ভাইকিং রো

গ্যালারিতে নর্ডিক আত্মার মহাকাব্য

নরওয়ের পুরনো লোককথা অনুযায়ী, যখন জগতের আদিমতম হিমবাহ গলে ফিয়র্ডের বুক চিরে প্রথম লোনা জলধারা আটলান্টিকের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন দেবরাজ ওডিন তার জাদুর লংশিপ স্কিডব্লাডনিরে বসে প্রথম দাঁড় ফেলেছিলেন সেই তরল স্তব্ধতায়।

দাঁড়ের মৃদু আঘাতে কেঁপে উঠেছিল উত্তরের আকাশ, আর সমুদ্রের অতল থেকে জেগে উঠেছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নিয়তি। নর্ডিক পুরাণের আলো-আঁধারিতে ঘেরা সেসব ধূসর সন্ধ্যায় হেইমডালের শিঙা বা গ্যালারহর্নের যে গভীর, অতিপ্রাকৃতিক ধনি দেবতাদের আসগার্ড থেকে মানুষের মিডগার্ড পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিত, তা আজ আর কেবল প্রাচীন পাণ্ডুলিপির পাতায় বন্দি কোনো রূপকথা নয়। ২০২৬ সালের এ উত্তপ্ত গ্রীষ্মে, আমেরিকার আধুনিক স্টেডিয়ামের কংক্রিটের মিনারগুলোকে কাঁপিয়ে যখন হঠাৎ একটি আদিম নর্ডিক শিঙার গম্ভীর আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয় সময় যেন তার সরলরেখা হারিয়ে বৃত্তাকার হয়ে গেছে। হাজার বছরের ঘুম ভেঙে সেই প্রাচীন লোকগাথা যেন জীবন্ত হয়ে আছড়ে পড়ছে আধুনিক ফুটবলের সবুজ ঘাসে। গ্যালারির হাজার হাজার মানুষ যখন হঠাৎ তাদের আসন ছেড়ে ধপাস করে প্লাস্টিকের মেঝেতে বসে পড়ে, তখন তারা হয়ে ওঠে এক অন্তহীন সমুদ্রের নাবিক।

সেই শিঙার ধনির রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় ড্রামের গম্ভীর, মন্থর ঠোকা। প্রথম ডাবকা আওয়াজটি যখন স্টেডিয়ামের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয় তা যেন মেঘের আড়ালে থাকা দেবরাজ থরের সেই কিংবদন্তি হাতুড়ি মিয়োলনিরের মৃদু আঘাত। হাজার হাজার নরওয়েজীয় সমর্থক তখন একজনের পিঠের সঙ্গে আরেকজনের বুক ঠেকিয়ে সমান্তরাল লাইনে বসে পড়েছেন, ঠিক যেমনটা হাজার হাজার বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষেরা বসতেন ওক কাঠের তৈরি লংশিপের সংকীর্ণ গলুইতে। ড্রামের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার জোড়া হাত একসঙ্গে শূন্যে প্রসারিত হয়, যেন তারা আঁকড়ে ধরেছেন ওক কাঠের তৈরি ভারী, জলসিক্ত কোনো অদৃশ্য দাঁড়। শরীরগুলো এক ছন্দে কোমর থেকে ভেঙে সামনে ঝুঁকে পড়ে, পরক্ষণেই পুরো জান লড়িয়ে দিয়ে পেছনের দিকে টেনে আনে সেই কাল্পনিক দাঁড়। প্রতি দুই বিটের মাথায় সমস্বরে এক আদিম চিৎকার বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে—‘রো!’

নর্ডিক ভাষার সেই শব্দের অর্থ দাঁড় বাওয়া, কিন্তু এ গ্যালারিতে এসে সেই শব্দ যেন এক জাদুকরী মন্ত্রে রূপ নেয়। বোস্টনের পাতালে চলন্ত এস্কেলেটরে, নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের জ্যামিতিক নিয়ন আলোর নিচে কিংবা স্টেডিয়ামের গ্যালারির নীল আসনে যেখানেই এ মানুষ বসছে, সেখানেই জেগে উঠেছে কাল্পনিক সমুদ্র, যার উত্তাল তরঙ্গে দুলছে একটি আস্ত জাতি।

