তখনো পৃথিবীতে প্রাণের দেখা মেলেনি। বলা হচ্ছে বিলিয়ন বছর আগের কথা। আমাদের সূর্যের চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছিল এক জলজ, লবণাক্ত গ্রহাণু—যার গায়ে ছিল প্রাচীন সৌরজগতের অস্তিত্ব বহনকারী খনিজ ও রাসায়নিকের খনি। কোটি কোটি বছর আগে সেই মহাজাগতিক বস্তুটি এক বিধ্বংসী সংঘর্ষে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মহাকাশে। এই ধ্বংসাবশেষেরই এক টুকরো, যে গ্রহাণুর নাম ‘বেন্নু’, আজ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে জীবনের উৎস নিয়ে এক চমক জাগানো ইঙ্গিত।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পাঠানো রোবটিক স্পেসপ্রোব অসিরিস-রেক্স সম্প্রতি পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছে বেন্নুর গা থেকে সংগৃহীত প্রায় ১২০ গ্রাম ধূলিকণা ও খনিজের নমুনা। আর তাতে বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন এমন সব যৌগ ও অণু, যেগুলো প্রাণের বিকাশের জন্য একান্ত অপরিহার্য।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মহাজাগতিক খনিজবিজ্ঞানী প্রফেসর সারা রাসেল বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘বেন্নু থেকে সংগৃহীত নমুনায় এমন কিছু ছিল যা আমাদের পুরোপুরি অভিভূত করেছে। সংরক্ষিত অণু ও খনিজের বৈচিত্র্য এতটাই ব্যতিক্রম যে আগে অন্য কোনো মহাজাগতিক নমুনায় এ ধরনের কিছু দেখা যায়নি।‘
বেন্নুতে পাওয়া এই খনিজ পদার্থগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যামোনিয়া, ফসফেট, ১২টিরও বেশি অ্যামিনো অ্যাসিড এবং আরএনএ ও ডিএনএর গঠনকারী পাঁচটি নিউক্লিওবেস। এই সমস্ত উপাদান পৃথিবীতে পাওয়া যায় জীবন্ত প্রাণের মধ্যে, আর এদের সম্মিলনই নির্দেশ করে যে, পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে কোনো এক মহাজাগতিক গ্রহাণুর আগমন।
রাসেল আরো বলেন, ‘বেন্নুর আদি গ্রহাণুতে নিশ্চিতভাবেই ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত জলাধার ছিল, আর সেগুলো শুকিয়ে যাওয়ার পর সেখানে যে লবণের স্তর জমেছে, তা অনেকটা পৃথিবীর শুকনো হ্রদের অঞ্চলে পাওয়া লবণের মতো। এইরকম পরিস্থিতি প্রাণের রাসায়নিক বীজ গঠনের জন্য এক নিখুঁত জৈব পটভূমি তৈরি করে।'
তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন না যে, বেন্নুতে কোনোদিন প্রাণের বিকাশ ঘটেছিল। বরং তাদের ধারণা, এমন গ্রহাণুগুলোর মাধ্যমেই পৃথিবীর মতো গ্রহে পৌঁছে গিয়েছিল সেই প্রথম জৈব উপাদান, যেখান থেকে প্রাণের সূত্রপাত ঘটে। উষ্ণ, স্থিতিশীল এবং অনুকূল পরিবেশে পৃথিবী সেই উপাদানগুলোকে কাজে লাগিয়ে জন্ম দিয়েছিল প্রথম এককোষী প্রাণীর, প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন বছর আগে।
এই গবেষণার অংশ হিসেবে অসিরিস-রেক্স যে নমুনা এনেছে, তার ২০০ মিলিগ্রাম বিশ্লেষণের জন্য পেয়েছে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম। রাসেল বলেন, ‘যখন আমরা প্রথম ক্যাপসুলটি খুললাম, তখন দেখতে পেলাম সব জায়গায় কালো ধুলো ছড়িয়ে আছে, সঙ্গে সাদা সাদা কণাও। প্রথমে আমরা ভাবলাম এগুলো হয়তো দূষিত। কিন্তু পরে দেখা গেল, এই সাদা অংশটি ফসফরাসের এমন এক যৌগ যা আমরা এর আগে কোনো উল্কাপিণ্ডে দেখিনি। অথচ এটি প্রাণ গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।‘
এই আবিষ্কার শুধু অতীতের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টাই নয়, বরং ভবিষ্যতের দিগন্তও প্রসারিত করে দিয়েছে। বৃহস্পতির ইউরোপা, গ্যানিমিড এবং শনি গ্রহের টাইটান ও এনসেলাডাসের মতো সৌরজগতের অন্য কিছু উপগ্রহ তাদের বরফাচ্ছাদিত আবরণের নিচে লুকিয়ে রাখতে পারে তরল জলের সমুদ্র, যেখানে প্রাণের উপাদান বা এমনকি প্রাণের উপস্থিতিও থাকতে পারে। এই লক্ষ্যে বর্তমানে বেশ কয়েকটি মিশন কাজ করছে। যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপা ক্লিপার ও জুস মিশন।
এছাড়াও, যুক্তরাজ্যে নির্মিত রোসালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন রোভার ২০২৯ সালে মঙ্গলে অবতরণ করবে এবং মঙ্গলের মাটির গভীরে খনন করে জীবনের প্রমাণ খুঁজবে। এর আগে শুধুমাত্র উল্কাপিণ্ড, চাঁদের পাথর ও মঙ্গল থেকে ছিটকে আসা কিছু পাথরই ছিল গবেষণার প্রধান উৎস।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান