বাংলাদেশের রেডি-মিক্স কংক্রিট: সংকট, চ্যালেঞ্জ ও টেকসই ভবিষ্যতের সন্ধানে

মো. মোস্তাক আহমেদ, এফসিএ
প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও), বিল্ডিং সলিউশনস, আকিজ রিসোর্স

ঢাকার শিল্পাঞ্চলে কর্মদিবসের ব্যস্ত দুপুরে কোনো ব্যাচিং প্ল্যান্টের সামনে খালিহাতে দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রটি আসলে বাংলাদেশের রেডি-মিক্স কংক্রিট (আরএমসি) শিল্পের বর্তমান বাস্তবতারই একটি ছোট প্রতিচ্ছবি।

একসময় যে অর্ডার বুক সামলাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে হিমশিম খেতে হতো, তা এখন অনেকটাই ফাঁকা; আর যে মুনাফার মার্জিন একটি খারাপ মাসের ধাক্কা অনায়াসে সামলে নিতে পারত, সেটিও এখন আর আগের মতো সক্ষম নয়। দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ধারায় গড়ে ওঠা এই শিল্প আজ একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি, বর্তমান কাঠামো ও ব্যবসায়িক বাস্তবতায় এই খাত আদৌ কতটা টেকসই?

এর উত্তর সহজ নয়, হওয়ার কথাও নয়। বাংলাদেশে রেডি-মিক্স কংক্রিট এখনো তুলনামূলকভাবে তরুণ একটি শিল্প; এর বাণিজ্যিক যাত্রা মোটামুটি ১৯৯০ সালের দিকে শুরু। তবে শিল্পটির ভিত্তি যে দুর্বল, তা বলা যাবে না। দ্রুত নগরায়ণ, উচ্চাভিলাষী জাতীয় অবকাঠামো কর্মসূচি এবং শ্রমনির্ভর সাইট-মিক্সিং পদ্ধতি থেকে সরে এসে মানসম্মত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ রেডি-মিক্স কংক্রিট ব্যবহারের প্রবণতা, সব মিলিয়ে এই খাত নির্মাণকাজে গতি, মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যানও সম্ভাবনার একই ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী রেডি-মিক্স কংক্রিটের বাজারের আকার ছিল প্রায় ১.০৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৩ সাল নাগাদ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১.৯৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে; বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের বেশি। এই চাহিদার ৭০ শতাংশেরও বেশি আসছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে, আর বাংলাদেশ অবস্থান করছে সেই দ্রুত বর্ধনশীল নির্মাণ অঞ্চলের মধ্যেই। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে মৌলিক কোনো সংশয় নেই।

অভ্যন্তরীণ বাজারের চিত্র

দেশের বাজারে শিল্পটি আকারে যথেষ্ট বড় হলেও এখনো তুলনামূলকভাবে তরুণ এবং খণ্ডবিখণ্ড। শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে রেডি-মিক্স কংক্রিটের বাজার প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট অর্থাৎ প্রায় ৪০ লাখ ঘনমিটার এবং এটি প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে বাড়ছে। অথচ দেশে মোট কংক্রিটের চাহিদা বছরে ৫ কোটি ঘনমিটারেরও বেশি। এই ব্যবধানই সম্ভাবনার ব্যাপ্তি স্পষ্ট করে। দেশের মোট কংক্রিট ব্যবহারে রেডি-মিক্সের অংশ এখনো সংখ্যালঘু; বড় শহরের বাইরে এখনো সাইটেই কংক্রিট মেশানোর প্রবণতা বেশি। দেশজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫টি প্রতিষ্ঠান ব্যাচিং প্ল্যান্ট পরিচালনা করছে, আর বাজারের কাঠামোও শিল্পটির প্রতিযোগিতার প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।

শুধু ঢাকা বিভাগেই রেডি-মিক্স সরবরাহকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, যার অনেকগুলোর বয়স মাত্র কয়েক বছর। এই খণ্ডবিখণ্ড কাঠামোই শিল্পটির অন্যতম প্রধান প্রতিযোগিতাগত চ্যালেঞ্জ। একদিকে রয়েছে সীমিত পুঁজির অসংখ্য ছোট প্রতিষ্ঠান, যারা মূলত দাম ও বাকিতে বিক্রির শর্তের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতা করছে; অন্যদিকে রয়েছে তুলনামূলকভাবে সংহত, শক্তিশালী ও পুঁজি-সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানের একটি ছোট গোষ্ঠী।