নরওয়ে এমন এক দেশ, যার ইতিহাস লেখা হয়েছে জলের ভাষায়। পাহাড়গুলো এত খাড়া, এত রূঢ়, যে মানুষকে বাধ্য হয়ে বেছে নিতে হয়েছিল সমুদ্রকেই। স্থলপথে যেখানে ছিল কেবল বাধা আর দুর্গমতা, সেখানে ফিয়র্ডের গভীর নীল জল ছিল মুক্তির একমাত্র পথ। প্রতিটি ফিয়র্ড যেন একেকটা দরজা, যা খুলে দিত পৃথিবীর দিকে। এ ভূগোলই একদিন জন্ম দিয়েছিল লংশিপের। কাঠের পাঁজরে গড়া, নমনীয় অথচ শক্তিশালী এক নৌযান, যার পেটে বসে থাকত ১৬, ৩২, কখনো ৬০ জন নাবিক, প্রত্যেকের হাতে একটা করে দাঁড়। পালও থাকত বটে, বাতাস অনুকূল হলে; কিন্তু ফিয়র্ডের সংকীর্ণ প্রণালিতে, পাথরের খাঁজে খাঁজে যেখানে বাতাস খামখেয়ালি, সেখানে ভরসা ছিল কেবল মানুষের বাহু আর কাঁধ। একটা লংশিপ চলত তখনই, যখন প্রতিটা দাঁড় একই ছন্দে জলে পড়ত—একজন বেতাল হলে পুরো জাহাজ টলে উঠত, গতি হারাত, দিক হারাত। তাই দাঁড় টানা কখনো একার কাজ ছিল না; ছিল বিশ্বাসের একটা অনুশীলন, যেখানে নিজের শরীরকে সঁপে দিতে হতো পাশের মানুষের ছন্দে।

অথচ এ উন্মাদনা যে প্রকৃতির বুকে জন্ম নিয়েছে, তার চরিত্র বড্ড শান্ত, স্তব্ধ ও বিষাদময়। নরওয়ের ফিয়র্ডগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে হাজার ফুট উঁচু কালো পাহাড়গুলো বরফের সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে অনন্তকাল ধরে আয়নার মতো শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই জল এতটাই নিথর যে একটি পাখির ডানার শব্দও সেখানে প্রতিধ্বনিত হয়। এ বরফশুভ্র নিস্তব্ধতা আর প্রকৃতির গম্ভীর একাকিত্বের বিপরীতে স্টেডিয়ামের এ নরক গুলজার করা গর্জন এক তীব্র বৈপরীত্যের জন্ম দেয়। যে জাতি সাধারণত নিজেদের গুটিকে রাখতে ভালোবাসে, যাদের প্রাত্যহিক জীবন ফিয়র্ডের মতোই শান্ত ও সংযত, তারা যখন স্টেডিয়ামের ভেতরে এসে এমন আদিম উল্লাসে ফেটে পড়ে, তখন মনে হয় যেন শত শত বছরের জমাট বাঁধা বরফ এক নিমেষে আগ্নেয়গিরির লাভা হয়ে বেরিয়ে আসছে। এ সমুদ্রনির্ভর জীবনই নরওয়েকে গড়ে তুলেছে। যেখানে চাষের জমি পাথুরে আর আকাশ বছরের বেশির ভাগ সময় ধূসর মেঘে ঢাকা, সেখানে বেঁচে থাকার একমাত্র পথ ছিল সমুদ্রের ওই অনিশ্চিত জলরাশি। সেই জলরাশিকে জয় করার জন্য তারা তৈরি করেছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ময় ভাইকিং লংশিপ।

আধুনিক সমাজ মানুষকে বড্ড একা করে দিয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ স্ক্রিনের সামনে এক একজন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বেঁচে থাকে। কিন্তু যখনই এ গ্যালারিতে ড্রামের আওয়াজ ওঠে, তখন সেই বিচ্ছিন্ন মানুষ আর একা থাকে না। তারা সবাই মিলে হয়ে ওঠে একটি ‘ক্রু’ বা জাহাজের সম্মিলিত দল।

এ বিশ্ব কাঁপানো উদযাপনের পেছনেও আছেন ওলে ফ্রয়স্তাদ নামের একজন সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শীতে জমে যাওয়া এক সন্ধ্যায় অসলোর এক নিঝুম বারের কোনায় বসে ওলে যখন তার নোটবুক খুলে হিজিবিজি কাটছিলেন, তখন তার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। দীর্ঘ ২৭ বছর পর তার দেশ বিশ্বকাপে যাচ্ছে, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে তাদের নিজস্ব পরিচয়টা কী হবে? আইসল্যান্ডের থান্ডার ক্ল্যাপ ২০১৬ সালে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল, কিন্তু নরওয়ের তেমন কিছু নেই।

