সানজিদা আক্তার খেলেন ইস্ট বেঙ্গলে, সাবিনা খাতুনের দল কিকস্টার্ট

ভারতের লিগে মুখোমুখি বাংলাদেশ নারী দলের দুই তারকা

ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগের সপ্তম আসরে গত ৩০ জানুয়ারি স্পোর্টস ওড়িশার মুখোমুখি হয় ইস্ট বেঙ্গল এফসি।

ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগের সপ্তম আসরে গত ৩০ জানুয়ারি স্পোর্টস ওড়িশার মুখোমুখি হয় ইস্ট বেঙ্গল এফসি। এ ম্যাচে চোখ ছিল বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদেরও। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের তারকা সানজিদা আক্তারের ওই ম্যাচে অভিষেক ঘটেছে। ইস্ট বেঙ্গলের প্রথম বিদেশী নারী হিসেবে অভিষিক্ত হন তিনি। সাবিনা খাতুন ও কৃষ্ণা রানী সরকারের পর বাংলাদেশের তৃতীয় নারী ফুটবলার হিসেবে বিদেশে লিগে অভিষেক ঘটে ২২ বছর বয়সী এ উইঙ্গারের।

এবারের লিগে সানজিদার আগেই বেঙ্গালুরু কিকস্টার্কের হয়ে মাঠে নেমেছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। পরে আরো এক ম্যাচ খেলেছেন তিনি। আগামীকাল বিদেশের এ লিগে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের দুই তারকা সাবিনা ও সানজিদা। কলকাতায় মুখোমুখি হবে সানজিদার ইস্ট বেঙ্গল আর সাবিনার কিকস্টার্ট এফসি কর্ণাটক। 

সাবিনা আর সানজিদা দুজনই দুই দলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ‘১০’ নম্বর জার্সি পেয়েছেন। আগামীকাল ময়দানের ইস্ট বেঙ্গল গ্রাউন্ডে ইস্ট বেঙ্গল আর কিকস্টার্টের লড়াইয়ে দুই দলের প্রাণভোমরা হয়ে খেলবেন ‘১০’ নম্বর জার্সিধারী বাংলাদেশের দুই তারকা। ৯০ মিনিট শেষে, কে হাসি নিয়ে মাঠ ছাড়েন, এখন সেই দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশের ফুটবল অনুরাগীরা। 

গত ১১ জানুয়ারি কিকস্টার্কের এক্স পোস্টে সাবিনাকে নিয়ে লেখা হয়, ‘কিকস্টার্টের সুখবর—দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ফুটবলার, বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন চলমান ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগে আমাদের দলে যোগ দিচ্ছেন।’

এভাবেই সাবিনাকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে কিকস্টার্ট। তিনি ২৪ জানুয়ারি প্রথম ম্যাচ খেলেছেন বেঙ্গালুরুর দলটির হয়ে। ওড়িশার সঙ্গে সেই ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র করে সাবিনার দল। ২৯ জানুয়ারি রাতে দিল্লির এইচওপিএস ক্লাবের কাছে ১-৫ গোলে হেরেছে কিকস্টার্ট। টানা দুই ম্যাচ খেলে জয়হীন সাবিনা। এবার জাতীয় দলের সতীর্থ সানজিদার দলের বিপক্ষে জিততে মরিয়া হয়ে মাঠে নামবেন সাবিনা। 

কিকস্টার্টে অভিষেকের আগে সাবিনা খাতুন দলটির এক্স অ্যাকাউন্টে দেয়া এক ভিডিওবার্তায় বলেন, ‘এ নিয়ে দ্বিতীয়বার আমি ভারতে খেলতে এসেছি। আমাকে এখানে খেলার আমন্ত্রণ জানানোয় কিকস্টার্ট দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আশা করি দলটির হয়ে আমি ভালো করব।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশের সমর্থকদের, যারা আমাকে অনেক সমর্থন দিয়েছেন। আমার এখানে আসার আগে ও আসার পর যারা সমর্থন দিয়েছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।’ 

সাবিনা এর আগেও ভারতের লিগে খেলেছেন। ফলে এবার তাকে ঘিরে অতটা উচ্ছ্বাস ছিল না, যতটা না হয়েছে সানজিদাকে নিয়ে। গত ২৫ জানুয়ারি কলকাতা পৌঁছেন সানজিদা। এয়ারপোর্টে তাকে স্বাগত জানান ইস্ট বেঙ্গলের কর্মকর্তারা। ক্লাবটির ‘এক্স’ পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘আমাগো বাসায় স্বাগতম, সানজিদা!’

কলকাতায় প্রথম ম্যাচ শেষে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে সানজিদা লিখেছেন, ‘কলসিন্দুর থেকে ময়দান। লম্বা সময়, চেনা-অচেনা মানুষ, আর আরাধ্য কিছু গল্প।’

কলসিন্দুর ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার প্রত্যন্ত এক এলাকা। সেখান থেকে উঠে আসা সানজিদা এখন বাংলাদেশ ফুটবলের অন্যতম শীর্ষ তারকা। এবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বিদেশের লিগেও নাম লেখালেন। তাকে ঘিরে এখন দুই বাংলায় প্রচণ্ড কৌতূহল। ঐতিহ্যবহুল এ ক্লাবটির প্রত্যাশা তিনি কতটা পূরণ করতে পারেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়। বিদেশের এ লিগে জয়ে সূচনা করতে পারেননি সানজিদা। তার অভিষেকের ম্যাচে ড্র করেছে ইস্ট বেঙ্গল।  

