সেপ্টেম্বরের রাতের আকাশে গ্রহ-চাঁদের মেলবন্ধন, উজ্জ্বল শুক্র থেকে হারভেস্ট মুন

এ মাসে কখনো চাঁদের পাশে দেখা যাবে মঙ্গল বা বৃহস্পতিকে, কখনো সন্ধ্যার আকাশে খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠবে শুক্র। মাসের শেষদিকে দেখা যাবে পূর্ণ ‘হারভেস্ট মুন’

রাতে আকাশের দিকে তাকানোর অভ্যাস যাদের আছে, তাদের জন্য সেপ্টেম্বর হতে পারে বেশ আনন্দের মাস। আবার যারা খুব একটা আকাশ দেখেন না, তারাও কয়েকটি বিশেষ দিনে একটু সময় বের করে বাইরে তাকাতে পারেন। কারণ এ মাসে কখনো চাঁদের পাশে দেখা যাবে মঙ্গল বা বৃহস্পতিকে, কখনো সন্ধ্যার আকাশে খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠবে শুক্র। মাসের শেষদিকে দেখা যাবে পূর্ণ ‘হারভেস্ট মুন’। এর পাশাপাশি অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি, ট্রায়াঙ্গুলাম গ্যালাক্সি, ভেইল নেবুলা, ডাবল ক্লাস্টার ও দুটি ধূমকেতুও জ্যোতির্বিদ্যা উৎসাহীদের জন্য তৈরি করবে বিশেষ আকর্ষণ।

সব ঘটনা দেখার জন্য দামি টেলিস্কোপও লাগবে না। বেশ কয়েকটি দৃশ্য খালি চোখেই দেখা সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে একটি সাধারণ দূরবীন থাকলে দৃশ্য আরো পরিষ্কার হবে। তবে শহরের আলো থেকে কিছুটা দূরে যেতে পারলে রাতের আকাশের সৌন্দর্য অনেক ভালোভাবে ধরা পড়ে।

৬ সেপ্টেম্বর: চাঁদের পাশে মঙ্গল

ভোরে ওঠার অভ্যাস থাকলে ৬ সেপ্টেম্বরের আকাশ হতে পারে আকর্ষণীয়। সূর্য ওঠার আগে সরু চাঁদের নিচের দিকে দেখা যাবে লালচে মঙ্গল গ্রহকে। মঙ্গলকে খালি চোখেই আলোর একটি লালচে বিন্দুর মতো দেখা যায়। চাঁদ ও মঙ্গল পাশাপাশি থাকায় সেদিন দুটিকে চেনাও সহজ হবে। যারা ছবি তুলতে চান, তারা চাঁদ ও মঙ্গলকে একই ফ্রেমে ধরার সুযোগ পাবেন।

৭ সেপ্টেম্বর: চাঁদের অন্ধকার অংশেও মৃদু আলো

৭ সেপ্টেম্বর ভোরে দেখা যেতে পারে চাঁদের একটি সুন্দর দৃশ্য। সেদিন চাঁদ থাকবে সরু বাঁকা ফালির মতো। তবে ভালো করে তাকালে চাঁদের যে অংশে সরাসরি সূর্যের আলো পড়ছে না, সেখানেও মৃদু আলো দেখা যেতে পারে।

এ আলো আসে পৃথিবী থেকে প্রতিফলিত সূর্যের আলো চাঁদের গায়ে পড়ার কারণে। ঘটনাটিকে ‘আর্থশাইন’ বলা হয়। বিখ্যাত শিল্পী ও বিজ্ঞানী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নাম অনুসারে একে কখনো ‘দা ভিঞ্চি গ্লো’ও বলা হয়।

৮ সেপ্টেম্বর: চাঁদ, বৃহস্পতি ও একঝাঁক তারা

৮ সেপ্টেম্বর ভোরের আকাশে একই এলাকায় দেখা যাবে তিনটি আকর্ষণীয় বস্তু—সরু চাঁদ, উজ্জ্বল বৃহস্পতি এবং বিহাইভ নামের একঝাঁক তারা। বৃহস্পতি খালি চোখে খুব উজ্জ্বল একটি তারার মতো দেখায়। আর বিহাইভ আসলে অনেকগুলো তারার একটি দল। সাধারণ দূরবীন থাকলে এ তারাগুলো আরো ভালোভাবে দেখা সম্ভব।

পৃথিবীর কিছু এলাকা থেকে সেদিন চাঁদ বৃহস্পতির সামনে দিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনাও দেখা যাবে। তবে কোন দেশ থেকে সেটি দেখা যাবে, তা নির্ভর করবে অবস্থানের ওপর।

