চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে নাসার আর্তেমিস ২। উৎক্ষেপণের সময় বিপুল জ্বালানি দহন, মহাকাশে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কিংবা গভীর মহাশূন্যের অনিশ্চয়তা—সবকিছু পেরিয়ে এলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, মিশনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ এখনো বাকি। সেটি হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ বা ‘রিএন্ট্রি’। এটি এমন এক ধাপ, যেখানে সামান্য ত্রুটিও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
রিএন্ট্রির সময় মহাকাশযানটি ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল (প্রায় শব্দের গতির ৩০ গুণ) বেগে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। এ উচ্চগতিতে বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের অণুগুলোর তীব্র সংকোচন ঘটে, যার ফলে ভয়াবহ তাপ সৃষ্টি হয়। এ তাপমাত্রা মহাকাশযানের বাইরের অংশকে প্রায় ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট (২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নভোচারীদের সুরক্ষার একমাত্র ভরসা হচ্ছে ক্যাপসুলের তাপঢাল (হিট শিল্ড), যা পুরো আঘাত ও তাপ নিজের ওপর নিয়ে ভেতরের ক্রুদের নিরাপদ রাখে।
সাবেক নাসা নভোচারী ও তাপঢাল বিশেষজ্ঞ চার্লি কামার্ডা মনে করেন, জেনে-বুঝে ত্রুটিযুক্ত তাপঢাল নিয়ে মহাকাশে মানুষ পাঠানো দায়িত্বজ্ঞানহীন। তার মতে, তাপঢালের ফাটল কীভাবে বাড়তে পারে বা উড়ানের সময় কী ধরনের ব্যর্থতা তৈরি করতে পারে—তা পুরোপুরি বোঝা যায়নি
কিন্তু এই তাপঢাল নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগ। ২০২২ সালে পরিচালিত মানববিহীন ‘আর্তেমিস’ মিশন শেষে ওরিয়ন ক্যাপসুলের তাপঢালে অস্বাভাবিক গর্ত ও ফাটল দেখা যায়। যদিও সেই মিশন সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে, তবুও এই ক্ষতির ধরন নাসার প্রকৌশলীদের জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে ‘অ্যাভকোট’ নামের যে উপাদান দিয়ে তাপঢাল তৈরি, তা রিএন্ট্রির সময় ঠিক কী আচরণ করবে তা অনেকের কাছে অনিশ্চিত।
আর্তেমিস ২ মিশনের চার অভিযাত্রী। ছবি: নাসা
হিট শিল্ড মহাকাশযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা। এটি ব্যর্থ হলে বিকল্প কোনো উপায় থাকে না। বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে নভোচারীদের উদ্ধার করার মতো কোনো ‘এস্কেপ সিস্টেম’ নেই। অর্থাৎ, তাপঢালের গুরুতর ব্যর্থতা মানেই মিশন ও ক্রু—উভয়েরই সম্ভাব্য ক্ষতি।
আরো জটিল বিষয় হলো, আর্তেমিস ২ মিশনের জন্য ব্যবহৃত ওরিয়ন ক্যাপসুলের তাপঢাল প্রায় একই নকশা ও উপাদানের, যা আর্তেমিস ১-এ ব্যবহৃত হয়েছিল। এমনকি আগের মিশনের সমস্যাগুলো শনাক্ত হওয়ার আগেই তাপঢালটি আর্তেমিস ২ ক্যাপসুলে স্থাপন করা হয়। ফলে এর কাঠামো বা উপাদানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সুযোগ ছিল না।
এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নাসা বিকল্প কৌশল নিয়েছে। আর্তেমিস ১-এ ব্যবহৃত ‘স্কিপ রিএন্ট্রি’ পদ্ধতির পরিবর্তে এবার ‘লোফটেড রিএন্ট্রি’ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। স্কিপ পদ্ধতিতে মহাকাশযান প্রথমে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে আবার কিছুটা ওপরে উঠে দ্বিতীয়বার প্রবেশ করে। ফলে তাপ ও চাপ দুই ধাপে ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু এতে তাপঢালে একাধিকবার চাপ পড়ে।
অন্যদিকে, নতুন ‘লোফটেড রিএন্ট্রি’ পদ্ধতিতে মহাকাশযান একটানা ও নিয়ন্ত্রিত পথে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এতে তাপের প্রকৃতি কিছুটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে এবং হঠাৎ তাপের ধাক্কা কমানো যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাসার কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিবর্তিত পথ তাপঢালের ওপর চাপ কিছুটা কমাবে, যদিও এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকি দূর করবে না।
নাসা বলছে, আর্তেমিস ১-পরবর্তী এক বছরের বেশি সময় ধরে বিস্তৃত তদন্ত, বিশ্লেষণ ও মাটিতে পরীক্ষার মাধ্যমে তারা তাপঢালের আচরণ ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে। তাদের দাবি, তাপঢাল সর্বোত্তমভাবে কাজ না করলেও ক্রুদের নিরাপদে ফেরানো সম্ভব হবে।
নাসার শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং নভোচারীরা আত্মবিশ্বাসী। তাদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করা হয়েছে এবং নতুন রিএন্ট্রি কৌশল অনুসরণ করলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তারা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
মিশন শেষে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর উপকূলে ক্যাপসুল অবতরণের পরপরই তাপঢালের অবস্থা মূল্যায়ন শুরু হবে। নভোচারীদের উদ্ধার করার সময়ই ডুবুরি পানির নিচে নেমে তাপঢালের ছবি তুলবে, যা এর পারফরম্যান্স সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেবে।
আর্তেমিস ২ অভিযাত্রীদের চোখে পৃথিবী। ছবি: নাসা
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। সাবেক নাসা নভোচারী ও তাপঢাল বিশেষজ্ঞ চার্লি কামার্ডা মনে করেন, জেনে-বুঝে ত্রুটিযুক্ত তাপঢাল নিয়ে মহাকাশে মানুষ পাঠানো দায়িত্বজ্ঞানহীন। তার মতে, তাপঢালের ফাটল কীভাবে বাড়তে পারে বা উড়ানের সময় কী ধরনের ব্যর্থতা তৈরি করতে পারে—তা পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
যদিও তিনি স্বীকার করেন, মিশনটি নিরাপদেই ফিরে আসার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু তার আশঙ্কা, যদি সবকিছু ঠিকঠাক হয়, তবে নাসার নীতিনির্ধারকরা ভবিষ্যতে আরো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত হতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে।
অন্যদিকে, নাসার শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং নভোচারীরা আত্মবিশ্বাসী। তাদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করা হয়েছে এবং নতুন রিএন্ট্রি কৌশল অনুসরণ করলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তারা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
নাসা আরো জানিয়েছে, এই পরিবর্তিত রিএন্ট্রি কৌশল শুধু আর্তেমিস ২-এর জন্যই ব্যবহার করা হবে। ভবিষ্যতের মিশনগুলোয়, বিশেষ করে আর্তেমিস ২, আরো উন্নত ও পরিবর্তিত উপাদানের তাপঢাল ব্যবহার করা হবে, যা ফাটল সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আর্তেমিস ২ মানুষের মহাকাশ অভিযানের একটি বড় পদক্ষেপ হলেও এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো সামনে। মহাকাশে যাওয়া যতটা কঠিন, নিরাপদে ফিরে আসা তার চেয়েও বেশি জটিল—আর সেই শেষ কয়েক মিনিটই ঠিক করে দেবে এই মিশনের প্রকৃত সাফল্য।
সিএনএনের অবলম্বনে