ভিত্তিতে ফাটল

নিকট ভবিষ্যতের চিত্র অবশ্য আরও জটিল। চারটি প্রধান শক্তি একই সময়ে এই খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যার অধিকাংশই কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

প্রথমত, মূলধনের ব্যয়। বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন নীতি সুদহার ১০ শতাংশের কঠোর অবস্থানে রাখার পর ২০২৬ সালের আগস্টে তা কমিয়ে ৯.৫ শতাংশে নামিয়ে আনে, গত ছয় বছরে এটাই ছিল প্রথম সুদহার কমানোর পদক্ষেপ, যখন মূল্যস্ফীতি কমে প্রায় ৯.২ শতাংশে নেমেছে। রেডি-মিক্সের মতো মূলধননির্ভর ও মজুতনির্ভর শিল্পে, যেখানে ট্রানজিট মিক্সার, পাম্প ও ব্যাচিং প্ল্যান্টের বহর দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বছরের পর বছর উচ্চ সুদহার নীরবে পরিচালন মুনাফার একটি বড় অংশ ক্ষয় করেছে। এর প্রভাব আবাসন খাতেও স্পষ্ট। ২০২২ সালের শুরুতে যেখানে গৃহঋণের সুদহার ছিল প্রায় ৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায় এবং এখনো ১১.৫ থেকে ১৩.৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে মধ্যম আয়ের আবাসন বিক্রি, যা রেডি-মিক্স সরবরাহকারীদের অন্যতম প্রধান চাহিদার উৎস, সারা দেশে প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। কোনো কোনো প্রিমিয়াম প্রকল্পে পতনের হার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত।

দ্বিতীয় চাপটি এসেছে পার্শ্ববর্তী একটি শিল্প থেকে, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা। রেডি-মিক্সের প্রধান কাঁচামাল সিমেন্ট খাত গত এক দশকে আগ্রাসীভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এ খাতে আনুমানিক ৪৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশই ব্যাংকঋণনির্ভর। বর্তমানে দেশের সিমেন্টের বার্ষিক স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ১০ কোটি টন, অথচ ২০২৪ সালে প্রকৃত ব্যবহার হয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৮০ লাখ টনের মতো। অর্থাৎ সক্ষমতার ব্যবহার ৪০ শতাংশের নিচে। কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানও মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। এই অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ সিমেন্টের ব্যাগপ্রতি দাম কমিয়ে দিয়েছে, যদিও উৎপাদকদের নিজস্ব খরচ বেড়েছে। ফলস্বরূপ, সিমেন্ট থেকে রেডি-মিক্স পর্যন্ত পুরো নির্মাণসামগ্রী শিল্পশৃঙ্খল সংকুচিত চাহিদার বাজারে প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে মূলত দামের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে।

তৃতীয়ত, ত্রুটিপূর্ণ করকাঠামো। ২০২২ সাল থেকে রেডি-মিক্সে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কাঁচামাল-পরিশোধিত ভ্যাটের ওপর বসে। এর ফলে নিয়মিত ভ্যাটদাতাদের মুনাফা সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্বল প্রয়োগের সুযোগ নিয়ে একাংশ ভ্যাট এড়িয়ে ব্যবসা করছে। এতে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা এবং নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে। কার্যত এটি এমন একটি নীতিগত ফাঁক তৈরি করেছে, যেখানে নিয়ম মেনে চলাই যেন প্রতিযোগিতায় শাস্তিতে পরিণত হচ্ছে।

