সেমিকন্ডাক্টর শিল্পসংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন একটি জোটে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ দিচ্ছে চীন। নিজেদের প্রযুক্তি, গাড়ি ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের জন্য স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছে বেইজিং। সম্প্রতি বিজনেস কোরিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও তাইওয়ানের জোটে যোগদান থেকে বিরত থাকতে দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপে রাখছে চীন। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে এশিয়ার বৃহত্তম বাজার থেকে নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হবে কিনা সে ব্যাপারে অনেক হিসাব কষতে হচ্ছে সিউলকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত মেমোরি চিপের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ দিচ্ছে চীন। এক বিশ্লেষক জানান, ২০২৫ সালের মধ্যে বিদেশী মেমোরি চিপের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় তারা। স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের মেমোরি চিপ উৎপাদন ছাড়া চীনের এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব নয়।
বর্তমানে নন-মেমরি সেগমেন্টে চীনা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিস্তার ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ, হুয়াওয়ের সাবসিডিয়ারি হাইসিলিকন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ ডিজাইনার প্রতিষ্ঠান। এছাড়া চীনের বৃহত্তম ফাউন্ড্রি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়েছে এসএমআইসি। তিন বছর আগে তারা ১৪ ন্যানোমিটারের প্রসেসর তৈরি করেছে। স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন প্রসেসরে তেমন সাফল্য না পেলেও প্রায় সব ধরনের চিপে সাফল্য দেখাচ্ছে সাংহাইভিত্তিক কোম্পানিটি।
মেমোরি চিপের ক্ষেত্রে বৈশ্বিকভাবে শীর্ষস্থান দক্ষিণ কোরিয়ার। বৈশ্বিক মেমোরি চিপ সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের। ডির্যাম বাজারে শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ইলেকট্রনিকস, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন টেকনোলজির সম্মিলিত বাজার হিস্যা ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
সেমিকন্ডাক্টরের অন্যান্য সেগমেন্টে সাফল্য দেখালেও ডির্যাম সেগমেন্টে দফায় দফায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে চীন। ২০১৭ সালে এ সেগমেন্টে প্রবেশ করেছিল চীনা কোম্পানি সিংহুয়া ইউনিগ্রুপ। কিন্তু বড় অংকের অর্থ ঢেলেও সফলতার মুখ দেখেনি তারা। গত বছর প্রায় দেউলিয়াত্বের মুখে এ সেগমেন্ট থেকে বিদায় নেয় সিংহুয়া ইউনিগ্রুপ। কয়েক বছরে মেমোরি চিপে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধিতে চীনে তাই স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেইজিংয়ের জন্য। এজন্য সিউলকে চাপে রাখছে বেইজিং। ওদিকে বৃহত্তম বাজার হওয়ায় সহজেই চীনের সঙ্গে বিচ্ছেদ ভালো সিদ্ধান্ত হবে না দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন চিপ ৪ জোটে অংশগ্রহণে বেশ চাপের মুখে সিউল।
যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের ক্রসফায়ারে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। তাইওয়ান ও জাপানকে নিয়ে নতুন সেমিকন্ডাক্টর জোট গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এতে টেনে নিতে অন্য মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। কিন্তু চীনের মতো বৃহৎ বাজারের সঙ্গে বৈরিতা যে আখেরে লোকসানি ঠেকতে পারে এ ভয়ে পিছুটান রয়েছে সিউলের। চিপ ৪ নামে অনানুষ্ঠানিক জোটে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া। কারণ দেশটির বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এখনো চীন।
গত মার্চে ফ্যাব ৪ নামেও পরিচিত এ জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আগস্টে গ্রুপটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, জোটে থাকা না থাকার বিষয়টি সিউল যেন আগস্ট শেষের আগেই কূটনৈতিক চ্যানেল মারফত জানিয়ে দেয়।
প্রস্তাবিত সেমিকন্ডাক্টর জোট নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইওন সুক-ইওলের এক মুখপাত্র সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এ ব্যাপারে এখন তেমন কিছু বলা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর খাতে সম্পর্ক জোরদারে বেশকিছু বিকল্প নিয়ে ভাবছে সিউল।
ঘনিষ্ঠ মিত্র ওয়াশিংটনের প্রস্তাব নিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ সিউলের। কিন্তু চীনের মতো বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারকে এক নিমিষে ফেলে দিতে পারে না তারা। ২০২১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট রফতানির ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল চীনে, যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। কোরীয় চিপ নির্মাতা জায়ান্ট স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের কারখানা রয়েছে চীনের সানজি ও জিয়াংশু প্রদেশে। অন্যদিকে চিপ জোটে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকভিত্তি হারাতে চাইছে না দক্ষিণ কোরিয়া।
দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকিয়ুনকিওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক কিওন সিওক-জুন সম্প্রতি দ্য কোরিয়া হেরাল্ডকে বলেন, চিপ ৪ জোটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে হয়তো জোটভুক্ত দেশগুলোর সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ চেইনে স্থিতিশীলতা আনা যাবে। কিন্তু এতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য ক্ষতিকর ঠেকবে।
গত ২০ মে গিয়নগি প্রদেশের পিয়নতায়েকে স্যামসাংয়ের কারখানা পরিদর্শনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও দ. কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইওন সুক-ইওল ছবি: বিজনেস কোরিয়া