চাঁদ ঘুরে আসার বিস্ময় এখনো কাটেনি—এমন অবস্থাতেই গতকাল শত শত মানুষের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা পান আর্তেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা। গভীর মহাকাশ ভ্রমণে নতুন রেকর্ড গড়া এ অভিযানে অংশ নেয়া চার সদস্যের দলকে ঘিরে ছিল উচ্ছ্বাস ও গর্বের আবহ। খবর এপি।
নাসার জনসন স্পেস সেন্টার ও মিশন কন্ট্রোলের কাছাকাছি এলিংটন ফিল্ডে অবতরণ করেন এ নভোচারীরা। এর আগে তারা সান ডিয়েগো থেকে উড়ে আসেন, সেখানে আগের সন্ধ্যায় সমুদ্রের কাছাকাছি সফলভাবে অবতরণ করেছিলেন।
আবেগাপ্লুত উইজম্যান বলেন, এটা মোটেও সহজ ছিল না। উৎক্ষেপণের আগে মনে হয়, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। কিন্তু যখন আপনি সেখানে থাকেন, তখন শুধু পরিবার আর বন্ধুদের কাছে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে। মানুষ হওয়া একটা বিশেষ ব্যাপার, আর পৃথিবীতে থাকা আরো বিশেষ
সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার পর কমান্ডার রিড উইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ ও কানাডার জেরেমি হ্যানসেন মঞ্চে ওঠেন। তাদের চারপাশে ছিলেন স্পেস সেন্টারের কর্মী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান তাদের পরিচয় করিয়ে দেন, যিনি উদ্ধার জাহাজে প্রথম তাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন।
‘ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়রা, আপনাদের সামনে আর্তেমিস ২-এর ক্রু’—আইজ্যাকম্যানের এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় উপস্থিত জনতা।
উচ্ছ্বসিত ভিড়ের মধ্যে ছিলেন ফ্লাইট ডিরেক্টর, লঞ্চ ডিরেক্টর, ওরিয়ন ক্যাপসুল ও অনুসন্ধান ব্যবস্থার ম্যানেজার, উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, কংগ্রেস সদস্য, নাসার বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত নভোচারীরা।
প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তটি ছিল আবেগঘনও। কারণ তারা হিউস্টনে ফিরেছেন অ্যাপোলো ১৩ উৎক্ষেপণের ৫৬তম বার্ষিকীতে—যে মিশনের ‘হিউস্টন, উই হ্যাভ আ প্রবলেম’ উক্তি এক ভয়াবহ পরিস্থিতিকে পরবর্তীতে সাফল্যে রূপ দিয়েছিল।
আবেগাপ্লুত উইজম্যান বলেন, ‘এটা মোটেও সহজ ছিল না। উৎক্ষেপণের আগে মনে হয়, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। কিন্তু যখন আপনি সেখানে থাকেন, তখন শুধু পরিবার আর বন্ধুদের কাছে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে। মানুষ হওয়া একটা বিশেষ ব্যাপার, আর পৃথিবীতে থাকা আরো বিশেষ।’
গ্লোভার বলেন, ‘আমরা যা করেছি, সেটা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। আর সেই চেষ্টা শুরু করতেও ভয় লাগছে।’
হ্যানসেন জানান, তারা চারজন ভালোবাসা ও আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, ‘আপনারা এখানে আমাদের দেখছেন না, আপনারাই প্রতিফলিত হচ্ছেন আমাদের মধ্যে। যদি এই দৃশ্য আপনাদের ভালো লাগে, তাহলে একটু গভীরে তাকান—এটা আসলে আপনাদেরই প্রতিচ্ছবি।’
প্রায় ১০ দিনের এই মিশনে নভোচারীরা অতীতের যেকোনো চন্দ্রাভিযানের তুলনায় আরো দূর মহাকাশে গিয়েছেন। তারা চাঁদের এমন এক পাশের দৃশ্য ধারণ করেছেন, যা আগে কোনো মানুষ দেখেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ—যা এই মহাজাগতিক অভিজ্ঞতাকে আরো অসাধারণ করে তোলে।
এ অভিযানে তারা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল (৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার) দূরে পৌঁছান এবং চাঁদের পেছন দিয়ে ঘুরে আসেন, যা অ্যাপোলো ১৩-এর দূরত্বের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়।
মিশনে পৃথিবীর এক নতুন দিকও দেখা যায়—‘আর্থসেট’ নামে একটি ছবি, যেখানে ধূসর, গর্তভরা চাঁদের পেছনে অস্ত যেতে দেখা যায় নীল পৃথিবীকে। এটি ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো ৮ মিশনের বিখ্যাত ‘আর্থরাইজ’ ছবির প্রতিধ্বনি।
আইকনিক ‘আর্থসেট’। ছবি: নাসা
কচ বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমাকে শুধু পৃথিবী নয়, তার চারপাশের অন্ধকারটাই বেশি নাড়া দিয়েছে। সেই বিশাল শূন্যতার মধ্যে পৃথিবী যেন শান্তভাবে ভেসে থাকা একটি লাইফবোট। পৃথিবী—তুমি নিজেই ক্রু।’
তবে সব সাফল্যের মাঝেও একটি সাধারণ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। মহাকাশযানের টয়লেটের ত্রুটি। নাসা জানিয়েছে, ভবিষ্যতের দীর্ঘ মিশনের আগে এই নকশাগত সমস্যা সমাধান করা হবে।
উইজম্যান, গ্লোভার, কচ ও হ্যানসেন—১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের দিকে উড়াল দেন। অ্যাপোলো যুগে মোট ২৪ জন নভোচারী চাঁদে গিয়েছিলেন, যার মধ্যে ১২ জন চাঁদের মাটিতে হেঁটেছিলেন।
অ্যাপোলো ১৩-এর কমান্ডার জিম লাভেল, যিনি অ্যাপোলো ৮ মিশনেও ছিলেন—গত গ্রীষ্মে মৃত্যুর আগে রেকর্ড করা একটি বার্তায় এ দলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন তিনি।
নাসার জন্য এই মিশনের সফলতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে তারা আগামী বছরের আর্তেমিস ৩ মিশনের প্রস্তুতি শুরু করেছে, যেখানে নতুন ক্রু পৃথিবীর কক্ষপথে একটি চন্দ্র ল্যান্ডারের সঙ্গে ডকিং অনুশীলন করবে। এরপর ২০২৮ সালে আর্তেমিস ৪ মিশনে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, ‘দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। ৫৩ বছরের সংক্ষিপ্ত বিরতির পর আবার শুরু হলো এই যাত্রা।’