পাঁচ দশক পর আবার মানুষ যাচ্ছে চাঁদের কক্ষপথে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই শুরু হবে এ যাত্রা। মিশনটির নাম ‘আর্টেমিস ২’। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কর্মসূচির এক নতুন অধ্যায়। খবর বিবিসি।
আর্টেমিস প্রকল্প কী?
আর্টেমিস হলো নাসার চাঁদে ফেরার প্রকল্প। এর লক্ষ্য কেবল মানুষকে আবার চাঁদে পাঠানো নয়, ভবিষ্যতে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি ঘাঁটি গড়ে তোলাও। এ প্রকল্পের প্রথম ধাপ ছিল ‘আর্টেমিস ১’, যা ২০২২ সালে সম্পন্ন হয়। এতে মানববিহীন ওরায়ন ক্যাপসুল চাঁদের চারপাশে ঘুরে ২৫ দিন পর নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এর মাধ্যমে রকেট ও ক্যাপসুলের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। দ্বিতীয় ধাপ 'আর্টেমিস ২' শুরু হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এতে চার নভোচারী চাঁদের কক্ষপথে গিয়ে প্রায় ১০ দিন অবস্থান করবেন। তারা অবতরণ করবেন না, তবে এ যাত্রায় পুরো সিস্টেম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানুষের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করা হবে। এর পরের ধাপ ‘আর্টেমিস ৩’–এর লক্ষ্য আরো বড়। পরিকল্পনা অনুযায়ী মিশনটিতে নভোচারীরা সরাসরি চাঁদে অবতরণ করবেন।
মিশনে কারা যাচ্ছেন?
মিশনে অংশ নেবেন নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডিয়ান মহাকাশ সংস্থা সিএসএ’র জেরেমি হ্যানসেন। তারা চাঁদের চারপাশে ঘুরে ১০ দিনে পৃথিবীতে ফিরবেন। তবে এবার তারা চাঁদে অবতরণ করবেন না। এটাই হবে চাঁদের নিম্ন কক্ষপথের বাইরে ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭–এর পর মানুষের প্রথম যাত্রা।
হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারে প্রদর্শিত ওরায়নের নমুনা মডেল। ছবি: নাসা
নভোচারীদের যেভাবে পাঠানো হবে
অভিযানে ব্যবহৃত হবে শক্তিশালী স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেট। এর ওপরে বসানো থাকবে নভোচারীদের থাকার জায়গা ক্যাপসুল ওরায়ন। রকেট প্রথমে ক্যাপসুলকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিয়ে যাবে। এরপর পৃথক হয়ে সেটিকে ঠেলে দেবে চাঁদের পথে। যাত্রাপথে নভোচারীরা অংশ নেবেন একটি বিশেষ পরীক্ষায়, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘স্পেস ব্যালে’। এতে তারা হাতে নিয়ন্ত্রণ করে ওরায়নকে অন্য একটি অংশের কাছাকাছি নিয়ে যাবেন এবং আবার দূরে সরিয়ে নেবেন। এভাবে মহাকাশে ডকিংয়ের অনুশীলন হবে। ভবিষ্যতে যখন চাঁদে অবতরণের জন্য আলাদা ল্যান্ডার ব্যবহার করা হবে, তখন এ দক্ষতা কাজে লাগবে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা
নভোচারীরা শুধু ভ্রমণ করবেন না, তারা হবেন গবেষণার অংশ। তাদের শরীরের ওপর মহাকাশের প্রভাব বুঝতে নেয়া হবে রক্তের নমুনা। এ থেকে তৈরি টিস্যু বা অর্গানয়েড মহাকাশ ভ্রমণের আগে ও পরে পরীক্ষা করা হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে মাইক্রোগ্রাভিটি ও বিকিরণের প্রভাব স্পষ্টভাবে জানা যাবে।
ক্রুদের আসনবিন্যাস। ছবি: নাসা
ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
আর্টেমিস ১ মিশনে ওরায়ন ক্যাপসুলের তাপঢাল (হিট শিল্ড) নিয়ে কিছু সমস্যা ধরা পড়েছিল। নাসা জানিয়েছে, এগুলো এখন ঠিক করা হয়েছে। তবে ঝুঁকি একেবারে শেষ হয়নি। নভোচারীরা পৃথিবীতে ফেরার সময় ক্যাপসুল বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে ঘণ্টায় কয়েক হাজার কিলোমিটার গতিতে। তখন ঘর্ষণে প্রচণ্ড তাপ ও চাপ তৈরি হবে। সেই তাপ থেকে ক্যাপসুলকে সুরক্ষিত রাখতেই দরকার তাপঢাল।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
পুরো মিশনের সাফল্য নির্ভর করছে আর্টেমিস ৩–এর ওপর। এ মিশনে নভোচারীদের চাঁদে নামানোর জন্য ব্যবহার করা হবে স্পেসএক্সের স্টারশিপ যান। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৭ সালের আগে অবতরণ সম্ভব নয়। কারণ স্টারশিপ এখনো কক্ষপথে মানুষ বহন উপযোগী করে প্রস্তুত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাসার এ উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের নতুন অনুপ্রেরণা। ৫০ বছর পর মানুষ আবার চাঁদের পথে। এ যাত্রা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্র ঘাঁটি গড়ার স্বপ্নকে এক ধাপ এগিয়ে নেবে।