অর্থনৈতিক শ্লথগতির অভিঘাত এবার স্মার্টফোন বিক্রিতে

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীনে প্রলম্বিত লকডাউন, শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীনে প্রলম্বিত লকডাউন, শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে। এতে সেমিকন্ডাক্টর, ব্যক্তিগত কম্পিউটার (পিসি), এলসিডি প্যানেলসহ প্রায় সব ধরনের পণ্য ও শিল্প উপকরণ বিক্রি কমেছে। শীর্ষ প্রযুক্তি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ক্যানালিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি ৯ শতাংশ কমেছে। সাশ্রয়ী গ্যালাক্সি এ সিরিজের স্মার্টফোনে ভর করে শীর্ষ স্মার্টফোন বিক্রেতা কোম্পানি স্যামসাংয়ের বাজার হিস্যা দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক স্মার্টফোন জায়ান্টটির বিক্রি হয়েছে প্রায় ছয় কোটি ইউনিট। এখনো আইফোন ১৩-এর উচ্চচাহিদায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা অ্যাপলের বাজার হিস্যা ১৭ শতাংশ। প্রথম প্রান্তিকে ৩১ কোটির বেশি স্মার্টফোন বিক্রি হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা ২৭ কোটি ৫০ লাখ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই প্রান্তিকে স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছিল ৩১ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট।

সাংহাই, কুনশানসহ চীনের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোয় কয়েক মাসের লকডাউনের ধাক্কায় শীর্ষ এ স্মার্টফোন বাজারে স্মার্টফোন ও পিসি বিক্রি কমেছে। শাওমি, অপো ও ভিভোর মতো চীনা ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রিতে দুই অংকের সংকোচন হয়েছে। তবে ভারত, আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপের বাজারে ভর করে চীনা এ তিন ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক বাজার হিস্যা যথাক্রমে ১৪, ১০ ও ৯ শতাংশ।

ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক সংস্থাটির বিশ্লেষক টবি ঝু বলেন, গ্রাহক চাহিদা হ্রাস পুরো স্মার্টফোন সরবরাহ চেইনের জন্যই উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও ব্যয় বৃদ্ধির চাপ কমলেও কয়েকটি উদীয়মান বাজারের লজিস্টিকস ও উৎপাদন খাতে শঙ্কা রয়ে গেছে।

মহামারীর প্রথম দুই বছরে পেশাগত প্রয়োজন ও বিনোদন চাহিদা পূরণে স্মার্টফোন, ট্যাব ও পিসির চাহিদা রেকর্ড সর্বোচ্চে দাঁড়িয়েছিল। বিষয়টি আমলে নিয়ে স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানিগুলোও বাজারে নিত্যনতুন মডেলের হ্যান্ডসেট নিয়ে আসে। ভোক্তাদের কাছে এখন বিভিন্ন বিকল্প। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় জরুরি প্রয়োজনীয় পণ্য বাদে ব্যয় কমাচ্ছে ভোক্তারা। বাজারে মাঝারি দামের স্মার্টফোনে অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে গ্রাহকরা পছন্দের ফোন বাছাইয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে আবার সাশ্রয়ী ফোন কেনায় ঝুঁকছে। তৃতীয় প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের নতুন ফোল্ডেবল ফোন ও অ্যাপলের নতুন আইফোন উন্মোচনের কথা চলছে। এ কারণে হাই-এন্ড স্মার্টফোনের অনেক গ্রাহকই দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন ফোন ক্রয় থেকে বিরত।

কয়েক মাস ধরেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল, দ্বিতীয় প্রান্তিক তথা পুরো বছরের স্মার্টফোন বিক্রি কমবে। গত মে মাসের মাঝামাঝিতে  চীনভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (এসএমআইসি) এক পূর্বাভাসে জানায়, চলতি বছরে স্মার্টফোন বিক্রি ২০ কোটি ইউনিট কমতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনে সাম্প্রতিক করোনা লকডাউনের প্রভাবে স্মার্টফোন ও পিসির বাজারে এ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা চীনভিত্তিক শীর্ষ চিপ নির্মাতা কোম্পানিটির।