হঠাৎ ওলের মনে পড়ে গেল প্রায় এক দশক আগে দেখা রোজেনবার্গ ক্লাবের সেই বিখ্যাত গ্যালারি চ্যান্টের কথা, যেখানে স্টেডিয়ামের তিনদিকের গ্যালারি থেকে পর্যায়ক্রমে ভেসে আসত ‘রো!’, ‘সেন!’, ‘বার্গ!’ শব্দগুলো। ওলের শিক্ষকসুলভ মনস্তত্ত্বে বিদ্যুচ্চমকের মতো খেলে গেল একটি ভাবনা—নরওয়েজীয় ভাষায় ‘রো’ মানে দাঁড় বাওয়া! ভাইকিংরা যখন যুদ্ধের জন্য পাল গুটিয়ে নিত, তখন তারা এ দাঁড়ের ওপর ভর করেই তীরের দিকে এগিয়ে যেত। ওলে তখনই তার নোটবুকে খসড়া তৈরি করলেন এমন এক উদযাপনের, যা হবে সংক্ষিপ্ত, সহজ, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকবে তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি এবং যা গ্যালারিতে তৈরি করবে এক প্রলয়ঙ্করী প্রভাব। তিনি তার এ স্বপ্ন নিয়ে গেলেন অলজেবের্গেট সমর্থক গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান মুখ তরস্তাইন হামরানের কাছে। ২০২৬ সালের মার্চে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে তারা প্রথম এর পরীক্ষা চালালেন, কিন্তু প্রথমবার এটি বড্ড হাস্যকর আর সস্তা দেখাল।

বিশ্বকাপের মাঠে নরওয়ের সমর্থকদের ভাইকিং রো ছবি: ফিফা

ওলে বুঝতে পারলেন, শুধু হাত নাড়ালে হবে না; এর পেছনে আসল নর্ডিক ফর্ম প্রয়োজন। এরপর সুইডেন ম্যাচের আগে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও পোস্ট করে ভক্তদের শেখাতে লাগলেন হাত সোজা করো, পিঠ বাঁকাও, কোমর থেকে শক্তি আনো। সুইডেন ম্যাচের সেই চূড়ান্ত মহড়ার একটি সাধারণ ভিডিও ওলে যখন তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করলেন, তখন রাতারাতি তা ডিজিটাল ফিয়র্ডের বুকে আগুনের মতো ছড়িয়ে করল।

মাঠের এ গ্যালারির আগুনকে জাতীয় আচারে পরিণত করার কাজটি করলেন নরওয়ের ফুটবল রাজপুত্ররা। বিশ্বকাপের আগে পুরো দল যখন চামড়া, পশুর লোম আর হাতে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে অফিশিয়াল ছবির জন্য পোজ দিল, তখনই বোঝা গিয়েছিল এরা এসেছে বিশ্বকে নিজেদের জাত চেনাতে। আর মাঠের সেনাপতি, আর্সেনালের মাঝ মাঠের জাদুকর মার্টিন ওডেগার্ড যখন সেনেগালের বিপক্ষে জয়ের পর গ্যালারি থেকে ড্রাম চেয়ে নিয়ে নিজে বাজাতে শুরু করলেন এবং মাঠের সবুজ ঘাসে পুরো দল বসে পড়ে দাঁড় টানার অভিনয় করল, তখন এ উদযাপন ফুটবলীয় গিমিক থেকে নরওয়ের জাতীয় প্রতীকে রূপান্তরিত হলো। এর পর আর একে থামানো যায়নি। নরওয়ের রাজপুত্র ম্যাগনাস অসলোর চলন্ত সাবওয়ে ট্রেনের মেঝেতে বসে দাঁড় টানলেন, দেশটির সংসদ ভবনের ভেতরে স্পিকার মাসুদ ঘারাহখানির নেতৃত্বে গম্ভীর এমপিরা স্যুট-টাই পরে মেঝের কার্পেটে বসে গেলেন, বিমানবাহিনীর পাইলটরা তাদের ফাইটার জেটের ককপিটের সংকীর্ণ জায়গায় বসে হাতের কাল্পনিক দাঁড় টানলেন, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণরাও হুইলচেয়ারে বসে এ ছন্দে শামিল হলেন।