চতুর্থত এবং চলতি বছরের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলের ঝুঁকি থেকে। দেশে চুনাপাথরের মজুত নগণ্য হওয়ায় সিমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত গ্রাইন্ডিং ইউনিট হিসেবে কাজ করে; কাঁচামালের ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ক্লিংকার, যার বার্ষিক আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭৭ মিলিয়ন ডলার। প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ওমান, চীন, ভিয়েতনাম ও জাপান। এই আমদানিনির্ভরতা ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সরাসরি ধাক্কা খায়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের ইরানে হামলা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায়—বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেলবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই পথটি বন্ধ হওয়ায় ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সঙ্গে জাহাজভাড়া বেড়ে যায় এবং ক্লিংকারের দাম ৪৫ থেকে ৫৩ ডলারে ওঠে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এটিকে তেলবাজারের ইতিহাসের অন্যতম বড় সরবরাহ-ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর ফলে জিডিপি ক্ষতি ৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর জাহাজ চলাচল আংশিকভাবে স্বাভাবিক হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। দুর্বল চাহিদার কারণে এই বাড়তি ব্যয় ক্রেতার ওপর পুরোপুরি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। খরচ সমন্বয়ের জন্য ব্যাগপ্রতি অন্তত ৫০ টাকা মূল্যবৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল; কিন্তু বাস্তবে সেই সমন্বয় সম্ভব না হওয়ায় চাপ পড়েছে মুনাফায়, বিক্রয়মূল্যে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্দরের সীমাবদ্ধতা। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের ৯০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য পরিচালিত হলেও বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সক্ষমতা সীমিত। আমদানি পণ্যের প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্যান্ডলিং পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ব্যাচিং প্ল্যান্টে পৌঁছানোর আগেই খরচ ও বিলম্ব বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিযোগিতার ভিড়ে রেডি-মিক্স বাজার: দাম বাকির কঠিন লড়াই

প্রতিযোগিতার চিত্র দেখলেই বোঝা যায়, দাম ও বাকিতে বিক্রির লড়াই কীভাবে পুরো শিল্পকে প্রভাবিত করছে। শীর্ষ সারিতে রয়েছে বহুজাতিক ও শিল্পগোষ্ঠী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান; শাহ সিমেন্ট আরএমসি, বসুন্ধরা রেডিমিক্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রিজ, এনডিই রেডিমিক্স কনক্রিট, ক্রাউন রেডি মিক্স, আকিজ রেডিমিক্স এবং কনক্রিট, মীর রেডিমিক্স, লাফার্জ-হোলসিম বাংলাদেশ ও হাইডেলবার্গসিমেন্ট বাংলাদেশ। পাশাপাশি রয়েছে কনফিডেন্স রেডি মিক্স, কনকর্ড রেডি মিক্স ও এবিসি বিল্ডিং প্রোডাক্টসের মতো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান।

এদের অধিকাংশই নিজস্ব সিমেন্ট ও পাথর উৎপাদনের সঙ্গে ব্যাচিং কার্যক্রমকে যুক্ত করে কাঁচামাল থেকে ঢালাই পর্যন্ত মান ও খরচের ওপর তুলনামূলকভাবে ভালো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। এর বিপরীতে রয়েছে অসংখ্য ছোট একক-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ঢাকায়, যারা কারিগরি সক্ষমতা বা সেবার পার্থক্যের পরিবর্তে প্রায় পুরোপুরি দাম ও বাকিতে বিক্রির ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতা করছে। এই প্রবণতাই নিয়ম মেনে চলা এবং না-চলা উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং পুরো শিল্পে লাভের পরিমাণ সংকুচিত করছে।

অদৃশ্য চাপের হিসাব: গুণগত মান, বকেয়া মূলধনের সংকট

শিরোনামে খুব বেশি না এলেও তিনটি সমস্যা প্রতিদিনের ব্যবসায়িক হিসাবকে ওপরের চ্যালেঞ্জগুলোর মতোই গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

প্রথমটি পরিবহনজনিত মানের ঝুঁকি। রেডি-মিক্স কংক্রিট মূলত সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিক্রি করতে হয় এমন একটি পণ্য। মেশানোর প্রায় ৯০ থেকে ১২০ মিনিটের মধ্যেই এর কার্যকারিতা কমতে শুরু করে। ঢালাইয়ের সময় সঠিক অনুপাত, গুণগত মান ও স্লাম্প বজায় রাখা, শুধু প্ল্যান্টে নয়, সাইট পর্যন্ত রেডি-মিক্সকে সাইটে মেশানো কংক্রিট থেকে আলাদা করার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই পরিবহন ও মান এখানে অবিচ্ছেদ্য।

