এমএসএমইর উন্নতিতে নির্ভর করছে গ্রামীণ অর্থনীতির সমৃদ্ধি

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে বিবেচিত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) খাত। কর্মসংস্থান, আয় সৃষ্টির সুযোগ, দারিদ্র্য হ্রাস ও নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নে এ খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও গত কয়েক বছরে এমএসএমই খাতের প্রবৃদ্ধি কমে আসছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে বিবেচিত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) খাত। কর্মসংস্থান, আয় সৃষ্টির সুযোগ, দারিদ্র্য হ্রাস ও নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নে এ খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও গত কয়েক বছরে এমএসএমই খাতের প্রবৃদ্ধি কমে আসছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এমএসএমই খাতের শিল্পোৎপাদন প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরেও এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ খাতের উন্নয়ন ছাড়া গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য হ্রাস সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে, যার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে এমএসএমই। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৭৮ লাখ এমএসএমই ইউনিট রয়েছে, যার সিংহভাগই গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায়। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে শিল্প ও সেবাভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগে সম্পৃক্ত করতে পারলে তাদের আয় অনেকাংশে বেড়ে যেতে পারে। এতে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও এ খাতের অবদান বাড়বে।

ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ ও এ অঞ্চলের অর্থনীতি কৃষিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এমএসএমই খাতের অর্থনীতিতে রূপান্তর হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। কৃষিসহ নানামুখী সেবা ও পণ্য উৎপাদনে এগিয়ে আসা এ খাত দেশের বেকারত্ব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিবিএসের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থানের ২৫ শতাংশেরও বেশি কোনো না কোনোভাবে এমএসএমই খাতে নিয়োজিত। এমএসএমই খাত সংকুচিত হয়ে আসার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও। বিবিএসের ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজার। ২০২৩ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার।

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক দুরবস্থা, নীতিগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাসহ নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে দেশের অর্থনীতির আর্থসামাজিক উন্নয়নের এ মূল খাত। এমএসএমইর উন্নয়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু লক্ষ্যমাত্রা দিলেও তা অর্জন করতে পারেনি ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। এতে ব্যাহত হচ্ছে এমএসএমই খাতের প্রবৃদ্ধি।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জাতীয় আয়ে আনুষ্ঠানিক এসএমই খাতের অবদান ৪০ শতাংশ। এশিয়ার অনেক দেশেই শিল্প খাতে এমএসএমইর অবদান ৯০ শতাংশ এবং মোট জনশক্তির ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে এ খাত। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান এখনো বেশ কম। এসএমই খাতের ওপর কভিডের প্রভাব নিয়ে করা লাইট ক্যাসল পার্টনার্সের এক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ইন্দোনেশিয়ার জিডিপিতে এমএসএমই খাতের অবদান ৫৯ শতাংশ। একইভাবে কম্বোডিয়ায় ৫৮, শ্রীলংকায় ৫২, ভিয়েতনামে ৪০ ও ভারতের ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশে এর পরিমাণ ২৫-২৭ শতাংশ।

দেশে বেশ কয়েক বছর ধরেই রফতানি বৈচিত্র্যায়ণের আলোচনা চলছে। এক্ষেত্রে এমএসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে রফতানির জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিল হিসাব-নিকাশ এ খাতের সব উদ্যোক্তার বোঝা কঠিন। সেজন্য একটি কমন প্লাটফর্ম তৈরির কথা বলছেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রফতানির জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যে হিসাব-নিকাশ, এগুলো বোঝা ও বাস্তবায়ন করার সামর্থ্য এমএসএমই উদ্যোক্তাদের নেই। আবার ব্যাংক স্বপ্রণোদিত হয়ে রফতানি করাবে, এটাও খুব কঠিন। এক্ষেত্রে চীনের আলিবাবার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। যেখানে উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতার সম্মিলন ঘটবে। এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলে উদ্যোক্তাদের রফতানির ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হবে না। তারা ক্রয়াদেশ পেয়ে পণ্য সরবরাহ করলে ঘরে বসেই বৈদেশিক অর্থ আনতে পারবেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এমএসএমই উদ্যোক্তাদের পণ্যের গুণগত মান ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। গুচ্ছভুক্ত অনেক এমএসএমই দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে পণ্য সরবরাহ করছে। সে পণ্যগুলোই কিন্তু তারা দেশের বড় শপিং মলগুলোয় বিক্রি করছে। আমাদের শুধু দরকার উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংযোগ তৈরি করে দেয়া।’

