কর্তৃপক্ষ ও নগর পরিকল্পনাবিদের ভাবনা

ঢাকায় প্রতি কিলোমিটারে দুটি পাবলিক টয়লেট প্রয়োজন

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)

একটি শহর কতটা মানবিক ও বসবাসযোগ্য, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো সে শহরের সাধারণ মানুষের জন্য ন্যূনতম মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার সক্ষমতা।

একটি শহর কতটা মানবিক ও বসবাসযোগ্য, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো সে শহরের সাধারণ মানুষের জন্য ন্যূনতম মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার সক্ষমতা। এ প্রেক্ষাপটে ঢাকার পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থা আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার এক হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে। এটি শুধু পরিচ্ছন্নতার সংকট নয়, বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে মারাত্মক পরিকল্পনাগত দৈন্য ও নাগরিক অধিকারের প্রতি এক নির্মম অবহেলা। নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে আমরা শহরকে দেখি একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে, যার প্রতিটি অঙ্গ একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঢাকার ক্ষেত্রে পাবলিক টয়লেটকে কখনই মূল নগর কাঠামোর একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে ভাবা হয়নি। এটিকে সবসময় একটি প্রান্তিক ও ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে। আমাদের মহাপরিকল্পনা বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) বাণিজ্যিক এলাকা, উন্মুক্ত স্থান বা গণপরিবহন কেন্দ্রগুলোয় কী পরিমাণ মানুষের চলাচল হয়, তাদের জন্য কতগুলো পাবলিক টয়লেট প্রয়োজন, এ ধরনের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় টয়লেটের সংখ্যা অপ্রতুল এবং যা-ও নির্মাণ হয়েছে, তার অবস্থান ও নকশা অপরিকল্পিত। এটি আমাদের নগর পরিকল্পনার দর্শনের একটি মৌলিক ত্রুটি। নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী ঢাকার মতো অতি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতি এক কিলোমিটারে দুটি পাবলিক টয়লেট প্রয়োজন।

এ পরিকল্পনাগত ভুলের সরাসরি শিকার হচ্ছেন সাধারণ নাগরিক। একজন পথচারী, রিকশাচালক, দিনমজুর, হকার কিংবা কর্মজীবী নারী, যারা এ শহরের প্রাণ, তাদের দৈনন্দিন জীবনে এক অসহনীয় পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়। একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ টয়লেটের অভাবে তাদের স্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তেমনি তাদের মানবিক মর্যাদাও ভূলুণ্ঠিত হয়। বিশেষ করে নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য এ শহর কার্যত এক বৈরী পরিবেশ তৈরি করেছে। এটি নাগরিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ একটি শহরে অবাধে ও নিরাপদে বিচরণ করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে এবং পাবলিক টয়লেটের অভাব সে অধিকারকে সরাসরি সংকুচিত করে।

সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো ব্যবস্থাপনা। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আধুনিক টয়লেট নির্মাণ করা হলেও একটি সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনা মডেলের অভাবে সেগুলোর বেশির ভাগই আজ বেহাল দশায় পতিত। এখানে জবাবদিহির অভাব প্রকট। কারা পরিচালনা করবে, আয়ের উৎস কী হবে, পরিচ্ছন্নতার মানদণ্ড কে পর্যবেক্ষণ করবে, এসব বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো নেই। ফলে পাবলিক টয়লেটগুলো প্রায়ই অপরাধমূলক কার্যকলাপের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং সাধারণ মানুষ, বিশেষত নারীরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন না। এ সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। পাবলিক টয়লেটকে ‘বোঝা’ বা ‘ঐচ্ছিক সুবিধা’ হিসেবে না দেখে, একে নগরীর অপরিহার্য অবকাঠামো এবং নাগরিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

প্রথমত, সিটি করপোরেশন ও রাজউককে সব উন্নয়ন প্রকল্পে (যেমন পার্ক, খেলার মাঠ, ফুটপাত, বাস টার্মিনাল) বাধ্যতামূলকভাবে জনসংখ্যার চাপ অনুযায়ী পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুধু নির্মাণ করলেই হবে না, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা সামাজিক ব্যবসার মতো উদ্ভাবনী মডেলে এগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে একটি টেকসই ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার করে (যেমন মোবাইল অ্যাপ) টয়লেটের অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে নাগরিকদের জানানো এবং তাদের মতামত ও অভিযোগ জানানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।

ঢাকার পাবলিক টয়লেট সংকট আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার এক জীবন্ত স্মারক। এ লজ্জা ঢাকতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি সামগ্রিক, সমন্বিত ও অধিকারভিত্তিক পরিকল্পনা। একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরী গড়তে এর কোনো বিকল্প নেই।

আরও