নারী উদ্যোক্তাদের ১ কোটি টাকা পর্যন্ত মর্টগেজবিহীন ঋণ প্রদান করছি

বাংলাদেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) খাত দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এটি জিডিপিতে প্রায় ৭.১৭% অবদান রাখে এবং প্রায় ৮৫% কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তবে এই খাতে বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জে রয়েছে।

দেশের এমএসএমই খাত এখন কেমন করছে?

বাংলাদেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) খাত দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এটি জিডিপিতে প্রায় ৭.১৭% অবদান রাখে এবং প্রায় ৮৫% কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তবে এই খাতে বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ইকোনমিক সেন্সাস ২০২৪ অনুযায়ী, উৎপাদন খাতে এমএসএমই প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালের ১৫.৩৯% থেকে ২০২৪ সালে ৫.০৭%-এ নেমে এসেছে। কভিড-১৯, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে অনেক উদ্যোক্তা তহবিল ও কাঁচামালের ঘাটতিতে ভুগছেন।

এ অবস্থায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে ব্যাংক ঋণের ২৫% এবং ২০২৯ সালের মধ্যে ২৭% এমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিংয়ের জন্য ১০% লক্ষ্যমাত্রা এবং কভিড-১৯ পরবর্তীকালে ২০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষিত হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমএসএমই খাতে আগ্রহী, যদিও এখনো অনেক উদ্যোক্তা আনুষ্ঠানিক ঋণের বাইরে রয়েছেন। ২০২৪ সালে এ খাতে মোট ঋণ ও অগ্রিম ছিল ২,২৩,৪৪১.৩৬ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে, চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এমএসএমই খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি এবং এর বিকাশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ চলমান।

এমএসএমই খাতে ঋণ প্রদানে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন? এ খাতে ঋণ সুবিধা সহজলভ্য করতে সরকারের কাছে আপনাদের কোনো প্রত্যাশা আছে কি?

আমাদের অভিজ্ঞতায়, এমএসএমই খাতে ঋণ প্রদানের সুযোগ সম্ভাবনাময় এবং ঝুঁকি কম। অনেক উদ্যোক্তা এ ঋণে সফল ব্যবসা চালাচ্ছেন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার অন্যান্য খাতের তুলনায় কম। তবে ঋণ প্রদানে কিছু কাঠামোগত ও নিয়ন্ত্রক সমস্যা রয়েছে। অনেক এমএসএমই উদ্যোক্তার যথাযথ আর্থিক তথ্য বা ক্রেডিট হিস্ট্রি না থাকার কারণে ঋণ মূল্যায়ন কঠিন হয়। জামানতের অভাব এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ঘাটতি আরো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক জামানতবিহীন ঋণের জন্য স্কিম চালু করেছে, যা এখনো সহজলভ্য নয়।

সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার (যেমন সিআইবি) তৈরি করা যাতে উদ্যোক্তাদের আর্থিক তথ্য যাচাই সহজ হয়। ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমকে বিস্তৃত ও সহজতর করা, বিশেষ করে নতুন ও জামানতবিহীন ঋণগ্রহীতাদের জন্য। সহজ শর্তে পুনর্অর্থায়ন স্কিম চালু ও সম্প্রসারণ, যাতে কম সুদে ঋণ প্রদান সম্ভব হয়। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি ও এমএসএমই-বান্ধব নীতি গ্রহণ।

তথ্যের ঘাটতি, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেশের এমএসএমই খাতের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। উদ্যোক্তাদের এসব সমস্যা সমাধানে আপনাদের কোনো সহায়তার উদ্যোগ আছে কিনা?

আমরা এমএসএমই খাতের তথ্য ঘাটতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বুঝি এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন সহায়তা উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজন করি, যেখানে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা, হিসাবরক্ষণ ও ঋণ প্রস্তাবনা তৈরিতে দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ও ক্লাউডভিত্তিক অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

আমাদের শাখায় এমএসএমই ডেস্ক রয়েছে। ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপে ভিডিও টিউটোরিয়াল, গাইডলাইন ও এফএকিউ রাখা হয়েছে তথ্য সরবরাহের জন্য। ক্রেডিট স্কোরিংয়ে বিকল্প ডেটা (যেমন মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন, ইউটিলিটি বিল) ব্যবহারে নতুন মডেল তৈরির কাজ চলছে, যা তথ্য ঘাটতি সত্ত্বেও ঋণ অনুমোদনে সহায়ক হবে। নেটওয়ার্কিং বাড়াতে উদ্যোক্তা মেলা ও ইভেন্টে অংশ নেয়া ও স্পন্সর করাও আমাদের উদ্যোগের অংশ।

এমএসএমই খাতের বিকাশে আপনাদের ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) বাংলাদেশের এমএসএমই খাতে ঋণ প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ও পরিপূরক ভূমিকা রাখে। বড় ব্যাংকগুলো সাধারণত বড় ঋণ ও কঠোর জামানত শর্ত দেয়, ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বাইরে থেকে যান। কিন্তু এনবিএফআইগুলো ছোট ঋণ, সহজ প্রক্রিয়া এবং জামানতবিহীন ঋণ দিয়ে সাহায্য করে। তারা দ্রুত ঋণ অনুমোদন দিতে পারে এবং নির্দিষ্ট এমএসএমই খাতে কাস্টমাইজড পণ্য সরবরাহ করে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং, ফ্যাক্টরিং, রিটেইলার ফাইন্যান্সিংসহ উদ্ভাবণী ঋণপণ্য চালু করেছি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সুচিন্তিত পদ্ধতি অনুসরণ করে ঋণ পুনঃপরিশোধের হার ভালো রাখা হয়। সার্বিকভাবে, এনবিএফআইগুলো এমএসএমই খাতে অপরিহার্য স্তম্ভ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে তাদের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি ও সহায়তা প্রয়োজন, বিশেষ করে তারল্য ও সুশাসন নিশ্চিতকরণ বিষয়ে।

এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

নারী উদ্যোক্তাদের এমএসএমই খাতে সফলতা নিশ্চিত করতে বিশেষ ঋণপণ্য ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিচ্ছি, যেমন ১ কোটি টাকা পর্যন্ত মর্টগেজবিহীন ঋণ প্রদান। প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত কর্মশালা পরিচালনা করি, যেখানে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিংসহ নেতৃত্ব ও আইনগত সচেতনতা শেখানো হয়। মেন্টরশিপ প্রোগ্রামও চালু আছে যা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। মার্কেট সংযোগ ও নেটওয়ার্কিং উন্নয়নে ফোরাম, সেমিনার ও ইভেন্ট আয়োজন করে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় ও বড় ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ করি। নারীদের জন্য প্রতিটি শাখায় সহায়তা ডেস্ক ও ‘উইমেন এন্টারপ্রিনিওর ডাভলাপমেন্ট ইউনিট’ সম্প্রসারণে কাজ চলছে। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত ‘জয়ী ৩৬০’ বিশেষায়িত উপশাখায় ‘জয়ী আলাপন’ ‘মিটিং স্পেস’ ও ‘জয়ী পাঠশালা’ নামে কর্মশালা চালু আছে, যা নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক উন্নয়নে সহায়ক।

আরও