ঢাকার যানজটে ট্রানজিট মিক্সার আটকে পড়া এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। এর সঙ্গে ভারী যানবাহনের উপযোগী নয় এমন সড়ক, ফ্লিট-ট্র্যাকিং বা কার্যকর রুট পরিকল্পনার ঘাটতি যুক্ত হয়ে বিলম্বিত ডেলিভারির ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে অনেক সময় কংক্রিট সাইটে পৌঁছায় কম কার্যকারিতা নিয়ে, উপাদান বিচ্ছিন্ন হয়ে অথবা আগেভাগেই জমাট বাঁধার অবস্থায়। তখন সাইট প্রকৌশলীদের হয় চালান বাতিল করতে হয়, নয়তো অতিরিক্ত পানি মিশিয়ে সেটিকে ব্যবহারযোগ্য করার চেষ্টা করতে হয়, যা অদৃশ্যভাবে কংক্রিটের মান কমিয়ে দেয়।

প্রতিটি বাতিল বা বিতর্কিত চালান আসলে দ্বিগুণ ক্ষতি তৈরি করে। একদিকে থাকে সেই চালানের সরাসরি খরচ, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্লায়েন্টের সঙ্গে সম্পর্ক, যা এখনো বিকাশমান একটি তরুণ শিল্পের জন্য হারানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

দ্বিতীয় সমস্যা হল প্রতিযোগিতার সংস্কৃতির কারণে বাকিতে বিক্রির প্রবণতা। সরবরাহকারীরা নিয়মিতভাবে ডেভেলপার ও ঠিকাদারদের দীর্ঘ মেয়াদে বাকিতে পণ্য সরবরাহ করে থাকেন। অথচ তাদের অনেকেই নিজেরাও আবাসন খাতের মন্দার কারণে আর্থিক চাপে রয়েছেন। ফলে বকেয়া পাওনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এটি শিল্পের একটি কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

এটি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ রেডি-মিক্স একটি স্বল্প-মুনাফা ও মূলধননির্ভর ব্যবসা। কার্যকরী মূলধন দীর্ঘ সময় আটকে রাখার সক্ষমতা সীমিত। যে প্রতিষ্ঠান বিক্রির পরিমাণ ধরে রাখতে বাকিতে পণ্য সরবরাহ করে এবং পরে মাসের পর মাস অর্থ আদায়ের অপেক্ষায় থাকে, সে আসলে নিজের উচ্চ সুদের ঋণের পাশাপাশি ক্রেতার নগদপ্রবাহের সংকটও নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে।

তৃতীয় সমস্যাটি প্রথম দুটির সরাসরি ফল—এই ব্যবসায় একই সঙ্গে দুই দিক থেকে বিপুল পরিমাণ মূলধনের প্রয়োজন হয়। রেডি-মিক্স ব্যবসা শুরুতেই বড় অঙ্কের মূলধনি বিনিয়োগ বিনিয়োগ করতে হয় প্রধানত ব্যাচিং প্ল্যান্ট, ট্রানজিট মিক্সার ও পাম্পের বহর, ওয়েব্রিজ, পরীক্ষাগারসহ বিভিন্ন স্থায়ী সম্পদের জন্য। এসব বিনিয়োগের অর্থনৈতিক রিটার্ন আসতে সময় লাগে। একই সঙ্গে প্রয়োজন ধারাবাহিক কার্যকরী মূলধন, যা কাঁচামালের মজুত এবং ধীরগতিতে আদায় হওয়া পাওনা পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়।

খুব কম প্রতিষ্ঠানই কেবল নিজেদের নগদপ্রবাহ থেকে এই দুই ধরনের চাহিদা পূরণ করতে পারে। তাই অর্থায়ন কাঠামো এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ও দীর্ঘমেয়াদি পাওনা স্বল্পমেয়াদি, উচ্চ সুদের কার্যকরী মূলধন ঋণ দিয়ে পরিচালনা করতে হয়, সেখানে কাঠামোগত অসামঞ্জস্য অনিবার্য। আর এই অসামঞ্জস্য প্রথমে তারল্য সংকট হিসেবে প্রকাশ পায়, পরে ধীরে ধীরে তা সচ্ছলতার সংকটে রূপ নিতে পারে।

