ড্যাপে পাবলিক টয়লেটের সুপারিশ করা হয়েছে

মো. আশরাফুল ইসলাম

প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)

জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার জন্য পাবলিক টয়লেট বা গণশৌচাগার অপরিহার্য। পাবলিক টয়লেট সঠিকভাবে নির্মাণ হলে রোগের সংক্রমণ কমায় এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনের গোপনীয়তা নিশ্চিত করে।

জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার জন্য পাবলিক টয়লেট বা গণশৌচাগার অপরিহার্য। পাবলিক টয়লেট সঠিকভাবে নির্মাণ হলে রোগের সংক্রমণ কমায় এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনের গোপনীয়তা নিশ্চিত করে। বিশেষ করে মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাড়ছে নাগরিক সেবার চাপও। যার প্রভাব মারাত্মকভাবে পড়ছে নগরবাসীর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিকীকরণে। এ পরিস্থিতিতে একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ও মানবিক শহর গড়ে তুলতে হলে আমাদের ন্যূনতম মৌলিক সেবা ও অবকাঠামো নিশ্চিতের বিকল্প নেই। আর এটা অবশ্যই নিরবচ্ছিন্ন ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে হওয়া জরুরি। যার মধ্যে পাবলিক টয়লেট অন্যতম, যা অনেক সময় আলোচনার বাইরেই থেকে যায়, অথচ নাগরিক স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ রক্ষায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।

রাজউক ড্যাপ প্রণয়নের সময় জনঘনত্ব, ভূমির ব্যবহার ও চলাচলের গতি বিবেচনা করে নগরের বিভিন্ন জোনে পাবলিক টয়লেট স্থাপনে স্থান নির্ধারণের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করেছে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো টয়লেটকে কোনো বিচ্ছিন্ন বা অকেজো স্থাপনা হিসেবে না দেখে একে একটি সমন্বিত ‘আরবান ফ্যাব্রিক’ বা নান্দনিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। তাই আমরা পার্ক, খেলার মাঠ, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, উন্মুক্ত স্থান, নদীতীর ও বাজারের মতো জনাকীর্ণ স্থানগুলোতে গণশৌচাগার সুবিধা নিশ্চিত করার উপযোগী নকশা ও নীতিমালা তৈরি করেছি। তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।

আমরা যদি ঢাকার বিদ্যমান টয়লেট ব্যবস্থা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই অনেক জায়গায় টয়লেট আছে, কিন্তু তা অপরিচ্ছন্ন, নিরাপত্তাহীন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহার অযোগ্য। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী নাগরিক। একজন নারী নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রয়োজন থাকলেও পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে ভয় পান, যা তার অবাধ চলাচলকে সীমিত করে। একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিশেষ সুবিধা না থাকাটা শুধু অবহেলা নয়, এটা তার নাগরিক অধিকার হরণের শামিল। মায়েরা শিশুদের ডায়াপার পরিবর্তনের সাধারণ জায়গা পান না। তাই ড্যাপে আমরা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে নকশা ও নিরাপদ নগর নিশ্চিতের কথা বলেছি, যেখানে পাবলিক টয়লেট থাকবে অবকাঠামো হিসেবে, কোনো ঐচ্ছিক ব্যবস্থা হিসেবে নয়।

পরিবেশগত দিক থেকেও বিষয়টি জরুরি। অপরিকল্পিত টয়লেট ব্যবহারের ফলে অনেক সময় বর্জ্য সরাসরি খাল, নালা বা খোলা জলাশয়ে গিয়ে পড়ে, যা মারাত্মক দূষণ ও জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করে। এজন্য আমরা পরিবেশবান্ধব স্যানিটেশন প্রযুক্তি, পানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ফ্লাশ ব্যবহার এবং পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণের প্রস্তাব রেখেছি। প্রতিটি টয়লেটকে পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করা বা প্রয়োজনে নিজস্ব সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল স্থাপন বা তালিকাভুক্ত করা জরুরি।

আমরা বিশ্বাস করি, ঢাকাকে টেকসই শহর হিসেবে গড়তে হলে পাবলিক টয়লেটকে স্থান দিতে হবে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদার জায়গায়। ঢাকায় প্রতি নির্দিষ্টসংখ্যক জনগণের জন্য নির্ধারিত টয়লেট থাকা প্রয়োজন, যা হবে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, সব শ্রেণীর মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। এখানে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, সমাজবিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ ও সিটি করপোরেশন সবার যৌথ অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

আমাদের প্রস্তাব হলো সিটি করপোরেশন ও অন্য সংস্থাগুলো তাদের যে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পাবলিক টয়লেট বাধ্যাতুমূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করতে হবে। এ মডেল সাধারণ ব্যবহার ফি, বিজ্ঞাপন বা এর সঙ্গে যুক্ত ছোট কিয়স্ক বা দোকান থেকে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তোলা যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

নগর শুধু বসবাসের স্থান নয়, এটি সম্মান ও স্বস্থির সঙ্গে বাঁচারও জায়গা। সে সম্মান ও স্বস্তি রক্ষার প্রথম ধাপই হলো মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা। আমরা যদি ঢাকাকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও টেকসই বিশ্বমানের শহর হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে পাবলিক টয়লেটের মতো মৌলিক অবকাঠামোকে আর পেছনে রাখার সুযোগ নেই।

আরও