৮ বছরে ১ হাজার কোটি কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বুধের দুয়ারে ‘বেপিকলম্বো’

বুধে অভিযান চালানো এত কঠিন হওয়ার প্রধান কারণ সূর্য। বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ কিলোমিটার। পৃথিবীতে যেখানে সূর্যকে একবার ঘুরতে ৩৬৫ দিন লাগে, সেখানে বুধ মাত্র ৮৮ দিনে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে

প্রায় আট বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে বুধ গ্রহের একেবারে কাছে পৌঁছে গেছে মহাকাশযান বেপিকলম্বো। এই সময়ে মহাকাশযানটি পাড়ি দিয়েছে ১ হাজার কোটি কিলোমিটারের বেশি পথ। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) ও জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করছে। বুধ কীভাবে তৈরি হয়েছে, সূর্যের এত কাছে থেকেও গ্রহটি কীভাবে টিকে আছে এবং এর ভেতরের গঠন কেমন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে বেপিকলম্বো।

২০১৮ সালের অক্টোবরে ফ্রেঞ্চ গায়ানার কুরু মহাকাশকেন্দ্র থেকে আরিয়ান-৫ রকেটে মহাকাশে পাঠানো হয় বেপিকলম্বোকে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে বুধের দিকে এগিয়েছে এটি। পৃথিবী থেকে বুধ খুব বেশি দূরে নয়। তারপরও সেখানে পৌঁছাতে এত সময় লাগার কারণ হলো, সরাসরি বুধের দিকে গেলে মহাকাশযানের গতি এত বেড়ে যায় যে পরে সেটিকে গ্রহটির কক্ষপথে ঢোকানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

সূর্যের কাছাকাছি পরিবেশে বেপিকলম্বোর দুটি অরবিটারের চলাচলের শিল্পীর কল্পচিত্র। ছবি: ইএসএ

এ কারণে বেপিকলম্বোকে সরাসরি বুধের দিকে পাঠানো হয়নি। যাত্রাপথে পৃথিবী, শুক্র ও বুধের পাশ দিয়ে মোট নয়বার ঘুরিয়ে এর গতি কমানো এবং দিক পরিবর্তন করা হয়েছে। মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতিকে ‘গ্র্যাভিটি অ্যাসিস্ট’ বলা হয়। সহজভাবে বললে, কোনো গ্রহের মহাকর্ষকে কাজে লাগিয়ে মহাকাশযানের গতি ও পথ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

এতদিন বেপিকলম্বোকে বহন করে নিয়ে এসেছে ‘মার্কারি ট্রান্সফার মডিউল’ নামে একটি অংশ। এখন সেই অংশটির কাজ শেষ। এটি মূল মহাকাশযান থেকে আলাদা হবে। ইএসএর কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটিও সহজ নয়। কোনো সমস্যা হলে পুরো মিশন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তবে এই ধাপ সফলভাবে শেষ হলেও সঙ্গে সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু হবে না। বেপিকলম্বোর দুটি আলাদা মহাকাশযান রয়েছে। একটি ইউরোপের তৈরি ‘মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটার’ বা এমপিও। অন্যটি জাপানের তৈরি ‘মার্কারি ম্যাগনেটোসফেরিক অরবিটার’ বা মিও।

আগামী ২১ নভেম্বর এই দুটি মহাকাশযান বুধের মহাকর্ষের মধ্যে ঢুকে গ্রহটির চারদিকে ঘুরতে শুরু করবে। এরপর ডিসেম্বর মাসে তারা একে অন্যের কাছ থেকে আলাদা হবে। সব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করে ২০২৭ সালের এপ্রিলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পুরোপুরি শুরু হওয়ার কথা।

বুধে অভিযান চালানো এত কঠিন হওয়ার প্রধান কারণ সূর্য। বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ কিলোমিটার। পৃথিবীতে যেখানে সূর্যকে একবার ঘুরতে ৩৬৫ দিন লাগে, সেখানে বুধ মাত্র ৮৮ দিনে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বুধের পাশ দিয়ে ষষ্ঠবার উড়ে যাওয়ার সময় বেপিকলম্বোর তোলা ছবি। এ ফ্লাইবাইয়ের মাধ্যমে মহাকাশযানটির গতি সমন্বয় করা হয়। ছবি ইএসএ

সূর্যের খুব কাছে থাকায় বুধের দিনের তাপমাত্রা প্রায় ৪৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এত তাপের মধ্যে কোনো মহাকাশযানের যন্ত্র সচল রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে বেপিকলম্বোর দুটি মহাকাশযানকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। অতিরিক্ত তাপ থেকে বাঁচতে জাপানের মিও মহাকাশযানটি প্রতি মিনিটে ১৫ বার ঘুরবে। ইউরোপের এমপিও তার সৌরপ্যানেল এমনভাবে রাখবে, যাতে প্রয়োজনীয় আলো পাওয়া যায়, কিন্তু অতিরিক্ত তাপে সেটি নষ্ট না হয়।

বুধ সৌরজগতের সবচেয়ে কম অনুসন্ধান করা গ্রহগুলোর একটি। এর আগে নাসার মাত্র দুটি অভিযান বুধের কাছে পৌঁছেছে। ১৯৭৪ সালে মেরিনার-১০ প্রথম বুধের পাশ দিয়ে উড়ে যায়। পরে মেসেঞ্জার মহাকাশযান বুধের কক্ষপথে গিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা চালায়।

তারপরও গ্রহটি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। বুধের পৃষ্ঠে হাজার হাজার অদ্ভুত গর্ত রয়েছে, যেগুলোকে বিজ্ঞানীরা ‘হলো’ বলেন। এসব গর্ত কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। সৌরজগতের অন্য কোনো গ্রহে এমন গঠন এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

আরেকটি বড় রহস্য হলো বুধের ঘনত্ব। আকারে ছোট হওয়া সত্ত্বেও গ্রহটির ভেতরে তুলনামূলকভাবে অনেক ভারী পদার্থ রয়েছে। একটি ধারণা হলো, প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে বুধ তৈরির পর বড় কোনো মহাজাগতিক বস্তু এর সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল। সেই সংঘর্ষে গ্রহটির বাইরের অংশের বড় অংশ ছিটকে যায়। ফলে ভেতরের ভারী অংশ বেশি থেকে যায়।

বেপিকলম্বোর দুটি মহাকাশযান একসঙ্গে এসব রহস্যের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবে। এমপিও বুধের পৃষ্ঠ, পাহাড়, গর্ত, প্রাচীন আগ্নেয়গিরির চিহ্ন এবং ভেতরের গঠন পরীক্ষা করবে। অন্যদিকে মিও পর্যবেক্ষণ করবে বুধের চৌম্বকক্ষেত্র এবং গ্রহটির চারপাশের মহাকাশীয় পরিবেশ।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই অভিযান শুধু বুধ সম্পর্কেই নতুন তথ্য দেবে না। সূর্যের এত কাছে একটি পাথুরে গ্রহ কীভাবে তৈরি ও পরিবর্তিত হয়েছে, তা জানা গেলে পৃথিবীসহ সৌরজগতের অন্য পাথুরে গ্রহগুলোর জন্ম ও বিবর্তন সম্পর্কেও আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

আরও