নাসা এবং স্পেসএক্সের ক্রু-১০ মিশনের অংশ হিসেবে নভোচারী বুচ উইলমোর এবং সুনি উইলিয়ামসকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মাত্র আট দিনের জন্য মহাকাশে যাওয়া এই দুই নভোচারীর মিশন শেষ পর্যন্ত নয় মাসে গিয়ে ঠেকেছে।
কোনো নভোচারীর মহাকাশে কাটানো দীর্ঘতম সময় এটি নয়। রুশ মহাকাশচারী ভ্যালেরি পলিয়াকভ মির মহাকাশ স্টেশনে টানা ৪৩৭ দিন ছিলেন। তবে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ মিশন ছয় মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও দীর্ঘ সময় এর অনুপস্থিতি শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাহলে দেখে নেয়া যাক, দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার পর পৃথিবীতে ফিরে এলে একজন মানুষের শরীর ও মনে কী প্রভাব পড়ে।
মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব
মহাকাশে দীর্ঘ সময় থাকলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অনুপস্থিতিতে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় এবং পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি হৃদযন্ত্রও। এছাড়া, শরীরের রক্তপ্রবাহের ধরন বদলে যায় এবং কিছু জায়গায় ধীর হয়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি করে। সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যালান ডাফি বলেন, মহাকাশে তরল পদার্থ মাথায় জমা হতে থাকে, যার ফলে নভোচারীরা দীর্ঘদিন ধরে ঠাণ্ডা লেগে থাকার মতো অনুভব করেন।
মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার পর নভোচারীদের চলাফেরায় সমস্যা হয়, মাথা ঘোরে, এমনকি তাদের দৃষ্টিশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চোখের গঠনের পরিবর্তন ও তরল জমার কারণে অনেক নভোচারী মহাকাশে থাকাকালীন চশমা পরতে বাধ্য হন। মহাকাশ যাত্রার আগে হয়তো তাদের দৃষ্টিশক্তি একেবারেই স্বাভাবিক ছিল।
নাসা ও স্পেসএক্স এই সমস্যার সমাধানে বিশেষ কৌশল নিয়ে কাজ করছে। এক গবেষক বলেন, নভোচারীদের ঘুমানোর জন্য ঘূর্ণায়মান কক্ষ তৈরি করা হতে পারে, যা তরলকে মাথা থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে সরিয়ে দেবে।
মহাকাশের বিকিরণ
সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রভাবগুলোর মধ্যে একটি হলো মহাকাশের বিকিরণের সংস্পর্শে আসা, যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র আমাদের এ ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা করে, কিন্তু মহাকাশে নভোচারীরা এর কোনো সুরক্ষা পান না।
নাসার মতে, নভোচারীরা তিন ধরনের বিকিরণের মুখোমুখি হন— পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে আটকে থাকা কণাসমূহ, সূর্য থেকে আসা শক্তিশালী বিকিরণ এবং ছায়াপথ থেকে আসা কসমিক বা মহাজাগতিক রশ্মি। বিজ্ঞানীরা এখন মহাকাশ অভিযানের সময় নভোচারীদের এই বিকিরণ থেকে রক্ষার উপায় খুঁজছেন, বিশেষ করে চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের ক্ষেত্রে।
ওভারভিউ ইফেক্ট
এক-দুই দিন ভুল এয়ারপোর্টে আটকে থাকার কষ্ট যারা অনুভব করেছেন, তারা কল্পনা করুন—আপনি পুরো সময় নিজের বাড়ি দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু ফিরতে পারছেন না। এখন ভাবুন, এই অভিজ্ঞতা যদি উইলমোর এবং উইলিয়ামসের মতো টানা নয় মাস ধরে চলতে থাকে! তাই এতদিন মহাকাশের চরম পরিবেশে থাকার পর পৃথিবীতে ফিরে আসা মানসিকভাবে সহজ নয়। গবেষকদের মতে, অনেক নভোচারী দুশ্চিন্তা ও হতাশায় ভুগতে থাকেন।
নভোচারীরা পৃথিবীতে ফিরে এলে তারা ‘ওভারভিউ ইফেক্ট’ নামের এক বিশেষ অনুভূতির সম্মুখীন হতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডাফি বলেন, মহাকাশ থেকে পৃথিবীর বাঁকানো আকৃতি দেখা, একে একটি বিশাল মহাকাশযানের মতো মনে হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক নভোচারীর মনে গভীর পরিবর্তন আনে। তারা মানবজাতির প্রতি এক অবিশ্বাস্য সংযোগ অনুভব করেন এবং চলে আসে এক তুচ্ছতার বোধ— পৃথিবী কত বিশাল আর আমরা কত ক্ষুদ্র!
কিন্তু শেষ পর্যন্ত, তাদের পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়—শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও। তাদের আবার প্রতিদিনের সাধারণ জীবনে ফিরতে হয়—নাশতা বানানো, অফিসে যাওয়া। তবে অলক্ষ্যেই হয়তো ঘটে যায় এক বিশাল পরিবর্তন, কারণ এতদিন তারা ছিলেন এক অভূতপূর্ব পরিবেশে। যা জাগতিক অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে, যা মহাজাগতিক।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান