বেঙ্গলবুকসে গুস্তাভ ল্য ক্লেজিওর ‘যে কখনো সমুদ্র দেখেনি’ বইয়ের অনুবাদ প্রকাশনা অনুষ্ঠান

নোবেলজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক গুস্তাভ ল্য ক্লেজিওর বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ ‘যে কখনো সমুদ্র দেখেনি’ বইয়ের বাংলা অনুবাদের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ও আলোচনাপর্বে ছিলেন বিশিষ্ট লেখক, কবি ও সাহিত্য সমালোচক

নোবেলজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক গুস্তাভ ল্য ক্লেজিওর বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ ‘যে কখনো সমুদ্র দেখেনি’ বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে সৃজনশীল প্রকাশনা বেঙ্গলবুকস। বইটির প্রকাশ উপলক্ষে শনিবার (১৮ জুলাই) পুরানা পল্টনের জামান টাওয়ারে প্রকাশনীর মূল কার্যালয়ে প্রকাশনা অনুষ্ঠান ও আলোচনা পর্বের আয়োজন করা হয়। অনুবাদগ্রন্থটির আলোচনাপর্বে বিশিষ্ট লেখক, কবি ও সমালোচকরা অংশ নেন।

আলোচনাপর্বে লেখক ও সাংবাদিক সাদাত সায়েম বলেন, ‘অনুবাদক নূরুল আলমের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আনি এর্নোর বইয়ের অনুবাদ পড়ে। অনুবাদের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক তৈরি হয় কীভাবে? পাঠক যখন মনে করবেন অনুবাদের কাজটা সততার সঙ্গে করায় গোটা বইটাই বিশ্বস্ত সাহিত্য হয়ে উঠেছে। বইটিতে অনুবাদকের সে সততা ও বিশ্বস্ততা পাওয়া গেছে। আশা করি, অনুবাদক নূরুল আলমের আনি এর্নোর অনূদিত বইটির মতো এটিও ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পাবে।’

কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক দিলওয়ার হাসান বলেন, ‘ভাষা জানলেই অনুবাদ করা যায় না। ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অনুবাদকের তীব্র অনুরাগ থাকা চাই। সেই সঙ্গে দরকার মূল ও পরিভাষায় সমান দক্ষতা। তবেই একটি ভালো অনুবাদ হতে পারে। নূরুল আলম সেখানে সফল। তিনি খুবই সফলভাবে মূল ফরাসি থেকে দুটি অনুবাদ করেছেন। এজন্য তিনি ধন্যবাদ ও প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।’

এছাড়া ‘যে কখনো সমুদ্র দেখেনি’ বইটিতে সংকলিত গল্পগুলো পাঠের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বইটির গল্পগুলোয় প্রাধান্য পেয়েছে শিশুদের নিয়ে বড়দের একটি অন্তরঙ্গ আলাপন, দর্শন, প্রকৃতি এবং প্রকৃতি ধ্বংস হওয়া নিয়ে আলাপন, যে বিষয়ে সাধারণত লেখকেরা কলম তুলতে চান না। লেখক প্রকৃতির প্রতি তার পূর্ণ ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন এ গল্পগুলোর ভেতর।’

বইটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনুবাদক মঈন উদ্দীন আহমদ বলেন, ‘ফরাসি সারা পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক ও মিষ্টি ভাষা। এ ভাষায়ই সবচেয়ে বেশি প্রেম নিবেদন করা যায়। রোমানিক ভাষা হওয়ায় ফরাসি ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার শব্দগত ও বাক্যগত যেসব বৈচিত্র্য ও বৈসাদৃশ্য, সেসবের প্রতি অনুবাদকের মনোযোগ এবং অভূতপূর্ব দক্ষতায় সেসব জায়গা বাংলায় তুলে আনা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’

মূল ফরাসি থেকে অনূদিত বইটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কথাসাহিত্যিক দীপু মাহমুদ বলেন, ‘ফরাসি ভাষার চিরায়ত মিষ্টি ও প্রেমভাব, এ ভাষার সাহিত্য ও শিল্পবোধ অনুবাদক নূরুল আলম সচেতনভাবে তার অনুবাদকর্মে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। দৃশ্যায়নের যে আনন্দ, পড়লেই তা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেখানেও তার দক্ষতার ছাপ বইটিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’ আলোচ্য বইটি পাঠের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘বইয়ের গল্পগুলোয় দ্বৈত অনুভূতির চমৎকার চিত্রায়ন হয়েছে। নৃশংসতা ও প্রেমভাব, আস্ফালন ও নীরবতার দ্বৈততা নূরুল আলমের অনুবাদে বেশ সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে।’

নিজের অনুবাদ অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নূরুল আলম বলেন, ‘আমার ফরাসি ভাষা শেখা মূলত ডকুমেন্টরির কাজ করতে গিয়ে। পরবর্তী সময়ে ফরাসি সাহিত্য ও তার অনুবাদে আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। আলোচ্য বইটির নামগল্পটি আমি সর্বপ্রথম অনুবাদ করেছিলাম। গল্পটি অনুবাদ করতে আমার সময় লেগেছিল সাত-আট মাস। তার কিছুদিন পরে আনি এর্নোর নোবেলজয়ী বইটি সম্পর্কে অবহিত হই। আনি এর্নোকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ে আমার এ বইয়ের কাজ। বইয়ের বাকি তিনটি গল্প পরে অনুবাদ করেছি।’

অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে বেঙ্গলবুকসের মহাব্যবস্থাপক ও প্রকল্পপ্রধান আজহার ফরহাদ বলেন, ‘ফরাসি মিষ্টি ও মধুর হলেও এটি একটি ইঙ্গিতবহ ভাষা অনেকাংশেই। এ কারণে নামগল্পের শেষ লাইনে দানিয়েলকে বা সমুদ্রকে নিয়ে শিশুদের যে গোপনীয়তা বা নীরবতার যে চুক্তির কথা বলা হয়েছে, সে অংশটি আমাকে ছয়বার সম্পাদনা করতে হয়েছে। গল্পটি পড়ার পরে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট চলে আসে সামনে। সেটি হলো তারা বড়দের চাপে পিষ্ট। তাদের কল্পনাজগতের সামনে বড়রা আড়াল হয়ে দাঁড়ায়। তাদের জন্য বড়রা তৈরি করে শিশু মনস্তত্ত্ব। অথচ শিশুদের জন্য কোনো মনস্তত্ত্ব দরকার নেই, তাদের প্রয়োজন এক বিস্তীর্ণ কল্পনাজগৎ। বইটি মূলত আরো আগেই প্রকাশ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে বইটিকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও মানসম্মত করতে দীর্ঘ সময় নিয়ে সম্পাদনা করায় এটি প্রকাশ করতে দেরি করা হয়েছে।’

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন রোকসানা কাজল, মামুনুল হক আরিফ, আবদুল্লাহ আমান, নীহার মোশাররফ প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন বেঙ্গলবুকসের কর্মী তৌহিদ ইমাম।

আরও