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট ঋণের ২৫ শতাংশ এমএসএমই খাতে বিতরণের নির্দেশনা দিয়েছিল। ব্যাংক ও এনবিএফআইগুলোকে ২০২৪ সালের মধ্যেই এ লক্ষ্য অর্জন করতে বলা হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা বলছে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো এ খাতে মোট ঋণের ১৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ বিতরণ করতে পেরেছে। লক্ষ্য অর্জন না হলেও আবার নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ঋণের ২৭ শতাংশ এমএসএমই খাতে বিতরণ করতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের মাঝে দক্ষতা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ঘাটতিসহ নানা কারণে এ লক্ষ্য অর্জন নিয়েও সংশয় রয়েছে।

বিআইবিএমের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে এমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণের হার আরো কমেছে। ২০২০ সালে এ খাতে লক্ষ্যের সর্বোচ্চ ৯০ দশমিক ২৫ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। পরের বছরগুলোয় এ হার আরো কমেছে। ২০২১ সালে লক্ষ্যের ৮৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে ব্যাংক ও এনবিএফআইগুলো। ২০২২ সালে আরো কমে ৮৪ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৩ সালে কিছুটা বেড়ে ৮৭ দশমিক ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০২৪ সালে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সে বছর লক্ষ্যের মাত্র ৭৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

এমএসএমই খাতের বড় অংশের উদ্যোক্তা নারী। তাদের জন্য বিশেষ স্কিম, ব্যাংকে আলাদা ডেস্ক ইত্যাদি নিশ্চিতের কথা বলা হলেও ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা আরো করুণ। বিআইবিএমের একই গবেষণায় দেখা গেছে, এমএসএমই খাতে বিতরণকৃত মোট ঋণের মাত্র ৪-৬ শতাংশ পান নারীরা। সর্বশেষ ২০২৪ সালে নারীদের ঋণ পাওয়ার হার ছিল ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ।

ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঝারি পর্যায়ে পৌঁছতে পারলেও ক্ষুদ্র ও ছোট পর্যায়ে ঋণ নিয়ে পৌঁছার সক্ষমতা নেই ব্যাংকগুলোর। এনজিওগুলো ব্যাংক থেকে ১০-১২ শতাংশ হারে ঋণ নিয়ে সে ঋণ আবার এমএসএমইদের ২৫-৩০ শতাংশে বিতরণ করে। এতে উদ্যোক্তাদের খরচ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সুদহার কমিয়ে উদ্যোক্তাদের ব্যবসার বিকাশ ঘটাতে ব্যাংকগুলোর উপশাখার প্রসার দরকার। এক্ষেত্রে ভালো ঋণমানের ব্যাংকগুলোকে অনুমোদন দেয়া যেতে পারে। এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৬ শতাংশ এমএসএমই উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসার প্রসারে ব্যাংক থেকে ঋণ পান। বাকি অংশ পরিবারের সদস্য বা এনজিওর উচ্চসুদের ঋণের ওপর নির্ভরশীল।

সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুসারে, দেশের শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫। এর ৯৯ শতাংশই সিএমএসএমই (কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ) খাতের। এর মধ্যে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ কুটির, ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ ক্ষুদ্র, ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ ছোট ও দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ মাঝারি প্রতিষ্ঠান। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। সব মিলিয়ে এ খাতে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ সম্পৃক্ত। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ২৪ লাখেরও বেশি। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি হয় ২০১৩ সালে। এরপর আর এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ হয়নি। ফলে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।

এমএসএমই খাতের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিফাইন্যান্সিং স্কিমকে আরো সহজলভ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রিফাইন্যান্সিং স্কিমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো আর্থিক ঝুঁকি না থাকলেও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিয়েই ঋণ দেয়। কেউ ঋণখেলাপি হলে এর ব্যয়ভার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিতে হয়। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ঝুঁকি না নিয়েই নির্দিষ্ট সুদহারে অর্থ ফেরত পায়। এক্ষেত্রে রিফাইন্যান্সিং স্কিমের স্প্রেড হার আরো সহজতর করা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন যে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম শুরু করেছে, তার আওতাও আরো বাড়াতে পারে।

আরও