৯ সেপ্টেম্বর থেকে: ভোরের আগে রহস্যময় আলোর রেখা

শহরের বাইরে খুব অন্ধকার কোনো জায়গায় থাকলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সূর্য ওঠার আগে পূর্ব আকাশে একটি মৃদু আলোর ত্রিভুজ দেখা যেতে পারে। এটি সূর্য ওঠার আলো নয়। মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা ধুলোর কণার ওপর সূর্যের আলো পড়ে এ দৃশ্য তৈরি হয়। এর নাম ‘জোডিয়াকাল লাইট’। তবে ঢাকা বা অন্য বড় শহরের মতো বেশি আলোকদূষণের জায়গা থেকে এটি দেখা কঠিন হতে পারে। খুব অন্ধকার আকাশ প্রয়োজন।

১২ সেপ্টেম্বর: চাঁদের কাছে বুধ

১২ সেপ্টেম্বর সূর্য ডোবার পর পশ্চিম আকাশে চাঁদের সঙ্গে বুধ গ্রহকে দেখা যেতে পারে। বুধ সাধারণত আকাশে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। কারণ এটি সূর্যের কাছাকাছি থাকে এবং বেশিক্ষণ আকাশে দৃশ্যমান থাকে না। সেদিন সরু চাঁদ বুধকে খুঁজে পাওয়ার একটি সহজ নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।

তবে একটি বিষয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে। সূর্য পুরোপুরি অস্ত যাওয়ার আগে কখনোই দূরবীন বা টেলিস্কোপ দিয়ে বুধ খোঁজা উচিত নয়। ভুল করে সূর্যের দিকে তাকালে চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

১৪ সেপ্টেম্বর: চাঁদের পাশে উজ্জ্বল শুক্র

১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার আকাশে দেখা যাবে মাসের অন্যতম সুন্দর দৃশ্য। সরু চাঁদের খুব কাছে থাকবে অত্যন্ত উজ্জ্বল শুক্র গ্রহ। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চল থেকে এমনকি চাঁদকে শুক্রের সামনে দিয়ে যেতে দেখা যাবে। অন্য অনেক জায়গা থেকে চাঁদ ও শুক্রকে খুব কাছাকাছি দেখা যাবে।

সূর্য অস্ত যাওয়ার পর পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে তাকালে এ দৃশ্য দেখা যেতে পারে। শুক্র খুব উজ্জ্বল হওয়ায় তাকে আলাদা করে চিনতে সাধারণত সমস্যা হয় না।

১৭ সেপ্টেম্বর: চাঁদের পাশে লালচে অ্যান্টারেস

১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চাঁদের কাছে দেখা যাবে অ্যান্টারেস নামের একটি উজ্জ্বল লালচে তারা। অ্যান্টারেস বৃশ্চিক নক্ষত্রমণ্ডলের সবচেয়ে পরিচিত তারাগুলোর একটি। এর লালচে রংয়ের কারণে আকাশের অন্য অনেক তারার চেয়ে এটি সহজে আলাদা করা যায়। চাঁদের পাশে থাকায় সেদিন অ্যান্টারেস খুঁজে পাওয়াও সহজ হবে।

১৮ সেপ্টেম্বর: অর্ধেক চাঁদে পাহাড়-গর্ত দেখার সুযোগ

১৮ সেপ্টেম্বর চাঁদকে প্রায় অর্ধেক আলোকিত অবস্থায় দেখা যাবে। পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে বেশি সুন্দর মনে হলেও চাঁদের পাহাড় ও গর্ত দেখার জন্য অর্ধেক চাঁদ বরং ভালো। কারণ আলো ও অন্ধকারের সীমারেখায় সূর্যের আলো তির্যকভাবে পড়ে। ফলে চাঁদের পাহাড় ও বিশাল গর্তগুলোর ছায়া স্পষ্ট হয়। একটি ছোট টেলিস্কোপ থাকলে সেদিন চাঁদের পৃষ্ঠের অনেক বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার দেখা যেতে পারে।

১৯ সেপ্টেম্বর: সবচেয়ে উজ্জ্বল অবস্থার কাছাকাছি শুক্র

১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শুক্রকে বিশেষ উজ্জ্বল দেখাবে। আগের দিনই গ্রহটি তার সবচেয়ে উজ্জ্বল অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছাবে। সন্ধ্যার আকাশে সূর্য ও চাঁদের পর শুক্রই সাধারণত সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তুগুলোর একটি। ফলে পরিষ্কার আকাশ থাকলে খালি চোখেই সহজে দেখা যাবে।

