বিপ্লবী লুহানীর পুরো নাম গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী। তার জন্ম ১৮৯২ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জের আমলাপাড়ায়। সমকালে লুহানীর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও প্রভাবশালী। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে লুহানী সিরাজগঞ্জ থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, কৌতূহলী এবং অগ্রগামী চিন্তার অধিকারী।
পরিবার
লুহানীর বাবার নাম গোলাম আজম খান; তিনি আইন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। মায়ের নাম সৈয়দা সিরাজুন্নেসা খাতুন। লুহানী তার মায়ের কাছে চিঠি পাঠাতেন ‘মাজু’ নামে। এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মতিউর রহমান তার ‘গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী এক অজানা বিপ্লবীর কাহিনি স্তালিনের নৃশংসতার শিকার এক বাঙালি’ শীর্ষক গ্রন্থে লুহানীর ডাকনাম ‘মাজু’ বলে উল্লেখ করেছেন।
লুহানীরা ছিলেন তিন ভাই। বড় ভাই গোলাম আরব আলী খান, মেজ ভাই গোলাম ইসলাইল খান এবং ছোট গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী। তাদের দুজন বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন; তারা হলেন, গোলাম আজহার আলী খান ও গোলাম আফজাল আলী খান। বৈমাত্রেয় ভাই গোলাম আফজাল আলী খান সিরাজগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। রওশন আরা লোহানী ও ফাতেমা লোহানী নামে লুহানীর দুই বোন ছিল।
গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর স্ত্রীর নাম গ্যাব্রিয়েল লুহানী। তিনি ফরাসি মডেল ও ফ্যাশন ডিজাইনার ছিলেন। গ্যাব্রিয়েলের লেখা চিঠিতে তিনি নিজের নাম জি লুহানী অর্থাৎ গ্যাব্রিয়েল লুহানী বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যত্র তার নাম গ্যাব্রিয়েল মেরি সোয়েন পাওয়া যায়। গ্যাব্রিয়েলের জন্মস্থান ও পরিবার সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন ফরাসি বংশোদ্ভূত এবং পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। লন্ডনের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রজার ফ্রাইয়ের ‘ওমেগা ওয়ার্কশপ’ শীর্ষক প্রতিষ্ঠানে সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। গ্যাব্রিয়েল ইতালীয় বিখ্যাত শিল্পী মোদিরিয়ানির (১৮৮৪-১৯২০ খ্রি.) আঁকা ছবির মডেলও হয়েছিলেন।
গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর সঙ্গে গ্যাব্রিয়েলের বিয়ে হয় ১৯১৯ সালে, লন্ডনে। বিয়ের কিছুদিন পর লুহানীর সঙ্গে গ্যাব্রিয়েলের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তবে ১৯২৪ সালে দুজনের সম্পর্ক আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। দাম্পত্য সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার খবর জানিয়ে শাশুড়িকে চিঠিও লিখেছিলেন গ্যাব্রিয়েল। এসব তথ্য থেকে এ কথা সহজেই অনুমেয় যে লুহানীর স্ত্রী গ্যাব্রিয়েল শুধু শিল্প ও ফ্যাশনজগতের নারীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন সাহসী জীবনসঙ্গিনী। লুহানীর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়েও তিনি তার পাশে থেকেছেন। শাশুড়িকে লেখা চিঠিপত্র থেকে বোঝা যায়, লুহানীর পরিবারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন গ্যাব্রিয়েল। ১৯৪৩ সালে গ্যাব্রিয়েল লুহানী মারা যান।
উচ্চশিক্ষা ও বিপ্লবী রাজনীতির মহাদিগন্ত বিস্তার
ম্যাট্রিক শেষ করার পর লুহানী ভর্তি হন তৎকালে ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে তিনি আধুনিক শিক্ষা এবং মুসলিম সমাজে নবজাগরণের ধারা সম্পর্কে অবগত হন। উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ তাকে নিয়ে যায় বিদেশে। তিনি ভর্তি হন লন্ডন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সে।
লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি শ্রমিক আন্দোলন, সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা এবং ইউরোপীয় রাজনৈতিক দর্শনের সংস্পর্শে আসেন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। লেনিনের নেতৃত্বে জারতন্ত্র পতন এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘটনা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই সময় থেকেই তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
লুহানীর নিজের হাতে লেখা নথিপত্র থেকে জানা যায়, তিনি ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকতা, অনুবাদক ও ভাষার শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। ইংরেজি ছাড়াও ফরাসি, জার্মান, ফারসি ও হিন্দি ভাষায় তার দক্ষতা ছিল।
ব্রিটিশ শিল্পী রজার ফ্রাইয়ের আঁকা গ্যাব্রিয়েলের ছবি। সূত্র: মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট
পড়াশোনা শেষ করে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে শুরু করেন। যদিও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গণ-আন্দোলনের প্রধান ধারক ছিল, লুহানী কংগ্রেসের নরমপন্থী রাজনীতিকে যথেষ্ট মনে করতেন না। তিনি চেয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে শুধু ব্রিটিশদের পরাজিত করাই নয়, বরং শোষণমুক্ত নতুন সমাজ গঠন করতে।
