ডিএনএ নকশা: ফটোগ্রাফ ৫১ ও এক অবমূল্যায়িত বিজ্ঞানীর নীরব অবদান

কালের ইতিহাসের মত বিজ্ঞানেরও ইতিহাস রয়েছে। আর সেই ইতিহাস শুধুই নিত্য নতুন আবিষ্কারের সফলতা বা ব্যর্থতায় ঘুড়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ের গল্প নয়; বরং এতে রয়েছে মানুষের গল্প, স্বপ্নের গল্প, আর কখনো কখনো নীরব অবিচারের গল্প। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন অনেক আবিষ্কার রয়েছে, যা মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে।

১৯৫৩ সালে ডিএনএ ডাবল হেলিক্সের আবিষ্কার নিঃসন্দেহে তেমনই এক যুগান্তকারী ঘটনা, যা আধুনিক জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জেনেটিক্সের ভিত্তি স্থাপন করেছে। আমরা জানি এ আবিষ্কার কীভাবে জীবনের মৌলিক কাঠামোকে উন্মোচন করেছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এবং আণবিক প্রাণবিজ্ঞানের গবেষণার স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ মহান আবিষ্কারের গল্পটি যতটা গৌরবের, ততটাই অসম্পূর্ণ। কেননা এর নেপথ্যে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীর অবদান দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থেকেছে।

১৯৫০-এর দশকের লন্ডন। ডিএনএ'র গঠন নির্ণয়ের জন্য তখন যে প্রতিযোগিতা চলছিল, সেখানে একদিকে ছিলেন জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক, আর অন্যদিকে রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ও মরিস উইলকিন্স। কিংস কলেজের একটি ল্যাবরেটরিতে দিনের পর দিন নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছেন এক তরুণী বিজ্ঞানী। তার চারপাশে যন্ত্রপাতি, এক্স-রে বিম, আর জটিল গাণিতিক বিশ্লেষণ। ফ্র্যাঙ্কলিন তার কাজে ছিলেন নিখুঁততা-প্রিয়। অনুমানের ওপর নির্ভর না করে তিনি প্রমাণ চাইতেন, নির্ভুলতা চাইতেন। সেই নির্ভুলতারই ফল ছিল এক টুকরো ছবি যা জীববিজ্ঞানের ইতিহাসের মোড় ঘুড়িয়ে দিল।

১৯৫২ সালে ফ্র্যাঙ্কলিনের তত্ত্বাবধানে গবেষণারত শিক্ষার্থী রেমন্ড গস্লিং ডিএনএ'র আণবিক গঠনের রহস্য উন্মোচনের জন্য এক্সরে বিকিরণের পরীক্ষণ শুরু করেন। সে নিমিত্তে অসংখ্য ছবি তোলা হয়। এরকম একটি ছবি হল 'ফটোগ্রাফ ৫১'। এক্সরে বিকিরণের ফলে ডিএনএ একটি কেন্দ্রীয় 'X' আকৃতি দেখায় যা ডিএনএ'র সর্পিল গঠনের নির্দেশনা দেয়। তারা ছবির ক্রমিক নম্বর দিয়েছিলেন, যা তখন কেবল ছিল শুধুই গবেষণার উপাত্ত, আর পরবর্তীতে সেটিই হয়ে উঠেছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। সেই ছবিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ডিএনএ-এর সর্পিল গঠন; ডাবল হেলিক্সের নীরব ইঙ্গিত।

