যমুনার বুকে দেশের দীর্ঘতম ডাবল লাইন রেলসেতু

যমুনা নদীতে বিদ্যমান বহুমুখী সেতুর ৩০০ মিটার উজানে নির্মাণ করা হয়েছে স্বতন্ত্র রেলসেতু। এটি দেশের দীর্ঘতম ডাবল লাইন রেলসেতু, যার দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার।

যমুনা নদীতে বিদ্যমান বহুমুখী সেতুর ৩০০ মিটার উজানে নির্মাণ করা হয়েছে স্বতন্ত্র রেলসেতু। এটি দেশের দীর্ঘতম ডাবল লাইন রেলসেতু, যার দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। আজ সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর সেতুর দুটি লাইন দিয়ে শুরু হবে ট্রেন চলাচল। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণে বাস্তবায়িত সেতুটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, সেতুর পূর্ব প্রান্ত টাঙ্গাইলের ইব্রাহিমাবাদ রেল স্টেশন প্রাঙ্গণে হবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি থাকবেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি। রেলপথ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে, ঢাকাস্থ জাপান দূতাবাস ও জাইকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে ইব্রাহিমাবাদ স্টেশন থেকে ছাড়বে উদ্বোধনী ট্রেন। সেতু পার হয়ে ট্রেনটি পশ্চিম পাড়ে সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ স্টেশনে ঘুরে আবার ইব্রাহিমাবাদ স্টেশনে ফিরে আসবে।

যমুনা বহুমুখী সেতু ১৯৯৮ সালে চালুর পর ঢাকার সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চল রেলের বিভিন্ন রুটে সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তবে সেতুটি শুধু যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের উপযোগী। আবার ট্রেনগুলো ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলতে পারে না। ফলে বহুমুখী সেতু দিয়ে যমুনা পার হতে একটি ট্রেনের ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লেগে যায়। আবার দিনে ৩৮টির বেশি ট্রেন এ সেতু দিয়ে চলতে পারে না। যদিও এ রুটে প্রতিদিন চলাচল করা ট্রেনের সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। সেতু পারাপারের জন্য তাই অনেক ট্রেনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়।

ঢাকা থেকে পশ্চিমাঞ্চলের রুটগুলোয় ট্রেন চলাচলে এসব প্রতিবন্ধকতা এড়াতে ২০১৬ সালে গ্রহণ করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেল সেতু প্রকল্প’। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সেতুটির নামকরণ করা হয় ‘যমুনা রেলসেতু’। মূল সেতুর কাজ বাস্তবায়ন করা হয় দুই ধাপে। সিরাজগঞ্জ প্রান্তের ১ নম্বর পিলার থেকে মাঝনদী বরাবর ২৩ নম্বর পিলার পর্যন্ত কাজ বাস্তবায়ন করে জাপানের আইএইচআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিস্টেমস ও সুমিতোমো মিতসুই কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের জয়েন্ট ভেঞ্চার (আইএইচআই-এসএমসিসি)। এ অংশের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ২৫ কিলোমিটার। অন্যদিকে মাঝনদীর ২৪ নম্বর পিলার থেকে টাঙ্গাইল প্রান্তের ৫০ নম্বর পিলার পর্যন্ত কাজ করে আরেক জাপানি ঠিকাদার ওবায়েশি করপোরেশন, টিওএ করপোরেশন ও জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের জয়েন্ট ভেঞ্চার (ওটিজে)। সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ করে জাপানের ইয়াশিমা অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড ও ভারতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জি সতীশ এন্টারপ্রাইজেসের জয়েন্ট ভেঞ্চার।

৫০টি পিয়ারের ওপর ৪৯টি স্প্যান বসিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে যমুনা রেলসেতু। স্প্যানগুলো ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে তৈরি করে আনা হয়। স্প্যানগুলোয় বিশেষ ধরনের ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছে বলে বণিক বার্তাকে জানান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওটিজে জয়েন্ট ভেঞ্চারের প্রধান প্রকৌশলী (সাইট) মুহ. আব্দুল খালেক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ইস্পাত অনেক ব্যয়বহুল। আগামী ১০০ বছর কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে না। স্প্যানগুলোয় কোনো ধরনের রঙও ব্যবহার করা হয়নি। স্বাভাবিকভাবে দেখলে মনে হবে, হয়তো মরিচা ধরেছে। কিন্তু এটাই আসলে স্বাভাবিক রঙ। কয়েক বছর পর এ রঙ আরো উজ্জ্বল হবে।’

নতুন সেতু দিয়ে প্রতিদিন ৮৮টি ট্রেন চলতে পারবে বলে জানিয়েছেন সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সেতুটি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে নির্মাণ হয়েছে। ব্রড গেজের ট্রেনগুলো ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার ও মিটার গেজের ট্রেনগুলো সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে।’

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেলসেতুটি চালু হলে ঢাকা থেকে খুলনার মধ্যে যাতায়াতে ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় বাঁচবে। একইভাবে ঢাকা-রাজশাহীর মধ্যে দেড় ঘণ্টা ও ঢাকা-দিনাজপুরের মধ্যে ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ও ঢাকা-রংপুরের মধ্যে যাতায়াতে সময় বাঁচবে ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট। পাশাপাশি ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ লিংক হয়ে উঠবে যমুনা রেলসেতু।

তবে যমুনা সেতুর পুরো সুফল পেতে আরো অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌যদি আমরা প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভস, কোচ ও ওয়াগন কিনতে পারি তাহলে এ রেলসেতু পশ্চিমাঞ্চল রেলের উন্নয়নে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ডাবল লাইন সেতুর জন্য রেলপথও ডাবল লাইন করা প্রয়োজন। ডাবল লাইন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পুরো সুফল আমরা পাব না।’

যমুনা রেলসেতু প্রকল্প ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর অনুমোদন হয়। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। কিন্তু নানা কারণে তখন সেতু নির্মাণে জটিলতা তৈরি হয়। পরে ব্যয় বাড়িয়ে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি ৯৫ লাখ নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি জাইকার কাছ থেকে ঋণ। বাকি অর্থ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

আরও