বিগ ব্যাংয়ের পরের প্রাচীনতম নক্ষত্রের সন্ধানে বড় অগ্রগতি

বিজ্ঞানীরা হয়তো খুঁজে পেয়েছেন মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন প্রথম প্রজন্মের তারার প্রমাণ। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে মহাকাশের গভীরে এক উজ্জ্বল গ্যাসের স্তূপ ধরা পড়েছে, যা বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৪৫ কোটি বছর পরের। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি মহাবিশ্বের প্রথম প্রজন্মের তারার রাসায়নিক চিহ্ন বহন করছে। সম্প্রতি তিনটি গবেষণাপত্রে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা মহাবিশ্বের প্রাচীন ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে প্রথম প্রজন্মের তারার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল বিগ ব্যাং-এর প্রায় ১০০ কোটি বছর পরের। কিন্তু নতুন এ আবিষ্কার সেই সীমাকে অনেক পিছিয়ে নিয়ে গেছে।

মহাবিশ্বের প্রথম প্রজন্মের তারাগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘পপুলেশন থ্রি স্টার’। ধারণা করা হয়, এ তারাগুলো আকারে সূর্যের চেয়ে এক হাজার গুণ পর্যন্ত বড় এবং অত্যন্ত উজ্জ্বল। এগুলো তৈরি হয়েছিল শুধুমাত্র বিগ ব্যাং-এ সৃষ্ট মৌলিক উপাদান হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং সামান্য পরিমাণ লিথিয়াম দিয়ে। আমরা রাতের আকাশে যে তারাগুলো দেখি, সেগুলোতে আরো ভারী মৌল রয়েছে, যা আগের প্রজন্মের তারা থেকে আসা।

এখন যে নতুন গ্যাসের ঘন অংশটি শনাক্ত করা হয়েছে, সেটির নাম দেয়া হয়েছে গ্রিক দেবী নাম অনুসারে ‘হেবে’। এটি প্রথম দেখা যায় ২০২৪ সালে, তবে তখন এর প্রকৃতি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে ২০২৫ সালে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে আরো বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। সে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এ গ্যাসের অংশটিতে হিলিয়ামের চেয়ে ভারী কোনো মৌলের উপস্থিতি নেই। পাশাপাশি এখান থেকে এমন ধরনের আলো বের হচ্ছে, যা উচ্চশক্তির হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষণায় যুক্ত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী রবার্তো মাইওলিনো বলেছেন, ‘এটি প্রথম প্রজন্মের তারার একটি আদর্শ উদাহরণ। অন্য কোনো ব্যাখ্যা সত্যিই সন্তোষজনক নয়।’

হেবের আকার প্রায় ১,২০০ আলোকবর্ষ জুড়ে, এতে দুটি আলাদা তারার গুচ্ছ রয়েছে এবং এর মোট ভর সূর্যের ১০ হাজার থেকে কয়েক লাখ গুণ। তবে যেহেতু প্রথম প্রজন্মের তারাগুলো আকারে অনেক বড়, তাই এ গুচ্ছে মাত্র কয়েকশ তারা থাকতে পারে বলে অনুমান।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হেবে একটি বড় গ্যালাক্সির কাছাকাছি অবস্থান করছে, যার নাম জিএন-জে১১। এই গ্যালাক্সির ভর প্রায় এক বিলিয়ন সূর্যের সমান। আগে ধারণা করা হতো, এমন বড় ও উন্নত গ্যালাক্সির কাছাকাছি প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্র থাকার কথা নয়, কারণ এসব গ্যালাক্সি ইতোমধ্যে ভারী মৌল ছড়িয়ে পরিবেশকে পরিবর্তন করে ফেলেছে। কিন্তু হেবে-র অবস্থান এই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

তবে কিছু কম্পিউটার সিমুলেশন বলে, এ ধরনের ছায়াপথের কাছে প্রথম প্রজন্মের তারা থাকার কথা নয়। তবে অন্য কিছু সিমুলেশন মনে করে, এ ছায়াপথের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আশেপাশ থেকে বিশুদ্ধ গ্যাস টেনে এনে নতুন তারা তৈরির পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে আবাররো প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্র গঠিত হতে পারে। ফলে হেবে-র এই আবিষ্কার শুধু একটি নতুন নক্ষত্রের সম্ভাবনাই নয়, বরং মহাবিশ্বের প্রথম দিককার নক্ষত্র কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের আরো বস্তু খুঁজে পাওয়া গেলে মহাবিশ্বের জন্ম ও বিবর্তন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা মিলতে পারে।

আরও