কিন্তু গল্পটি সেখানেই থেমে থাকে না। ফ্র্যাঙ্কলিনের এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি বিশেষ করে বিখ্যাত 'ফটোগ্রাফ ৫১' ছবি ও তার বিশ্লেষণই মূলত ডিএনএ-এর কাঠামো বোঝার ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ তথ্য ফ্র্যাঙ্কলিনের অনুমতি ছাড়াই ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে পৌঁছে যায় এবং তারা সেটি ব্যবহার করে তাদের মডেল প্রকাশ করে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তাদের বিখ্যাত ডিএনএ-দ্বিসূত্রক মডেল তৈরি করেন এবং ১৯৫৩ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকীর এপ্রিল সংখ্যায় ২৫ তারিখে 'Molecular Structure of Nucleic Acids: A Structure for Deoxyribose Nucleic Acid' শিরোনামে প্রকাশ করেন। ইতিহাস তাদের নাম মনে রাখে। ১৯৬২ সালে তারা নোবেল পুরস্কার পান। সঙ্গে মরিস উইলকিন্স ও নোবেল জেতেন। অথচ সেই পুরস্কারের তালিকায় ফ্র্যাঙ্কলিনের নাম ছিল না। প্রাথমিক উদ্ভাবক হয়েও তিনি থেকে যান নীরব এক ছায়া হয়ে। তার অবদান স্বীকৃতি পায় না, তার নাম উচ্চারিত হয় না সেই মঞ্চে, যেখানে তার থাকা উচিত ছিল।

ফ্র্যাঙ্কলিন ছিলেন না কোনো পার্শ্বচরিত্র; তিনি ছিলেন সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তার কাজ ছাড়া ডিএনএ'র গঠন এত দ্রুত উদঘাটন সম্ভব হতো না। তবু তিনি ছিলেন একজন নারী বিজ্ঞানী, এমন এক সময়ে যখন বিজ্ঞান জগৎ ছিল প্রায় সম্পূর্ণ পুরুষশাসিত। তার দৃঢ়তা, নির্ভুলতা, আর মেধা সবকিছুই যেন সময়ের সামাজিক কাঠামোর কাছে পরাজিত হয়েছিল। অনেকে ড. মরিসের তত্ত্বাবধানে কাজের সময় তাদের শীতল সম্পর্ককে দায়ী করেন। কারণ যাই হোক না কেন তার অবদানকে প্রাথমিক ভাবে অস্বীকার করে বিজ্ঞানের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নামান্তর।

সময় অবশ্য কিছুটা ন্যায়বিচার করেছে। আজ আমরা রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের নাম জানি। তার অবদান স্বীকৃতি পেয়েছে, তার নামে গবেষণা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, বই লেখা হয়েছে। বিখ্যাত রয়েল সোসাইটি রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের নামে অ্যাওয়ার্ড ও লেকচার চালু করেছে। Ovarian Cancer Research Alliance (OCRA) প্রতি বছর প্রথম সারির ক্যান্সার গবেষকদের রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন পুরষ্কারে ভূষিত করে। এ স্বীকৃতি এসেছে তার মৃত্যুর পরে, যখন তিনি আর তা অনুভব করতে পারেননি। এটি কি সত্যিকারের ন্যায়বিচার, নাকি কেবল ইতিহাসের একটি দেরিতে লেখা সংশোধনী?

এ গল্পের শেষ এখানেই নয়। কারণ ফ্র্যাঙ্কলিন কেবল অতীতের একটি চরিত্র নন; তিনি একটি প্রতীক; অবহেলিত প্রতিভার, নীরব অবদানের, এবং অদেখা সংগ্রামের প্রতীক। একালেও বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ে অনেকের অবদান কে অগ্রাহ্য করা হয়, অস্বীকার করা হয় কিংবা সফলতা সিন্ডিকেট আবৃত করা হয়। তাই ফ্র্যাঙ্কলিনের গল্প আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। ডিএনএ'র গঠন আবিষ্কারের গল্প তাই শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি এক নীরব বিজ্ঞানীর অসমাপ্ত স্বীকৃতির গল্প। আর সেই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আলোয় যে নামগুলো দেখা যায়, তার বাইরেও থাকে অনেক অদেখা আলো, যা নিঃশব্দে ইতিহাসকে বদলে দেয়।

মো. মেহেদী হাসান সোহাগ: সহকারী অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও