বড় কথা, ছোট কাজ

ভদ্রলোকরা সে অর্থে আর সুবিধাজনক জায়গা পায়নি। ব্রিটিশরা স্বীয় জাতির ঊর্ধ্বে গিয়ে ভদ্রলোকদের বেশি সুবিধা দেয়াকে সমর্থন করেনি। বরং ব্রিটিশ নন-অফিশিয়াল সম্প্রদায় কলকাতায় ক্রমে আধিপত্য বিস্তার করেছে। বিপরীতে জায়গা করে নিয়েছে তুলনামূলক তরুণ ও গরমপন্থীরা। বিশ শতকের প্রথম দিনগুলোয় ভদ্রলোকদের কথাবার্তা যথেষ্ট ঝাঁঝলো থাকলেও তাদের কার্যক্রম ছিল তুলনামূলকভাবে গৌণ

বিশ শতকের গোড়ার দিকেই বাংলার ভদ্রলোকদের মাঝে সরকারের প্রতি অসন্তোষ দানা বাঁধে। ১৯১৫ সালের গোড়ার দিকে বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর তা প্রকাশ্য রূপ নেয়। বাঙালি ভদ্রলোকরা ধরে নেন এটা তাদের সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত। মার্চে ভারতের প্রতিরক্ষা অ্যাক্ট পাস হলে সব মহল থেকেই প্রতিবাদ আসে। অম্বিকাচরণ মজুমদার বেশ দৃঢ় কণ্ঠেই ঘোষণা দেন বাঙালির বিশ্বাসের সঙ্গে সরকার প্রতারণা করেছে। অথচ বছর তিনেক আগেই তিনি ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ও প্রশংসাস্তুতি পাঠ করেছেন।

বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার কয়েক বছর পর থেকেই বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীর আত্মবিশ্বাস কমে যেতে থাকে। যে আশা নিয়ে তারা বঙ্গভঙ্গ রদকে স্বাগত জানিয়েছিল, তা মিইয়ে যেতে দেরি হয়নি। নির্বাচনের পরও যেহেতু নির্বাহী ক্ষমতাই ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে, ফলে সেখানে এ ভদ্রলোক শ্রেণীর খুব বেশি কিছু করার ছিল না। এ পরিস্থিতিতে নিজেদের পড়ে থাকতে দেখাটা একদিকে যেমন ছিল অস্বস্তিকার; অন্যদিকে ছিল হতাশাজনক। এদিকে তরুণ ও গরমপন্থী রাজনীতিকদের সন্ত্রাসী হামলার জন্যও মধ্যমপন্থী ভদ্রলোকরা অস্বস্তিতে পড়ে যান। তাদের জন্য তখন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ অবস্থা। স্বদেশী আন্দোলনের নেতা বিপিন চন্দ্র পাল হিন্দু রিভিউ পত্রিকায় লেখেন, ‘বঙ্গভঙ্গের রদের মধ্য দিয়ে যা প্রত্যাশা করা হয়েছে, তা মেলেনি।’ কয়েক বছরের ব্যবধানে ভদ্রলোক মধ্যমপন্থী শ্রেণীও বিপিন চন্দ্র পালের কথায় সম্মত হন। তারা স্বীকার করেন ক্ষমতার চাবিকাঠি মূলত আইনসভার হাতে নেই। ক্ষমতা নির্বাহী ক্ষমতায় থাকা ব্রিটিশদের হাতেই। যেহেতু আইনসভায় তখন ভদ্রলোক জনগোষ্ঠীই ছড়িয়ে আছে, ফলে তাদের ক্ষমতাহীনতা দিনশেষে ভদ্রলোক গোষ্ঠীর ক্ষমতাহীনতা। এর মধ্য দিয়ে তারা যে সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদ নিয়ে কথা বলতেন, তার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। প্রশ্ন দেখা দেয় ভারতীয়দের ওপর যৌক্তিক আকারে ক্ষমতা হস্তান্তরের। ক্রমে পরিস্থিতি আরো ঘোলা হতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ঠিক এ সময়টায়ই। ব্রিটিশ সরকারের নজর সেদিকে নিবন্ধ থাকায় কিছু বিষয় আড়ালেই চলে যায়।

মধ্যমপন্থী রাজনীতিকরা প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সংবিধান সংশোধনের দাবি জানায়, যার নেতৃত্ব দেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। ব্যানার্জি মনে করতেন, সংবিধান সংস্কার করা সবার আগে জরুরি। কারণ স্বরাজের প্রাথমিক শর্ত হলো আইনসভাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া। আইনসভা কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই ভারতীয়দের ভাগ্য ভারতীয়রা নির্ধারণ করতে পারবে। মধ্যমপন্থী ভদ্রলোক রাজনীতিকদের অনুসিদ্ধান্ত ছিল, সব সমস্যার গোড়া হলো মূলত সরকারি প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। সেটা নিয়ে তারা কথা বললেও কার্যকর হয়নি। তারা যে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানায়নি, এমনও নয়। সে সময়ে যেহেতু যুদ্ধ চলছে, এর চেয়েও বড় বড় সমস্যা ছিল সমাধানের অপেক্ষায়।