এসএমআইসির সিইও ঝাও হাইজুন বলেন, বৈশ্বিক চিপস্বল্পতা, স্মার্টফোন, পিসি ও গৃহস্থালি পণ্যের ব্যাপক চাহিদায় গত কয়েক প্রান্তিকে চিপ সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছিল এসএমআইসি। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনে সাম্প্রতিক লকডাউনের ফলে অনেক ক্রেতা ক্রয়াদেশ বাতিল করছেন। এতে ভুক্তভোগী স্থানীয় চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানিগুলো। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় লক্ষণীয় পরিমাণে ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে। স্মার্টফোন ও পিসি বিক্রি হ্রাসের সম্ভাবনায় এসএমআইসির উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ শতাংশে নেমে আসছে। কয়েক প্রান্তিকে বৈশ্বিক চিপের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এসএমআইসির উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ শতাংশ ছুঁয়েছিল।

এসএমআইসি সিইও আরো জানান, শেনঝেন, সাংহাই ও বেইজিংয়ে ২৮ ন্যানোমিটারের ফ্যাব্রিকেশন প্লান্ট স্থাপন করা হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে শেনঝেন ফাউন্ড্রির যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে সেখানে উৎপাদন শুরু হতে পারে। নির্মীয়মাণ ফাউন্ড্রিগুলোর জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিলম্বের মুখোমুখি হচ্ছে এসএমআইসি। এতে পূর্বপরিকল্পিত সময়ে ফাউন্ড্রি চালু এবং ওয়েফার নির্মাণ ব্যাহত হতে পারে।

এদিকে শীর্ষস্থানীয় মেমোরি চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাইক্রন টেকনোলজিসের সাম্প্রতিক এক পূর্বাভাসে বলা হয়, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে স্মার্টফোন বিক্রি আগের প্রত্যাশার চেয়ে কম হতে যাচ্ছে। ভোক্তা চাহিদা কমার ফলে দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় সব স্মার্টফোন বিক্রেতা কোম্পানিরই বিক্রি কমবে। মাইক্রনের সিইও সঞ্জয় মেহরোত্রা বলেন, চলতি বছরে স্মার্টফোন বিক্রি গত বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ কমতে পারে। যদিও চলতি বছরে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল, স্মার্টফোন বিক্রি আগের বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ বাড়বে। মাইক্রনের পূর্বাভাসে আরো বলা হয়, চলতি বছরে ব্যক্তিগত কম্পিউটার (পিসি) বিক্রি গত বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ কমতে পারে।

কিছু পিসি ও স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানি এরই মধ্যে গ্রাহক চাহিদার ওপর দাঁড়িয়ে তাদের মজুদ সমন্বয় করছে বলে জানান মেহরোত্রা। মাইক্রন সিইও আরো বলেন, সংখ্যার অংকে দ্বিতীয়ার্ধে স্মার্টফোন বিক্রি কমতে পারে ১৩ কোটি ইউনিট।

মহামারীর দুই বছরে স্মার্টফোন ও পিসির চাহিদা চাঙ্গা থাকার পর সম্প্রতি শ্লথগতি দেখা দিয়েছে। মাইক্রনের পূর্বাভাসে এর ইঙ্গিত স্পষ্ট। ঘরে থেকে কাজ ও ক্লাসের কারণে মহামারীর দুই বছরে স্মার্টফোন ও পিসির চাহিদা রেকর্ড সর্বোচ্চে দাঁড়িয়েছিল। অ্যাপল, মটোরোলা ও আসুসসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে মেমোরি চিপ সরবরাহ করে আসছে মাইক্রন। সম্প্রতি এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয়াদেশ হ্রাসে মাইক্রনের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দ্বিতীয়ার্ধে স্মার্টফোন ও পিসি বিক্রি কমবে।