সংখ্যার আড়ালে যে বাস্তবতা: সংকট নয়, সম্ভাবনারও গল্প

তবে এই পুরো পরিস্থিতিকে শিল্পের পতন হিসেবে দেখা ভুল হবে। বাংলাদেশের নির্মাণ বাজার যার ২০২৫ সালে আকার ছিল প্রায় ৩৭.৮ বিলিয়ন ডলার, ২০৩১ সাল পর্যন্ত বছরে ৬ শতাংশের বেশি হারে বেড়ে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। অবকাঠামো বিনিয়োগ যেমন পরিবহন, জ্বালানি, শিল্প ও টেলিযোগাযোগ যা বাজারের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত বাড়ছে এবং আবাসন খাতের মন্দার একটি বড় অংশ পুষিয়ে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সুদহার হ্রাস, যত সামান্যই হোক, দীর্ঘ সময় পর প্রথম এমন একটি ইঙ্গিত যে মুদ্রানীতি কঠোর অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সহায়ক অবস্থানের দিকে মোড় নিচ্ছে। চাহিদার মৌলিক ভিত্তি হারিয়ে যায়নি; বরং অর্থায়ন ব্যয়ের প্রতিকূল পরিবেশে তা সাময়িকভাবে চাপা পড়েছে, যে পরিবেশ এখন ধীরে হলেও কিছুটা শিথিল হচ্ছে।

আকিজের অবস্থান ও কৌশল: প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রবৃদ্ধির পথে

আকিজে আমরা এই চাপ সরাসরি অনুভব করেছি। গত অর্থবছরে বিল্ডিং সলিউশনস ব্যবসা পরিকল্পনার তুলনায় বেশি বিক্রয় অর্জন করে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। তবে আমদানি করা কাঁচামাল ও পরিবহনের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি, করদায় এবং অর্থায়ন ব্যয়, সব মিলিয়ে খরচ আয়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। ফলে মুনাফার মার্জিনে বাস্তব ও উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে, যা এ বছর গোটা শিল্পেরই একটি সাধারণ চিত্র।

তারপরও এই প্রতিকূল চক্রের মধ্যেও আমরা বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে পেরেছি। এর পেছনে রয়েছে আমাদের আকার, বৈচিত্র্য ও সংহত ব্যবসায়িক কাঠামোর শক্তি। আকিজ রেডি-মিক্স ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে সাতটি ব্যাচিং প্ল্যান্ট পরিচালনা করছে। এর মধ্যে পাঁচটি বর্তমানে সক্রিয় এবং বাকি দুটি আলীগঞ্জ ও কালিয়াকৈরে যা২০২৭ সালের শুরুতে চালু হবে। আমাদের বহরে রয়েছে ১০০টির বেশি ট্রানজিট মিক্সার ও ২২টির বেশি পাম্প, এবং আমরা ২ হাজার থেকে ৭ হাজার পিএসআই পর্যন্ত নয়টি গ্রেডে কংক্রিট সরবরাহ করছি।

স্থাপিত সক্ষমতা বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৭২ লাখ ঘনফুট এবং সক্ষমতার ব্যবহার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় ২০৩১ সাল নাগাদ রাজস্ব প্রায় তিন গুণ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সহযোগী প্রতিষ্ঠান আকিজ সিমেন্ট ভার্টিক্যাল রোলার মিল প্রযুক্তি এবং ব্লাস্ট ফার্নেস স্ল্যাগ ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণ ও ক্লিংকারনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দুটি ব্যবসাই আকিজ রিসোর্সের অংশ এবং এর বার্ষিক আয় ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই শক্তিশালী ব্যালান্স শিট কঠিন সময়েও বিনিয়োগ, ফ্লিট-ট্র্যাকিং, ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং মান ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা জোগায়।

তবে সব প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের সুরক্ষা নেই। আর এখানেই নিহিত রয়েছে শিল্পের কাঠামোগত ঝুঁকি, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ঋণদাতাদের বিশেষভাবে নজরে রাখা উচিত।