১৯১৬ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যা বঙ্গভঙ্গ রদের পর থেকেই অনেকটা ধারণা করা যাচ্ছিল। বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হয় নির্বাচনের পরেই। সনাতন ও নরমপন্থী সাবেক পাঁচজন জেলা ও স্থানীয় বোর্ড সদস্য পরাজিত হন তরুণ ও গরমপন্থী নেতার কাছে। ভদ্রলোক জনগোষ্ঠীর রাজনীতি দাঁড়িয়ে ছিল স্থানীয় প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে। আর স্থানীয় প্রভাব তখনো একেবারে ফিকে না হলেও জাতীয়তাবাদী প্রবণতা শক্তিশালী হয়ে উঠছিল ক্রমে। এর আগে ১৯১৩-১৬ সাল পর্যন্ত কাউন্সিল রাজনীতি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে বড় পরিসরের রাজনীতিতে। বিশেষ করে বাংলায় প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভদ্রলোক শ্রেণীকে সংযুক্ত করার জন্য স্থানীয় রাজনীতি ছিল একটা দরজার মতো।

ব্রিটিশ নিয়ন্তার সামনে তখন নানা সমীকরণ। সুযোগের পাশাপাশি বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা যে ছিল না, তা না। উপমহাদেশের রাজনীতিতে নরমপন্থীদের অবস্থা তখন নাজুক। নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে গরমপন্থীদের হাতে। ১৯১৬ সালে একটা ইশারা প্রকাশিত হয়েছে মাত্র। নতুন সদস্যদের প্রথম বড় ধাক্কাটি ছিল ইমপেরিয়াল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির প্রতিনিধি হিসেবে সুরেন্দ্রনাথকে স্বীকৃতি না দেয়া। বিষয়টা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। কারণ সুরেন্দ্রনাথকে মানা হবে না, এটা আগে কেউ ধারণা করতে পারেনি। ১৯১৭ সালে বাজেটবিষয়ক বিতর্কে একের পর এক সদস্য সমালোচনা করতে থাকে সরকারের। অভিযোগকারীদের মধ্যে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন, ছিলেন চট্টগ্রামের অখিল দত্তও।

বাংলার রাজনৈতিক অসন্তোষ সরকারের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আঞ্চলিক প্রশাসন, শিক্ষা ও ভদ্রলোক শ্রেণীর জন্য নয়া রাজনৈতিক সুযোগ তৈরির প্রক্রিয়া চলতে থাকে। অভিযোগ ওঠে পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়েও। সে সময় আঞ্চলিক প্রধান সচিবের জবাব ছিল সন্তোষজনক। আসলে ততদিনে অনেকেই বুঝতে পারছিলেন, বাংলা তাবৎ ভারতের হৃদয়। বাংলার অস্থিতিশীলতা মানে তাবৎ ভারতের অস্থিতিশীলতা।

বিপ্লবীরা নানাভাবে তাদের চিন্তা প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। কথা বলছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত ও সনাতনী সদস্যরাও রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাইতেন। তবে তাদের প্রক্রিয়া কিছুটা আলাদা ছিল। ১৯১৭ সালে স্যার হেনরি হুইলার বাংলার নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত হন। অন্যদিকে নতুন গভর্নর হয়ে আসেন আর্ল অব রোনাল্ডশে। রোনাল্ডশে বাংলায় ঢুকেই বুঝে ফেলেছিলেন একটি অনিবার্য সংঘাত সামনে অপেক্ষা করছে। তিনি সেভাবেই সম্পর্ক তৈরির দিকে মনোযোগ দিলেন। ভারতে তখন অন্তত তিনটি পৃথক শ্রেণী সামনে। প্রথমত ভদ্রলোক শ্রেণী, দ্বিতীয়ত নন-অফিশিয়াল ইউরোপীয়, তৃতীয়ত মুসলমান। তিনি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় বিচার করতে চাইলেন।