২৩ সেপ্টেম্বর: দিন-রাত প্রায় সমান

২৩ সেপ্টেম্বর ঘটবে সেপ্টেম্বর ইকুইনক্স। এ সময় পৃথিবীতে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য প্রায় সমান হয়ে আসে। উত্তর গোলার্ধে এর মধ্য দিয়েই জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে শরৎকাল শুরু হয়। এ সময় সূর্য প্রায় ঠিক পূর্ব দিকে উদয় এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। ফলে নিজের এলাকার কোনো সোজা পূর্ব-পশ্চিমমুখী সড়কে দাঁড়ালেও সূর্যাস্তের অবস্থানে একটি বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

২৪ সেপ্টেম্বর: ভোরের আকাশে রাজত্ব করবে বৃহস্পতি

২৪ সেপ্টেম্বর সূর্য ওঠার আগে পূর্ব আকাশে খুব উজ্জ্বল একটি আলোর বিন্দু দেখা যাবে। সেটিই বৃহস্পতি। গ্রহটি এত উজ্জ্বল থাকবে যে শহরের আলো থাকলেও তাকে শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ। একটি সাধারণ দূরবীন ভালোভাবে স্থির করে দেখলে বৃহস্পতির পাশে তার চারটি বড় উপগ্রহও ছোট ছোট আলোর বিন্দুর মতো দেখা যেতে পারে।

২৬ সেপ্টেম্বর: পূর্ণ ‘হারভেস্ট মুন’

সেপ্টেম্বরের সবচেয়ে পরিচিত চাঁদের ঘটনা ঘটবে ২৬ সেপ্টেম্বর। সেদিন দেখা যাবে পূর্ণ ‘হারভেস্ট মুন’। শরৎকালের দিন-রাত সমান হওয়ার সময়ের সবচেয়ে কাছের পূর্ণিমাকে সাধারণভাবে হারভেস্ট মুন বলা হয়। অতীতে কৃষকরা শরৎকালে ফসল তোলার সময় সন্ধ্যার পর এ চাঁদের আলো কাজে লাগাতেন। সেখান থেকেই এর নাম ‘হারভেস্ট মুন’।

সেদিন সূর্যাস্তের সময় পূর্ব আকাশে চাঁদ উঠতে দেখা বিশেষ সুন্দর হতে পারে। দিগন্তের কাছাকাছি অবস্থায় চাঁদকে অনেক সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বড় মনে হয়। তবে চাঁদ আসলে হঠাৎ বড় হয়ে যায় না; এটি মানুষের চোখ ও মস্তিষ্কের তৈরি একটি দৃষ্টিভ্রম।

৩০ সেপ্টেম্বর: চাঁদের পাশে সাত বোন

মাসের শেষ রাতে চাঁদ পৌঁছে যাবে প্লেইয়াডিস তারাগুচ্ছের কাছে। বাংলায় অনেকে এটিকে কৃত্তিকা নামেও চেনেন। এটি আকাশের সবচেয়ে পরিচিত তারাগুচ্ছগুলোর একটি। খালি চোখে ছোট একটি জায়গায় কয়েকটি তারা একসঙ্গে জ্বলতে দেখা যায়। ভালো আকাশে ছয়-সাতটি উজ্জ্বল তারা সহজেই চোখে পড়ে বলে একে অনেক সংস্কৃতিতে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বা সাত বোন বলা হয়।

৩০ সেপ্টেম্বর চাঁদ বেশ উজ্জ্বল থাকবে। ফলে প্লেইয়াডিসের অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ তারাগুলো দেখা কিছুটা কঠিন হতে পারে। তারপরও চাঁদ ও তারাগুচ্ছকে পাশাপাশি দেখার সুযোগ থাকবে।

আকাশ দেখতে কী লাগবে

এসব দৃশ্য দেখার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। চাঁদ, শুক্র, বৃহস্পতি ও মঙ্গলের মতো উজ্জ্বল বস্তু খালি চোখেই দেখা যায়। আরো ক্ষীণ তারা বা তারাগুচ্ছ দেখতে একটি সাধারণ দূরবীন কাজে আসতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পরিষ্কার আকাশ এবং যতটা সম্ভব কম আলোযুক্ত জায়গা। শহরের উজ্জ্বল বাতি চোখকে অন্ধকারে অভ্যস্ত হতে দেয় না। তাই কিছুক্ষণ মোবাইল ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিন থেকেও দূরে থাকা ভালো। অন্ধকারে অন্তত ১৫ মিনিট থাকলে চোখ ধীরে ধীরে ক্ষীণ তারা দেখার উপযোগী হয়ে ওঠে।

আরও