছিল অন্যরকম এক জেদ। মাত্র ৫১ বলে তার বিধ্বংসী সেঞ্চুরিটি শুধু চার-ছক্কার প্রদর্শনী ছিল না, বরং ছিল উপমহাদেশের উইকেটে ফ্লাড লাইটের নিচে রান তাড়ায় চরম পরিপক্ক ব্যাটিংয়ের নিদর্শন। মাঝেমধ্যে যখন উইকেট পড়ছিল, তখন তিনি সিঙ্গেল-ডাবলসে মন দিয়ে স্ট্রাইক ঘুরিয়ে গেছেন, খারাপ বলগুলো ছক্কা-চারে উড়িয়েছেন। চাপের সময় গতি কমিয়ে টিকে থেকেছেন, আবার সুযোগ দেখলে টেম্পো বাড়িয়েছেন। তার এই ইনিংসেই নিশ্চিত হয়েছে ইংল্যান্ডের টি-২০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিট।

অথচ এই শীতকালটা ব্রুকের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। ওয়েলিংটনে নাইটক্লাবের বাউন্সারের সঙ্গে ঝামেলা, অ্যাশেজে বাজে পারফরম্যান্স আর সেটা লুকানোর চেষ্টা—সব মিলিয়ে ব্রুক ছিলেন সমালোচনার কাঠগড়ায়। অনেকে তার ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু কাল রাতে ব্রুক দেখালেন, মাঠের বাইরের বিতর্ক তাকে দমাতে পারেনি।

আর সবশেষে, ব্রুকের এই ইনিংস তার কোচ ম্যাককালামের জন্যও ছিল নিঃশব্দ সমর্থনের বার্তা। অ্যাশেজে ভরাডুবির পর যিনি প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ছিলেন, তিনিই ম্যাচের সকালে সিদ্ধান্ত নেন ব্রুককে পাঁচ নম্বর থেকে তিনে তোলার। পাওয়ারপ্লে সর্বোচ্চ ব্যবহার করার এই ম্যাককালামীয় ফাটকাটাও দুই হাতে লুফে নিলেন ব্রুক।

মজার ব্যাপার হলো, যার ঝুলিতে এরইমধ্যে একটি বিশ্বকাপ মেডেল এবং টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি আছে, তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিল যে বড় মঞ্চে তিনি ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে পারেন না। কালকের ইনিংস দিয়ে সেই সব নিন্দুকের মুখ বন্ধ করে দিলেন ব্রুক। ক্রিজের ব্যবহার, ইনসাইড-আউট ব্যাটিং কিংবা রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে জয় এবং পাকিস্তানের মাঝে কাল একাই লড়ে ইংল্যান্ডকে জেতালেন হ্যারি ব্রুক।

এখন ইংল্যান্ডের সামনে সেমিফাইনাল। অস্ট্রেলিয়া বিদায় নিয়েছে, ভারতও দোদুল্যমান—এই অবস্থায় ইংল্যান্ডই এখন শিরোপার অন্যতম দাবিদার। পল কলিংউড, এউইন মরগান বা জস বাটলারের পর চতুর্থ ইংরেজ অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার খুব কাছে দাঁড়িয়ে হ্যারি ব্রুক। হয়তো তার স্টাইলটা একটু আলাদা, হয়তো তার মধ্যে এখনো সেই চঞ্চলতা আছে, কিন্তু কালকের পর একটা কথা নিশ্চিত—ইংল্যান্ড তাদের নতুন 'লিডার' খুঁজে পেয়েছে, যিনি সবচেয়ে কঠিন রাতে একাই আলো জ্বালাতে পারেন।

আরও