নতুন মিশন নিয়ে নিজের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে সানজিদা লিখেছেন, ‘শেখ মোহাম্মদ আসলাম, প্রয়াত মোনেম মুন্না, গোলাম মোহাম্মদ গাউস, রিজভী করিম রুমি। বাংলাদেশ ফুটবলের আর্কাইভে কী ভারী নাম! শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব প্রাঙ্গণে দেখলাম আমার দেশের সেই হিরোদের ছবি। অগ্রজদের সম্মান ও ইস্ট বেঙ্গলের আস্থার প্রতিদান দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।’

১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের অষ্টম ও প্রথম নারী হিসেবে ইস্ট বেঙ্গলে খেলছেন সানজিদা। ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে খেলেছেন বাংলাদেশের তারকা ফুটবলার শেখ আসলাম, মোনেম মুন্না, রুমি, গাউসরা। ১৯৯১ সালে মুন্নারা চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন ইস্ট বেঙ্গলকে। সানজিদাও দেশের সুনাম বয়ে আনতে চান। তিনি বলছিলেন, ‘আসলাম ভাই, মুন্না ভাইয়েরা সাফল্য নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশ থেকে গিয়ে চ্যাম্পিয়ন করিয়েছেন। আমি নারী দলের মধ্যে প্রথম ডাক পেয়েছি। আমিও সেরাটা দিয়ে সাফল্য নিয়ে আসার চেষ্টা করব।’

পাশাপাশি মজা করে এটাও বলেছেন, ‘আমার দল আছে ৫-৬ নম্বরে, জাতীয় দলেরও কেউ নেই। একা মেসি কতটা করতে পারে। তার পরও নিজের ১০০-১২০ ভাগ দেয়ার চেষ্টা করব আমি।’

প্রথম ম্যাচে অন্তত সেটাই দেখা গেল। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের এ উইঙ্গারের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যথেষ্ট ভালো হলেও দল জেতেনি। ফলে তার হতাশা ছিল। সানজিদা নিজের পারফরম্যান্সে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। ম্যাচশেষে বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি ভালো খেলার। বেশ কয়েকটি আক্রমণেও উঠেছি। তবে নিচ থেকে বলের জোগান আরো বেশি হলে ভালো হতো। দল জিততে পারলে আরো বেশি ভালো লাগত।’

ইস্ট বেঙ্গল নারী ফুটবল দলের ম্যানেজার ইন্দ্রানী সরকার অবশ্য বাংলাদেশী তারকার পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ‘সানজিদা আজ বেশ ভালো খেলেছে। প্রথম ম্যাচ হিসেবে যথেষ্ট ভালো। এ খেলা ধরে রাখতে হবে।’

সানজিদাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনাকে নিয়ে দুই বাংলায় বেশ আগ্রহ। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে অনেক আগ্রহ নিয়ে আপনার বিদেশের লিগে খেলার খবর আসছে। এ বিষয়টি আপনি কতটা উপভোগ করছেন? উত্তরে সানজিদা বলেন, ‘দেখেন আমি তো খেলতে আসছি, খেলা নিয়েই আপাতত আছি। আমার লক্ষ্যটা ভালো খেলা। দেশের যারা আগে এখানে খেলে গেছেন তারা যে কীর্তি গড়েছেন, তেমনই ভালো কিছু করার স্বপ্ন আমার। বাইরে কী ঘটছে তা নিয়ে আপাতত আমি জানি না।’

বাংলাদেশের লিগ ও ভারতের লিগের সঙ্গে তুলনা করতে বললে সানজিদা বলেন, ‘এখানে লিগটা অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। আমার ক্লাবই যেমন ৫-৬ নম্বরে থাকে। তবু আমি নিজের সেরাটা দিতে চাইব, ক্লাবকে যতটা সম্ভব টেনে তোলার চেষ্টা করব।’

জাতীয় দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য ও অধিনায়ক সাবিনাও এখন ভারতে। তবে থাকেন সানজিদা থেকে বেশ দূরে, বেঙ্গালুরুতে। তার কাছ থেকে পরামর্শ নেন জানিয়ে সানজিদা বণিক বার্তাকে বলেছেন, ‘আপুর সাথে প্রায়ই কথা হয়। ওনার পরামর্শ নিয়েছি আমি। ৫ ফেব্রুয়ারি ওনাদের ক্লাবের সঙ্গে আমাদের ম্যাচ আছে।’

৭ দলের এ লিগে ৮ ম্যাচে ১৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে গোকুলাম কেরালা। ইস্ট বেঙ্গল ৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের ৬ নম্বরে। সাবিনার দল কিকস্টার্ট ১৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে অবস্থান করছে।  

তবে টেবিলের হিসাব-নিকাশের চেয়েও এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্রীড়ামোদিদের আগ্রহ সানজিদাকে নিয়ে, আর সাবিনার সঙ্গে তার আগামীকালের দ্বৈরথ নিয়ে।

জাতীয় দলে সানজিদার অধিনায়ক সাবিনা, যিনি ২০১৮ সালে প্রথম ভারতের লিগে খেলেন। এরপর ভারতে ও মালদ্বীপে লিগও খেলেছেন। তবে কাল ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন সাবিনা। তিনি খেলবেন সানজিদার বিপক্ষে, বিদেশের লিগে। 

এ নিয়ে সানজিদার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কখনই সাবিনা আপুর বিপক্ষে খেলিনি। জাতীয় দলে যেমন একসঙ্গে খেলি, তেমনি বসুন্ধরা কিংসেও একসঙ্গে খেলে দুটি লিগ শিরোপাও জিতেছি। বিষয়টা একটু অন্য রকমই।’

আরও