দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় ও স্বল্প সুবিধাপ্রাপ্ত নারীদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে ও নারীদের ক্ষমতায়নে ২০১৭ সালে তথ্যআপা প্রকল্প চালু করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় মহিলা সংস্থা।
তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে গৃহীত পাঁচ বছর মেয়াদী এ প্রকল্প দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জাতীয় মহিলা পরিষদের চেয়ারম্যান চেমন আরা তৈয়ব বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের পিছিয়ে পড়া নারীদের দেশের সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে তথ্যআপা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রায় এক কোটি নারীকে এ প্রকল্পের মাধ্যমে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এতে আমাদের পিছিয়ে পড়া নারীরা সমাজের সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠছেন। আমাদের প্রকল্পের সেবা নিয়ে তারা সাবলম্বী হচ্ছেন, সচেতন ও সজাগ হচ্ছেন।
চেমন আরা তৈয়ব আরো বলেন, গ্রামীণ পর্যায়ে নারীরা নানা গুণে গুণান্বিত। তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাচ্ছে আমাদের এ প্রকল্প। অনেকেই বাড়িতে বসে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন কিন্তু সেগুলো বিক্রি অথবা সঠিক জায়গায় পৌছানো সম্ভব হতো না। এখন প্রান্তিক নারীরা সেসব পণ্য ই-কমার্স মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে আমি মনে করি গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে।
২০১৭ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রকল্পটি প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি উপজেলায় সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের ৪৯০টি উপজেলায় তৃণমূল নারীদের কাছে তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি তথ্যআপা: ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়) গ্রহণ করা হয়। সম্প্রতি প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্প এলাকায় ২টি উপজেলায় বাড়ায় প্রকল্পটি ৪৯২টি উপজেলায় সম্প্রসারিত করা হয় এবং এর মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়।
প্রকল্পটির মাধ্যমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় তথ্যকেন্দ্র স্থাপন, নারীদের তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, ই-লার্নিং সেবার মাধ্যমে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন দল গঠন, ই-কমার্সে সহায়তা দানসহ বেশকিছু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সুবিধাবঞ্চিত নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এরই মধ্যে দেশের ৪৯২টি উপজেলায় তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব তথ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র, অসহায় নারীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনি সহায়তা, কৃষি, ব্যবসা ও জেন্ডার বিষয়ে বিনামূল্যে প্রযুক্তিভিত্তিক তথ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পের লক্ষ্যভুক্ত প্রায় এক কোটি নারীর দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ই-মেইল, স্কাইপের মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সিং, চাকরির খবর, উপজেলায় অবস্থিত বিভিন্ন সরকারি সেবা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিসংক্রান্ত তথ্য, ভর্তি ফরম পূরণ ও চাকরির আবেদনপত্র পূরণের সেবা দেয়া হচ্ছে।
পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্যসেবা যাতে নির্বিঘ্নে পরিচালিত হয়, সে পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। এজন্য তথ্যকেন্দ্র থেকেই নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। তথ্যকেন্দ্রে যেতে না পারা নারীরা যাতে সেবাবঞ্চিত না হয় সেদিক লক্ষ্য রেখে ডোর টু ডোর সেবা দান কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এর মধ্যমে সেবাগ্রহীতার বাড়িতে তথ্যসেবা কর্মকর্তা ও সহকারীরা উপস্থিত হয়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করছেন। এছাড়া নারী নির্যাতন, বাল্য বিবাহ, আইনগত সহায়তাসহ নানা ধরণের সমস্যা সমাধানে উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীদের সমস্যা সমাধানসহ তথ্যসেবাও দান করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ৯৪ লাখ ৯৬ হাজার ১২৩ নারী এই সুবিধার আওতায় এসেছেন।
উপপ্রকল্প পরিচালক (ট্রেনিং ও মনিটরিং) মো. লোকমান হোসেন প্রকল্পের কার্যক্রম প্রসঙ্গে বলেন, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের ডিজিটাল সাপোর্ট দেয়া। সরকার ডিজিটাল প্রযুক্তিকে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। তবে নারীরা সেদিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন। এ প্রকল্পের মাধ্যমে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে যেসব নারী আছেন, তারাও যেন ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফলটা ভোগ করতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যেমন নভেল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিবন্ধন প্রক্রিয়া ম্যানুয়াল ছিলো না। সেক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সে সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে অনেকেই অবগত না। সে ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা তৃণমূল পর্যায়ে ই-কমার্স উদ্যোগটাকে নিয়ে গিয়েছি। লালসবুজ নামের একটি মার্কেট প্লেস তৈরি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য একেবারে গ্রাম পর্যায়ের নারীদের তৈরি বিভিন্ন পণ্য যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগীদের ছাড়াই সরাসরি বিক্রি করা যায়। সেক্ষেত্রে এ প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে, যাতে করে তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হয়।