তবে নরওয়ের এ ভাইকিং পরিচয় প্রতিবেশী স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মধ্যে এক মৃদু সাংস্কৃতিক মালিকানার দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। সুইডেন, ডেনমার্ক আইসল্যান্ডের মানুষও নর্ডিক রক্তের উত্তরাধিকারী। সুইডিশ ডিফেন্ডার গুস্তাফ ল্যাগারবিয়েলকে যখন টিভিতে এ দৃশ্য দেখে ঈর্ষাকাতর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, তখন সুইডেনের ইতিহাসবিদরা খাতাকলম নিয়ে বসে যান প্রমাণ করতে দাঁড় টেনে নদী আর উপকূল পার হওয়ার প্রকৃত কৃতিত্ব আসলে পূর্ব-ভাইকিং বা সুইডিশদের; নরওয়ের ভাইকিংরা ছিল মূলত আটলান্টিক পাড়ি দেয়া পালের জাহাজের দূরপাল্লার নাবিক। ফলে নরওয়েজীয়রা আসলে সুইডিশ ভাইকিংদের অনুকরণ করছে বলে স্টকহোমের পণ্ডিতরা দাবি করেন। কিন্তু এ বিতর্কের ওপারেও কিছু অস্বস্তিকর সত্য লুকিয়ে থাকে। ভাইকিংদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লুণ্ঠন, নির্মম দাসপ্রথা, চরম পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং আধুনিক সময়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার উগ্র ডানপন্থী ও নব্য-নাৎসি গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা নর্ডিক প্রতীকের অপব্যবহার। কিন্তু নরওয়ের সংসদ সদস্য মিমির ক্রিস্টিয়ানসন যখন গর্জে উঠে বলেন, নাৎসিরা থর, ওডিন বা ভালহাল্লার মালিক নয়, আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে আনার অধিকার আমাদের আছে, তখন এ ফুটবলীয় উদযাপন এক ভিন্নমাত্রা পায়। এটি যেন সেই অন্ধকার অতীত এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে নর্ডিক ঐতিহ্যকে মুক্ত করে এক আনন্দময়, সর্বজনীন ও উৎসবমুখর আলোয় ফিরিয়ে আনার প্রয়াস।

নরওয়ের এ ফুটবল রূপকথা আর গ্যালারির সমুদ্রযাত্রা আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি জাতির নিজের শেকড়ে ফেরার আকুল আর্তি। ফিয়র্ডের সেই শান্ত জলরাশি যেভাবে পাহাড়ের বুকে হাজার বছর ধরে নিজের আয়না ধরে রেখেছে, এ উদযাপনও যেন নরওয়ের মানুষের সামনে তাদের অতীতকে এক নতুন আলোয় মেলে ধরেছে। তারা যখন আমেরিকার স্টেডিয়ামে বা নিজ দেশের রাজপথে মেঝের ওপর বসে দাঁড় টানে, তখন তারা আসলে সব আধুনিক জটিলতা, রাজনীতির হিসাব আর বৈশ্বিক সংকটের ক্লান্তি থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য মুক্তি পায়। ড্রামের প্রতিটি আঘাত যেন তাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন যত কঠিনই হোক না কেন, যদি সবাই মিলে একই ছন্দে দাঁড় টানা যায়, তবে যেকোনো উত্তাল সমুদ্রই পার হওয়া সম্ভব। এ সরল কিন্তু গভীর জীবনদর্শনই আজ ফুটবল বিশ্বকে মোহিত করেছে। মেক্সিকোর সমর্থকেরা যখন নিজেদের চেনা স্লোগান ভুলে নরওয়েজীয়দের সঙ্গে বসে মাটিতে হাত চালায়, কিংবা জাপানি দর্শক যখন ড্রামের তালে শরীর দোলায়, তখন বোঝা যায় এ নর্ডিক ঐতিহ্যের আবেদন কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। এটি হয়ে উঠেছে মানুষের এক চিরন্তন সাম্য আর ঐক্যের উৎসব।

ইতিহাসের পাতায় ভাইকিংদের যে হিংস্র আর রক্তপিপাসু রূপ আমরা সচরাচর দেখে অভ্যস্ত, গ্যালারির এ দৃশ্য যেন তার এক নান্দনিক সংশোধন। লুণ্ঠন আর তরবারির ঝনঝনানির আড়ালে যে অসাধারণ একতাবদ্ধতা, যে অদম্য অভিযাত্রী মন এবং যে প্রকৃতিনির্ভর জীবনসংগ্রাম নর্ডিক সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছিল, আজ ফুটবল মাঠে তারই এক শৈল্পিক পুনর্জন্ম ঘটেছে। ওসেবার্গ জাহাজের সেই খোদাই করা অলংকরণ আর গোকস্টাড জাহাজের গতিময় প্রকৌশল আজ মানুষের পেশির টানে, গলার গর্জনে আর চোখের দীপ্তিতে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।

নরওয়ের বিশ্বকাপযাত্রা শেষ হয়েছে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে। লংশিপটি শেষ পর্যন্ত ফুটবলের স্বর্ণতীরে পৌঁছতে পারেনি। তবে মাঠের জয়-পরাজয়ের লৌকিক হিসাব কিংবা স্কোরবোর্ডের নশ্বর অংক ছাপিয়ে গ্যালারির এ দৃশ্য যেন একবিংশ শতাব্দীর বিচ্ছিন্ন মানুষের বুকে ওক কাঠের লংশিপের সেই আদিম একাত্মতা খোদাই করে দিয়ে গেল।

মাহফুজ রাহমান: সাংবাদিক ও লেখক

আরও