যে ঘাটতিগুলো দূর করতেই হবে: শিল্পের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ

শিল্পটির পাঁচটি কাঠামোগত ঘাটতি বিশেষভাবে স্পষ্ট।

কর নীতি: ভ্যাট আদায় যদি বিক্রয় পর্যায়ের পরিবর্তে আমদানি পর্যায়ে করা হয়, তাহলে কর ফাঁকি কমানো এবং দ্রুত রাজস্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে। শিল্পসংশ্লিষ্টরাও এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

মানদণ্ড: মিশ্রণ অনুপাত, গুণগত নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ জনবল এবং ডেলিভারি-সময়, স্লাম্প ও লস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এখনো সর্বত্র সমন্বিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রয়োগ নেই। ফলে অনানুষ্ঠানিক সরবরাহকারীরা দাম ও নিরাপত্তা, উভয় ক্ষেত্রেই অসম প্রতিযোগিতার সুযোগ পাচ্ছে।

অর্থায়ন: দীর্ঘমেয়াদি সম্পদভিত্তিক অর্থায়নের পাশাপাশি বকেয়া পাওনায় আটকে থাকা মূলধন মুক্ত করার জন্য রিসিভেবলস অর্থায়ন দরকার। কেবল স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভরতা এই ব্যবসার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

টেকসইতা: পোড়া ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে যারা দ্রুত কম-কার্বন উপকরণ এবং চক্রাকার অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, ভবিষ্যতে তারাই বেশি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকবে।

সরবরাহশৃঙ্খলের সহনশীলতা: হাতে গোনা কয়েকটি বাজারের ওপর আমদানিনির্ভরতা কমাতে দরকার সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যকরণ, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, বন্দর আধুনিকায়ন, সিঙ্গেল-উইন্ডো কাস্টমস ব্যবস্থা এবং স্ল্যাগ ও ফ্লাই অ্যাশের মতো দেশীয় বিকল্পে বিনিয়োগ। এতে একদিকে ক্লিংকারের ওপর নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাবে।

টিকে থাকা থেকে টেকসই প্রবৃদ্ধি: আগামীর পথচলা

এই ঘাটতিগুলোর কোনোটিই অসমাধানযোগ্য নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ। নীতিনির্ধারকদের ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং সবার জন্য সমানভাবে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ঋণদাতাদের এমন অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা একই সঙ্গে সম্পদ এবং পাওনা-চক্রের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরবরাহশৃঙ্খল শক্তিশালী করা, ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং কম-কার্বন উপকরণে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে; প্রতিকূলতার কারণে পিছিয়ে গেলে চলবে না।

শিল্পের প্রয়োজনীয় একত্রীকরণও এই সমাধানের একটি অংশ হতে পারে। ভবিষ্যতে টিকে থাকবে তারাই, যাদের সরবরাহশৃঙ্খল সংহত, ব্যালান্স শিট শক্তিশালী, ঋণ ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল এবং যারা কেবল কম দামে নয়, মান ও নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

বাংলাদেশ নির্মাণের পথ থেকে সরে যাবে না। আগামী দশকের মেট্রোলাইন, এক্সপ্রেসওয়ে, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আবাসন প্রকল্পগুলো হাতে মেশানো কংক্রিটের ওপর নির্ভর করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই আসল প্রশ্ন রেডি-মিক্স কংক্রিটের ভবিষ্যৎ আছে কি না, তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আজকের কতগুলো প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কাঠামোগতভাবে সেই ভবিষ্যতে পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত?

যারা প্রস্তুত, তাদের একই সঙ্গে সামলাতে হবে পরবর্তী হরমুজ-ধাক্কা, পরবর্তী বকেয়া চালান এবং পরবর্তী সুদহার চক্র। এই বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সময় শেষ। এখনই দরকার খোলাখুলি আলোচনা, কাঠামোগত সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, যাতে বাংলাদেশের রেডি-মিক্স কংক্রিট শিল্প শুধু টিকে না থাকে, বরং আগামী দিনের নির্মাণ অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হয়।

আরও