লুহানী ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রাথমিক সংগঠকদের একজন। তিনি শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং তরুণদের সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তার বক্তৃতা, লেখনী ও সংগঠক হিসেবে দক্ষতা তাকে দ্রুত পরিচিতি এনে দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা ও বিপ্লবী পুরুষ এম. এন. রায় তার স্মৃতিকথায় লুহানীকে উত্তরবঙ্গের বুদ্ধিমান মুসলিম ও চৌকস বক্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১৯২১ সালের মে মাসে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সাতজন ভারতীয় প্রবাসীর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও আলোচনায় যোগ দেয়ার জন্য প্রথম মস্কো যান লুহানী। সে সময় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের (কমিন্টার্ন) সমর্থন না পেয়ে দলটি ফিরে আসে। কিন্তু লুহানী মস্কোতে থেকে যান এবং কমিন্টার্নের অ্যাজিটপ্রপ (কমিউনিজম প্রচার বিভাগ) বিভাগে কাজ করেন। ১৯২১ সালের পর লুহানী প্যারিসে অবস্থান করেন। সেখানে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘দ্য মাসেস অব ইন্ডিয়া’ সম্পাদনা করতেন। সে সময় পত্রিকাটি বিভিন্নভাবে ভারতে পাঠানোর কাজও করেন।
১৯২৫ সালে লুহানী প্যারিসে থাকাকালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ এনে তার ফ্রান্সে বসবাসের অনুমতি বাতিল করা হয়। এরপর তিনি মস্কো চলে যান। মস্কোতে দীর্ঘ সময় থাকাকালে রাজনীতি ও বহুমাত্রিক কাজে যুক্ত থাকেন। বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীদের সহযোগিতা, ১৯৩০-৩৬ পর্যন্ত রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডেরিক সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকে রাজনৈতিক বিভাগের সম্পাদক, ১৯৩২-৩৪ পর্যন্ত নারিমানোভ ইনস্টিটিউটের খণ্ডকালীন বিভাগীয় প্রধান, মস্কোর ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের বাংলা ভাষার শিক্ষক এবং মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারত বিষয়ে ক্লাসও নিয়েছেন।
সোভিয়েতজীবনের করুণ অধ্যায়
সোভিয়েত ইউনিয়নে লুহানী মার্ক্সবাদী রাজনীতির গবেষণা, লেখালেখি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘ সময়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি নিজেই পড়ে যান স্তালিনের শাসনামলের ভয়াবহ ‘গ্রেট পার্জ বা গ্রেট টেরর’ (১৯৩৬-৩৮) দমন অভিযানে। বিদেশী বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবীদের অনেকেই সে সময় ‘বিদেশী গুপ্তচর’ সন্দেহে আটক হন। লুহানীকেও একই অভিযোগে ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয়। সে বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। গুলি করে হত্যার মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর নাম আজ সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি পরিচিত নয়। তবে তার জীবনকাহিনী ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। তিনি ছিলেন প্রথম দিককার বাঙালি বিপ্লবীদের একজন, যিনি উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি আলীগড় থেকে লন্ডন এবং সেখান থেকে মস্কো পর্যন্ত জীবনের পথ অতিক্রম করেছেন। তার স্বপ্ন ছিল শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভারতীয় কমিউনিস্ট রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। তবে ইতিহাসের পরিহাস হলো, যে আদর্শের জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই সোভিয়েত ইউনিয়নেই তিনি স্তালিনের দমননীতির শিকার হন।
এ বিষয়ে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অর্থনীতির অধ্যাপক ইন্দ্রনীল দাশগুপ্তের মন্তব্য হলো, স্তালিনকে আজও বেশির ভাগ ভারতীয় কমিউনিস্ট দল পূজা করে, অথচ তিনজন ভারতীয় কমিউনিস্ট তার দমননীতির শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তারা হলেন অবনী মুখার্জি, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী। তারা সবাই স্তালিনের গ্রেট পার্জ অভিযানে নিহত হন। কিন্তু এ বিপ্লবীদের নাম ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে তেমনভাবে জায়গা পায়নি। তাই এখন সময় এসেছে এ মানুষদের ভুলে না গিয়ে ইতিহাসে তাদের যথাযথ স্থান দেয়ার। তারা ছিলেন অসাধারণ মেধাবী, বিদ্বান, বিশ্বজনীন, বহুভাষাবিদ এবং পেশাদার বিপ্লবী।
তথ্যসূত্র:
১। মতিউর রহমান, গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী এক অজানা বিপ্লবীর কাহিনি স্তালিনের নৃশংসতার শিকার এক বাঙালি, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন, ২০২৪
২। ডকুমেন্টস অব দ্য কমিউনিস্ট মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া, ভলিউম-১ (১৯১৭-১৯২৮), ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
৩। কাউন্টারভিউ নেটে প্রকাশিত ‘থ্রি ইন্ডিয়ান রেভল্যুশনারিজ হু বিকাম ভিকটিমস অব স্ট্যালিন’স অপ্রেসিভ রেজিম’ শীর্ষক প্রতিবেদন, ২ নভেম্বর ২০২২
বাশার খান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা