দীর্ঘ যন্ত্রণা, অবশেষে পরিত্রাণ। এবং সেই যন্ত্রণাগুলোই যেন এই রাত্রিকে আরো মধুর করে তুলল প্যারিস সেন্ট জার্মেইর জন্য। ২০১১ সালে কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টস ক্লাবটির মালিকানা নেয়ার পর থেকেই চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বপ্নে বিভোর ছিল তারা। ১২ বার নকআউট পর্বে উঠেও প্রত্যেকবার ব্যর্থ হওয়া, বারবার হৃদয়ভাঙা, এবং প্রতিবারই নতুন করে আশা। কিন্তু এইবার, ত্রয়োদশ প্রচেষ্টাতেই ফিরল ভাগ্য।
লুইস এনরিকের দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক পিএসজি দলটি এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ইন্টারের ওপর, যেন শুরু থেকেই ফলাফল নির্ধারিত। ম্যাচের ২০তম মিনিটে যখন ১৯ বছর বয়সী দেজাইরে দুয়ের গোলে ব্যবধান ২-০ হল, তখনই তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল—এই ফাইনাল একতরফা হতে চলেছে।
গোলের পর কাভিশা কাভারাশখেইয়া। ছবি- এপি
পিএসজি যেন রণতরী। বছর ঘুরে ইউরোপে দাপটের সঙ্গে খেলা এবং সেই ছন্দই তারা ধরে রেখেছিল ফাইনালে। ইন্টার মিলান যেন দাঁড়াতেই পারছিল না। সিমোন ইনজাঘির দল পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল পিএসজির ঢেউয়ের কাছে—এমন এক হার, যা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধান।
স্টেডিয়ামে হাজার হাজার পিএসজি সমর্থক মাঠে ঢুকে পড়লেও পুলিশ ব্যারিকেড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। আবেগপূর্ণ সেই মুহূর্তে মাঠের মধ্যে যেন পিএসজির প্রত্যেক পাস, প্রতিটি ছন্দ ও দৌড় ফুটিয়ে তুলেছিল এক কাব্যিক অনুষঙ্গ। ভিটিনিয়া ছিলেন কাণ্ডারি, সবকিছুর হৃদপিণ্ড।
প্রথম গোলটি এল তার অনবদ্য বিল্ডআপ থেকে। কাভারাশখেইয়া ও ফ্যাবিয়ান রুইজকে বামদিকে টেনে এনে তিনি বল বাড়ান দুয়ের দিকে আর দুয়ে দারুণ এক স্পিন টার্নে খুঁজে নেন ছয় গজ বক্সে ঢুকে পড়া আশরাফ হাকিমিকে। গোল! নিখুঁত, পিং-পং গোছের এক টিম গোল।
আশরাফ হাকিমির গোল। ছবি- এপি
২০তম মিনিটে ইন্টার যখন কর্নার আদায়ের চেষ্টা করছিল, তখনই আরো একটি ধ্বংসাত্মক কাউন্টার অ্যাটাক। প্যাচো বল দখলে নিয়ে কাভারাশখেইয়া ও দেম্বেলের দিকে বল বাড়ান, শেষমেশ দেম্বেলের পাস থেকে দুয়ের শট ফেদেরিকো দিমারকোর গায়ে লেগে দিক কিছুটা বদলে বিভ্রান্ত করল ইয়ান সমারকে। গোল, ২-০!
ইন্টার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল, তবে সেট পিস ছাড়া তেমন কোনো আশার আলো দেখা যায়নি। আচেরবি ও মার্কাস থুরামের হেডারগুলোতে বিপদের আশঙ্কা থাকলেও গোলমুখে কার্যত নিষ্প্রভ ছিল সেগুলো।
দ্বিতীয়ার্ধে প্রত্যাবর্তনের জন্য ইনজাঘির দলকে শক্ত কোনো আঘাত হানতে হত। কিন্তু তার বদলে আরো বিধ্বংসী রূপে দেখা দিল পিএসজি। দেম্বেলের ব্যাকহিল পাস, ভিটিনিয়ার নিখুঁত থ্রু বল, এবং দুয়ের ক্লিনিকাল ফিনিশ। তৃতীয় গোলেই খেলাটি কার্যত শেষ।
লাউতারো মার্তিনেজের শূন্য দৃষ্টি। ছবি-এপি
দুয়ে তার দ্বিতীয় গোলটি করলেন ভিটিনিয়ার দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট থেকে। এরপর কাভিশা কাভারাশখেইয়া সলো রানে এক অনবদ্য গোল করে ব্যবধান ৪-০ করেন। সবচেয়ে করুণ মুহূর্তটি এল তখন, যখন বদলি খেলোয়াড় ব্র্যাডলি বারকোলা ইন্টারের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ফ্রানচেস্কো আচেরবিকে এমনভাবে ছাড়িয়ে গেলেন, যেন প্রতিপক্ষকে অপমান করাই উদ্দেশ্য। যদিও সেই চেষ্টায় গোল হয়নি। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে ফাইনালে কখনো এতগুলো গোলের প্রয়োজনও পড়েনি!
শেষমেশ ৫-০ গোলে গল্প শেষ করলেন আরেক ১৯ বছর বয়সী—সেনি মায়ুলু। বারকোলার পাস থেকে গোল করে তিনি জয়ের সৌধে চূড়ান্ত প্রলেপ দেন। পিএসজি পেল বহু কাঙ্ক্ষিত ট্রেবল: লিগ, কাপ এবং এবার ইউরোপের সিংহাসন। ট্রফি নেয়ার পর সমর্থকদের উন্মোচন করা টিফোটি ছিল আবেগঘন—কোচ লুইস এনরিকের মেয়ে প্রয়াত জানার স্মৃতিকে উৎসর্গ করে। ২০১৯ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে ক্যান্সারে মারা যান জানা।
এই জয় লুইস এনরিকের। ছবি-এপি
শেষমেশ বারকোলার পাস থেকে মায়ুলুর গোলটি এক অর্থে প্রতীকী। ইউরোপের সিংহাসনে বসার অপেক্ষার অবসান পিএসজি ঘটালেও, এই রাতটা কেবল ফলাফলের নয়— এ রাতে ইউরোপের আকাশে ছিল সুন্দর ফুটবলের রোশনাই। তারকাখ্যাতি ঝেটিয়ে বিদায় করে লুইস এনরিকের ফুটবল দর্শনের জয়। ইউরোপের বাতাসে তারুণ্যের পায়ে ভর করে ফরাসি বিপ্লবের জয়রথ।