রাজধানীর পাবলিক টয়লেট

অস্বাস্থ্যকর ও অব্যবস্থাপনার নজির

রাজধানীর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে লালবাগের দিকে যেতে চোখে পড়বে একটি জরাজীর্ণ ভবন, দেখলে মনে হয় যেকোনো সময় ধসে পড়বে। দেয়াল ও ওপরের দিকে বিবর্ণ রঙে লেখা পাবলিক টয়লেট।

রাজধানীর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে লালবাগের দিকে যেতে চোখে পড়বে একটি জরাজীর্ণ ভবন, দেখলে মনে হয় যেকোনো সময় ধসে পড়বে। দেয়াল ও ওপরের দিকে বিবর্ণ রঙে লেখা পাবলিক টয়লেট। বাইরে থেকে এর ভেতরের দুরবস্থা ভালোই বোঝা যাচ্ছিল। ভেতরে গিয়ে যা দেখা গেল তা একজন টয়লেট ব্যবহারকারীর জন্য রীতিমতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

টয়লেটের প্রবেশমুখে একজন বৃদ্ধ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সেবা বাবদ টাকা নিচ্ছেন। ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল টয়লেটের জন্য নির্ধারিত পানির ট্যাংকের মুখ খোলা, যেখান থেকে অবাধে পানি নেয়া হচ্ছে। এর ভেতরের পরিবেশ স্যাঁতসেঁতে ও নোংরা। দেয়ালে শেওলার স্তর জমে কালো হয়ে আছে। ব্যবহার করা টিস্যু ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় পরিবহনে ব্যবহৃত লুব ওয়েলের পাঁচ লিটারের গ্যালন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এখানে নারী ও পুরুষের জন্য কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই।

টয়লেটের ভেতরে আলো-বাতাসের কোনো সুব্যবস্থা নেই। ব্যবহারের অনুপযোগী এ টয়লেটের কোনোটির দরজা নেই, ছিটকিনি নেই, এমনকি পানিও নেই। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দুর্গন্ধ, ছাদ চুইয়ে পানি পড়া ও ময়লা পানি জমে থাকা এখানকার সাধারণ চিত্র। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।

কুমিল্লার ব্যবসায়ী মাসুম। জরুরি কাজে ঢাকায় এসে অনেক খুঁজে এ পাবলিক টয়লেটের সন্ধান পেয়েছেন, তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন, ‘‌প্রথম দেখায় কিছুটা পরিচ্ছন্ন মনে হলেও ভেতরে ঢুকতেই বিপত্তি। দেয়ালের চারপাশে ও ভাঙাচোরা মেঝেতে আয়রন আর শেওলার কালো রঙে আচ্ছন্ন। টাকা দিয়ে টয়লেট করতে এসে এমন পরিবেশ দেখে ব্যবহারের ইচ্ছা করছিল না। কোনোরকম নাক-মুখ ঢেকে কাজ সেরেছি। সেই সঙ্গে টয়লেটের উৎকট গন্ধ তো ছিলই। ভেতরের বদনাগুলোও পুরনো, শেওলা ধরা। দুর্গন্ধ তো আছেই। জায়গা এতটাই ছোট যে গন্ধ আরো ছড়ায়। একজন কর্মী থাকলেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বালাই নেই। নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীদের জন্য নেই কোনো বিশেষ সুবিধা।’

গাবতলী বাস টার্মিনালের পাবলিক টয়লেট ছবি: মাসফিকুর সোহান

রাজধানীর মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ৫ নম্বর গেটের পাশের পাবলিক টয়লেটটিও রাজধানীর গণশৌচাগারের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইজারায় পরিচালিত টয়লেটটিতে গিয়ে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দেখা পাওয়া গেল না। রহিম নামের একজন স্থানীয় কর্মচারী নিজেকে ‘এমনিতেই দেখাশোনা করি’ বলে পরিচয় দেন এবং জানান যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি দুপুরের খাবার খেতে গেছেন। চারপাশে যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে টয়লেট পরিষ্কারের ছোট ছোট টুলস। ভেতর প্রবেশ করতেই নাকে চারপাশে দুর্গন্ধ জানান দিল। নারীদের জন্য আলাদা চেম্বার থাকলেও কোনো নারী কর্মী সেখানে নেই। এ পাবলিক টয়লেটে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য কোনো আলাদা চেম্বারের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