সে সময় ভদ্রলোকদের মধ্যে অবিশ্বাস ঘনীভূত হতে শুরু করে। তারা প্রাথমিকভাবে মর্লি-মিন্টুর চুক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন। দ্রুতগতিতে সে সীমাবদ্ধতাগুলো সংস্কারের দাবি জানায়। তারা মধ্যমপন্থী ও ভদ্রলোকের স্বার্থ নিয়ে সরব হওয়া শুরু করে। বিভিন্ন সভা ও পত্রিকায় উঠে আসতে শুরু করে তাদের দাবি-দাওয়া। এতদিনের আনুগত্যের পর তারা যা পেয়েছে, তা মূলত হতাশা। ফলে ব্রিটিশরাও সে হারিয়ে ফেলা বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। ভদ্রলোকরা এবার থেকে সন্দেহ নিয়ে তাকাতে থাকে সরকারের কাজকর্মের দিকে। বিশেষ করে মন্টেগু ডিক্লারেশনের পর সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দিহান হয়। আগে যেগুলোকে তারা মান্য করত, যেন তার থেকে তারা পুরোপুরি সরে গেছে।

১৯২০ সালে স্যার আবদুর রহিমকে দেয়া হয় জেলের দায়িত্ব। একজন বাঙালি মুসলিম তিনি। কয়েক মাস পরেই কাউন্সিল বাড়ানো হয়। রোনাল্ডশে বেশ মনোযোগ দিয়ে তার আশপাশে একটা রক্ষণশীল শ্রেণী তৈরি করতে থাকেন। রোনাল্ডশের কাছে ব্যক্তিগত এক চিঠিতে চেমসফোর্ড রক্ষণশীল ঘরানার একটা শ্রেণী তৈরির দিকে ইশারা করেন। একটা তালিকায় তিনি ৫৪ জন রক্ষণশীল ও মধ্যমপন্থী মানুষের নামও পরামর্শ দেন। সেটা করা হয় ব্রিটিশ শাসনের ভারসাম্যের কথা বিবেচনা করেই। কিন্তু যে ভদ্রলোক ও অভিজাত শ্রেণী গড়ে উঠেছিল, তাদের ক্ষমতা স্তিমিত হতে থাকে। ক্রমে সাধারণত মানুষ প্রশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ করতে থাকে। ক্ষমতা কাঠামোয় আসতে থাকে পরিবর্তন। তবে ভদ্রলোকদের জন্য তখন আরো বড় একটা আঘাত আসতে শুরু করেছে।

মন্টেগু নন-অফিশিয়াল ইউরোপীয়দের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। তারা প্রথম দিকে নারাজ থাকলেও ক্রমে স্বর উঁচু করতে থাকে। সম্ভবত তারাই ভদ্রলোকদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটায় আঘাত করেছে। কারণ তারা পা এগিয়ে এনেই প্রাথমিকভাবে ভারতীয়দের সঙ্গে নিজেদের পার্থক্য নিয়ে সতর্ক হলো। তারা নিজেদের ভারতীয়দের সমান ভাবতে অস্বীকৃতি জানাল। ঘোষণা করল, ভারতীয়রা সংসদীয় অগ্রগতির জন্য উপযুক্ত না। ভারতের জন্য এখনো সময় হয়নি গণতন্ত্র চর্চার। সোজা কথায় তারা সরাসরি ভদ্রলোকদের অস্তিত্বই অস্বীকার করল। তাদের ভাষ্য, ভদ্রলোকদের ওপর ভরসা করা যায় না। তাদের ওপর যদি শাসনক্ষমতা ছেড়ে দেয়া কিংবা নির্ভর করা হয়, তাহলে ভালো কিছু হবে না। নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে হলে ভদ্রলোকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে হবে। এ বিরোধিতা বাংলায় ভদ্রলোক শ্রেণীর কফিনে শেষদিকের একটা কফিন হয়ে বিঁধে যায়।

ভদ্রলোকরা সে অর্থে আর সুবিধাজনক জায়গা পায়নি। ব্রিটিশরা স্বীয় জাতির ঊর্ধ্বে গিয়ে ভদ্রলোকদের বেশি সুবিধা দেয়াকে সমর্থন করেনি। বরং ব্রিটিশ নন-অফিশিয়াল সম্প্রদায় কলকাতায় ক্রমে আধিপত্য বিস্তার করেছে। বিপরীতে জায়গা করে নিয়েছে তুলনামূলক তরুণ ও গরমপন্থীরা। বিশ শতকের প্রথম দিনগুলোয় ভদ্রলোকদের কথাবার্তা যথেষ্ট ঝাঁঝলো থাকলেও তাদের কার্যক্রম ছিল তুলনামূলকভাবে গৌণ। ফলে কয়েক দশকের মধ্যেই তাদের বাংলার রাজনৈতিক বাঁক পরিবর্তনে অপাঙক্তেয় ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে দেখা যায়।

আহমেদ দীন রুমি: লেখক ও সাংবাদিক

আরও