লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ আশফাক হোসেন চৌধুরী

বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখন বন্দর ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা

বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ হবে বন্দর, সড়ক, শুল্ক ছাড় ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো। উৎপাদন ও রফতানির পাশাপাশি এখন দ্রুত, কম খরচে ও নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে উঠেছে বলে মত দিয়েছেন আকিজ রিসোর্সের লজিস্টিকস বিভাগের ক্লাস্টার প্রধান অর্থ কর্মকর্তা আশফাক হোসেন চৌধুরী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির সাফল্যের আলোচনা সাধারণত উৎপাদন, রফতানি ও শিল্পায়নকে কেন্দ্র করেই হয়। তবে এখন পণ্য পরিবহন, বন্দর, শুল্ক ছাড়, গুদাম ও সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার সময় এসেছে। কারণ বর্তমানে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শুধু কারখানার উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নেই। বরং কোন দেশ কত দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পৌঁছাতে পারে, সেটিই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই বাণিজ্যনির্ভর। বিশেষ করে রফতানি এখনো সীমিত কয়েকটি খাত ও নির্দিষ্ট কিছু রুটের ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় বন্দরে জট, শুল্ক ছাড়ে ধীরগতি, কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকা কিংবা সড়কে পণ্যবাহী যানবাহনের ধীরগতির প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। এতে রফতানির লাভ কমে যায়, উৎপাদন পরিকল্পনায় সমস্যা তৈরি হয় এবং বিদেশী ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আশফাক হোসেন চৌধুরী বলেন, এক দিনের বিলম্ব শুধু সময়ের ক্ষতি নয়। এর ফলে একটি চালান নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ ব্যবসাও হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।

তিনি বলেন, দেশে এখনো সড়ক, রেল, বন্দর, বিমানপথ, স্থলবন্দর, শুল্ক ছাড় ও গুদাম ব্যবস্থার মধ্যে পুরোপুরি সমন্বয় তৈরি হয়নি। অর্থনীতি বড় হলেও পণ্য চলাচলের অবকাঠামো একই গতিতে শক্তিশালী হয়নি। ফলে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

তার মতে, সামনে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরো কঠিন হবে। স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বিশেষ শুল্কসুবিধা কমে আসবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও আরো বেশি সময়নিষ্ঠতা চাইবে। তাই শুধু কম খরচে উৎপাদন করলেই হবে না, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি হবে।

আশফাক হোসেন চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। এ সূচকে ভারতের অবস্থান ৩৮তম এবং ভিয়েতনামের অবস্থান ৪৩তম হলেও বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। শুল্ক কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবস্থান ১০১তম, অবকাঠামোতে ১০৮তম ও আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে ৯১তম। সময়নিষ্ঠতা ও পণ্য অনুসরণ ব্যবস্থাতেও বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

তবে ইতিবাচক কিছু উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেছেন, রেল সংযোগ উন্নয়ন, স্থলবন্দরে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিমানবন্দরের পণ্য পরিবহন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। জাতীয় পণ্য পরিবহন নীতিও সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়ন।

আশফাক হোসেন বলেন, শুল্ক ছাড় ও বাণিজ্যসংক্রান্ত কাগজপত্রের প্রক্রিয়া আরো সহজ, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। হাতে করা প্রক্রিয়া যত বেশি থাকবে, তত বেশি বিলম্ব ও অতিরিক্ত খরচ তৈরি হবে।

বন্দর দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন আশফাক হোসেন চৌধুরী। তার মতে, জাহাজ কত দ্রুত নোঙর করতে পারছে, কনটেইনার কত দ্রুত ওঠানামা করছে এবং পণ্য কত দ্রুত বন্দর ছাড়ছে, এখন এগুলোই ব্যবসার প্রধান সূচক।

তিনি আরো বলেন, সড়ক, রেল, বন্দর, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল ও বিমানপথকে আলাদা খাত হিসেবে না দেখে একই সরবরাহব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

আশফাক হোসেন চৌধুরী বলেন, শুধু প্রকল্প উদ্বোধন করলেই হবে না। পণ্য খালাসে সময় কত কমেছে, কনটেইনার বন্দরে কত সময় থাকছে এবং পরিবহন ব্যয় কতটা কমছে, সেসব বাস্তব ফলও মূল্যায়ন করতে হবে।

তার মতে, বাংলাদেশ যদি পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা আরো দক্ষ করতে পারে, তাহলে রফতানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বাজারসংযোগ সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ কারণে পণ্য পরিবহন খাতকে শুধু সহায়ক খাত হিসেবে নয়, বরং প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে হবে।

আশফাক হোসেন চৌধুরী বলেন, বিশ্ববাজারে এগিয়ে থাকবে সেই দেশ, যারা শুধু পণ্য উৎপাদনই নয়, বরং কম খরচে ও নির্ভরযোগ্যভাবে সময়মতো পণ্য পৌঁছে দিতে পারবে। বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক লড়াই তাই কারখানার ভেতরে নয়, বরং বন্দর, সড়ক, শুল্ক ছাড় ও পুরো পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যেই হবে।

—বিজ্ঞপ্তি

আরও