পুরনো লোহা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে সেচ পাম্প, লাইনার, পিস্টন, পাওয়ার টিলার ও ধান কাটার যন্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদনের মাধ্যমে জেলার শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তবে শিল্পের সম্প্রসারণে জায়গা সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বগুড়ায় বিসিক শিল্পনগরীতে জায়গা সংকট এবং ভিনদেশী যন্ত্রাংশ এ শিল্পকে বাধাগ্রস্ত করছে। ভিনদেশী পণ্যের অবাধ প্রবেশে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বগুড়ার কৃষিযন্ত্র শিল্প বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের ১৬টিরও বেশি জেলার কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। স্থানীয় কারখানাগুলোতে উৎপাদিত যন্ত্রাংশ সেচ, জমি চাষ, ধান মাড়াই ও অন্যান্য কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে।
বগুড়া বিসিক শিল্পনগরী ও এর বাইরে গড়ে ওঠা শিল্প ইউনিটগুলোতে বর্তমানে সেচ পাম্প, লাইনার, পিস্টন, হস্তচালিত টিউবওয়েল, পাওয়ার টিলারের যন্ত্রাংশ, লেদ মেশিন, ব্রেক ড্রাম, ফ্লাওয়ার মিল, অয়েল মিল এবং ধান কাটার যন্ত্রের বিভিন্ন উপকরণ উৎপাদন হচ্ছে। শিল্প মালিকদের দাবি, এসব পণ্যের একটি বড় অংশ দেশীয় চাহিদা পূরণ করছে এবং ভবিষ্যতে রপ্তানিরও উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
রেলওয়ে হকার্স মার্কেটের বসাক ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের স্বত্বাধিকারী বিশ্বজিৎ বসাক জানান, কৃষি মৌসুমকে ঘিরে শ্যালো মেশিনের যন্ত্রাংশ, সেচ পাম্প ও কৃষি সরঞ্জামের চাহিদা দ্রুত বাড়ে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমের আগে বিক্রি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। এ খাতের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমিকের জীবিকা এসব উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় শিল্প মালিকদের মতে, বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্প স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা পুরনো লোহা ও স্ক্র্যাপ পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি ও শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। বর্তমানে জেলায় প্রায় ৬২টি ফাউন্ড্রি প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় এক হাজার ছোট-বড় ওয়ার্কশপ এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানে হাজারো শ্রমিক কাজ করছেন।
তবে শিল্পের বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিসিক শিল্পনগরীর জায়গা সংকট। বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ঢালাই, ওষুধ, প্লাস্টিক, ব্রেড ও বিস্কুট, অ্যালুমিনিয়াম এবং কীটনাশকসহ বিভিন্ন খাতের মোট ৯৩টি কারখানা বর্তমানে বিসিক এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু নতুন শিল্প ইউনিট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্লট না থাকায় বিনিয়োগ সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে না।
বগুড়া বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আজিজার রহমান মিলটন জানান, শিল্পনগরীতে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতাও উৎপাদন ব্যাহত করছে। শিল্পাঞ্চলের আধুনিকায়ন না হলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, বিসিকের উন্নয়ন হলে বগুড়ায় উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রাংশ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যাবে। সরকারিভাবে রফতানির আয়োজন করা হলে শিল্প উদ্যোক্তারা আরো দ্বিগুণ উৎপাদনমুখী হতে পারবে। বিদেশী কৃষিপণ্য দেশে অবাধে আসায় বগুড়ার শিল্প মালিকরা ভালো নেই।
এদিকে স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিদেশী কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশের আমদানি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, দেশে উৎপাদিত অনেক পণ্যের অনুরূপ পণ্য চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হওয়ায় স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং রপ্তানি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে বলে তারা মনে করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বগুড়ার কৃষিযন্ত্র শিল্পের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে উৎপাদন অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন শিল্প প্লট বরাদ্দ, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন এবং নীতিগত সহায়তা ছাড়া এ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে বগুড়ার কৃষিযন্ত্র শিল্প শুধু দেশের চাহিদা পূরণই নয়, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।