আজিমপুর ও মিরপুর স্টেডিয়ামের পাবলিক টয়লেটগুলোর মতো রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ গণশৌচাগারের পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। অপরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, নিরাপত্তা সংকট এ টয়লেটগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য। নগরবাসীর বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পাবলিক টয়লেট নেই বললেই চলে। এ অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য যেমন হুমকি, তেমনি রাজধানীর বাসযোগ্যতার নির্দেশক হিসেবে খুবই নিম্নমানের।

পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেটের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে বা গাছের আড়ালে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছেন, যা পরিবেশ দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। রাজধানীতে যেকোনো মানুষ ৩০ মিনিট ফুটপাত ধরে হাঁটলেই এ রকম ‘বিশেষ স্থান’ বা ‘উন্মুক্ত টয়লেট’ চোখে পড়বে। পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা না থাকায় ঢাকার রাস্তায় নারীদের অনেকে পর্যাপ্ত পানিও পান করেন না, যা তাদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।

নীলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো একজন নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। শহরে নারীবান্ধব টয়লেটের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ‌এ শহরে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নেই। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি বিড়ম্বনার। এজন্য বাসা থেকে বের হওয়ার সময় প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক কর্ম সেরে আসি। রাস্তায় পিপাসা লাগলেও পানি পান করি না। কারণ সবখানে উপযুক্ত পাবলিক টয়লেট নেই।

একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মিরপুরের আরেকজন নারী। সন্তানকে স্কুলে দিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। এ সময় চাপ এলেও কিছু করার থাকে না। কেননা সব জায়গায় তো প্রয়োজনীয় সংখ্যক টয়লেট নেই। যেগুলো আছে তার অনেকগুলোই ব্যবহারের অনুপযোগী ও বেহাল অবস্থায়। হাসপাতাল কিংবা শপিংমলে টয়লেট খুঁজতে হয়। অনেক সময় সেখানকার টয়লেট ব্যবহার করতে গেলে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। এমন অবস্থায় খুবই ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

মেট্রোরেলে যাত্রীসেবার অংশ হিসেবে স্টেশনগুলোয় টয়লেট চালু রাখা হয়েছে, যেখানে ১০ টাকা সার্ভিস চার্জে যাত্রীরা সেবা নিতে পারেন। তবে অনেকেই অভিযোগ করছেন, এই চার্জ নেয়ার পরও পরিষেবার মান খুবই নিম্নমানের। সম্প্রতি মতিঝিল, সচিবালয়, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার ও মিরপুর ১০ স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ টয়লেটেই তীব্র দুর্গন্ধ। ইউরিনালগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, কমোডে জমেছে ময়লার স্তর। এ অবস্থায় টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, টাকা নিয়েও এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ গ্রহণযোগ্য নয়। সেবার মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করছেন তারা।

জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএর তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরীতে প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ মানুষের বাস, যার দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিদিন ঘরের বাইরে বের হন। অথচ তাদের জন্য উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে পাবলিক টয়লেট আছে মাত্র ১৯৫টি, যার অনেকগুলো ব্যবহার উপযোগী নয়। এর অর্থ প্রায় সোয়া লাখ মানুষের জন্য একটি টয়লেট, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যা অনুপাতে প্রতি আধা কিলোমিটার পরপর পাবলিক টয়লেট স্থাপন জরুরি।

ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহারের অনুপযোগী। নোংরা, অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর, দুর্গন্ধযুক্ত ও অনিরাপদ পরিবেশের কারণে অনেকেই এগুলো ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

আরও