হংকংভিত্তিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের সর্বশেষ মাসিক বিক্রির উপাত্তে দেখা গেছে, গত মে মাসে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট। এতে এক দশকের মধ্যে স্মার্টফোন বিক্রি দ্বিতীয়বারের মতো ১০ কোটি ইউনিটের নিচে নেমে এল। এ নিয়ে টানা দুই মাসে স্মার্টফোন বিক্রি কমেছে।

চীনা বাজার ও ইউক্রেন সংকট নিয়ে কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বরুণ মিশ্র বলেন, সাংহাই, কুনশান ও বেইজিংয়ে কয়েক মাসের লকডাউনে অর্থনৈতিক শ্লথগতির কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা যেমন কমেছে, তেমনি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে প্রভাব ফেলেছে। মে মাসে লকডাউন প্রত্যাহার করা হলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় দেশটির স্মার্টফোন বাজার। কিন্তু স্মার্টফোন বিক্রি গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম ছিল।

প্রথমার্ধে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারে অস্থিরতা থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা প্রশমন হবে বলে পূর্বাভাস কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের। চীনে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া, সরবরাহ চেইনে ভারসাম্য ফেরায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আগস্টের দিকে চীনে স্কুল খুলছে, তার পরই ভারতে দীপাবলি উৎসব। বছরের শেষ দিকে রয়েছে ক্রিসমাস ও নতুন বর্ষ উদযাপন। এ সময়ে স্যামসাং বাজারে আনতে যাচ্ছে গ্যালাক্সি  ফোল্ড ও ফ্লিপ সিরিজের ফোল্ডেবল ফোন এবং অ্যাপল আনতে যাচ্ছে আইফোন ১৪। এতে বাজারে নতুন চাহিদার সৃষ্টি হবে এবং স্মার্টফোন বিক্রি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি চার বছরের সর্বোচ্চ ছিল। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২১ সালে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৩৯ কোটি ইউনিট। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ডাটা করপোরেশনের (আইডিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ১৩৫ কোটি ইউনিটে দাঁড়িয়েছে।

কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ জানায়, ২০১৭ সালে রেকর্ড ১৫৬ কোটি ইউনিট স্মার্টফোন বিক্রি হয়। তত্পরবর্তী তিন বছরে স্মার্টফোন বিক্রি কমেছে। উত্তর আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা ও ভারতের বাজারে চাঙ্গা বিক্রির  জেরে ২০২১ সালে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি চার বছরের সর্বোচ্চে দাঁড়িয়েছিল।

গত বছর স্মার্টফোন বিক্রিতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল স্যামসাং। করোনাকালে ভিয়েতনামে কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও গত বছর স্যামসাংয়ের বিক্রি ৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ১০ লাখ ইউনিট। চীনের বাজারে রেকর্ড সর্বোচ্চ বাজার হিস্যার মাধ্যমে গত বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্মার্টফোন বিক্রি করেছে অ্যাপল। আইফোন ১২ ও আইফোন ১৩-এর ওপর ভর করে গত বছর অ্যাপলের স্মার্টফোন বিক্রি ১৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ৭৯ লাখ ইউনিট। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিক্রি বেড়েছে আইফোনের। এমনকি চতুর্থ প্রান্তিকে ৮ কোটি ১৫ লাখ ইউনিট আইফোন বিক্রি করে স্যামসাংকে হটিয়ে সর্বোচ্চ স্মার্টফোন বিক্রেতা ব্র্যান্ড ছিল অ্যাপল।

করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে এলে এবং সরবরাহ চেইন সংকট নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে চলতি বছরেও স্মার্টফোন শিল্পের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আশাবাদী কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ। তবে কিছু বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ কিংবা ২০২৩ সাল নাগাদ বৈশ্বিক চিপ স্বল্পতা বহাল থাকবে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করা, ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট প্রলম্বিত হওয়া, শীর্ষ অর্থনীতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন রূপ পাওয়ায় চলতি বছর স্মার্টফোন, পিসিসহ ভোক্তা খাত সবল হওয়া নিয়ে আশাবাদী নয় অনেকেই।

আরও